০৫:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
লিথিয়াম আর ভূতাপীয় বিদ্যুতের স্বপ্নে ক্যালিফোর্নিয়ার ‘হেলস কিচেন’, সামনে পরিবেশের কঠিন প্রশ্ন ব্ল্যাক হিলসে সোনার নতুন দৌড়, বাড়ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ খনিজের দখলে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তার নতুন লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র গরমে ত্বক ভালো রাখতে চিকিৎসকদের ৫ অভ্যাস, যেগুলো আপনিও মেনে চলতে পারেন হাউস দখলের লড়াইয়ে জেসন ক্রো, ডেমোক্র্যাটদের নতুন কৌশলের মুখ যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫ বছরের রেকর্ড গড়ল হাম, টিকাদান কমায় বাড়ছে উদ্বেগ ইমরান খানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতা: গণতন্ত্রের চেয়ে পাকিস্তানে কৌশলগত স্বার্থই বড় ‘ককরোচ’ থেকে রাজপথে: ভারতের তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের অবিশ্বাস্য উত্থান শিশুর সবচেয়ে ভালো বন্ধু যদি হয় যন্ত্র—এআই খেলনা কি নিঃশব্দে বদলে দিচ্ছে শৈশব? হলিউডে বদলে যাচ্ছে প্রেমের সমীকরণ, বয়স্ক নারীর পাশে তরুণ পুরুষ

তারকা শেফের যুগ কি শেষ? নোমার রান্নাঘরে বদলের হাওয়া

বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রেস্তোরাঁ নোমা আবারও নতুনভাবে ফিরেছে। তবে এবার তার প্রত্যাবর্তনের গল্প শুধু খাবার, সৃজনশীলতা কিংবা মিশেলিন তারকার নয়; বরং রান্নাঘরের সংস্কৃতি, কর্মীদের অধিকার এবং ‘রক-স্টার শেফ’ হিসেবে পরিচিত এক যুগের অবসানেরও গল্প।

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করা নোমা অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত রেস্তোরাঁগুলোর একটি হয়ে ওঠে। অদ্ভুত ও সাহসী খাবারের জন্য রেস্তোরাঁটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। ধোঁয়ায় শুকানো হাঁসের মাথার ভেতর থেকে মস্তিষ্ক তুলে খাওয়া কিংবা শামুকে ভরা সালাদ—নোমার খাবারের তালিকায় এমন সব পদই দেখা গেছে, যা একদিকে বিস্মিত করেছে, অন্যদিকে খাবারের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে।

বারবার বদলেছে নোমার ঠিকানা, বদলায়নি খ্যাতি

প্রতিষ্ঠার পর থেকে নোমা বহুবার তার রূপ ও অবস্থান বদলেছে। কোপেনহেগেনের মূল রেস্তোরাঁ একবার অন্য জায়গায় সরেছে এবং দুই দফায় বন্ধও হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও জাপানের টোকিওতেও অস্থায়ীভাবে রেস্তোরাঁটির আয়োজন হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট নোমা আবার কোপেনহেগেনের আগের ঠিকানায় দরজা খুলেছে। কিন্তু এবারের প্রত্যাবর্তনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন রান্নাঘরের ভেতরে।

The world's top restaurant reopens

আলোচিত শেফ এবার রান্নাঘরের সামনে নেই

নোমার প্রধান শেফ রেনে রেডজেপিকে ঘিরে চলতি বছরের মার্চে নিউইয়র্ক টাইমস-এ কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ প্রকাশিত হয়। অভিযোগগুলো ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ের এবং তখন নোমা তৃতীয় মিশেলিন তারকা পাওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে ছিল।

রেডজেপি প্রতিবেদনে প্রকাশিত সব ঘটনার বিবরণ স্বীকার করেননি। তবে তিনি বলেন, সব তথ্যের সঙ্গে তিনি পুরোপুরি পরিচিত নন, এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি গভীরভাবে দুঃখিত। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, নিজের কাজের ধরন ও পরিবেশে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন।

নোমা এবার পুনরায় চালু হলেও তার ঝুলিতে কোনো মিশেলিন তারকা নেই। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, রেডজেপি আর রান্নাঘরের মূল দায়িত্বে থাকা শেফ নন। তিনি এখন রেস্তোরাঁটির সৃজনশীল পরিচালক। রান্নাঘরের সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন অন্যরা।

একসময় রাগী শেফই ছিলেন তারকা

রন্ধনশিল্পে একসময় ‘রক-স্টার শেফ’ ধারণাটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে কঠোর, রাগী এবং কর্তৃত্বপরায়ণ শেফদের ঘিরে এক ধরনের তারকাখ্যাতি তৈরি হয়েছিল।

ইংরেজ শেফ মার্কো পিয়ের হোয়াইট অধস্তন কর্মীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আবর্জনার বাক্সে ঢুকিয়ে রাখার মতো আচরণের জন্য পরিচিত ছিলেন। গর্ডন রামজে রাগের বিস্ফোরণ এবং কর্মীদের অপমানজনক ভাষায় কথা বলার কারণে খ্যাতি পেয়েছিলেন। তাঁর মুখে কর্মীদের ‘ইডিয়ট স্যান্ডউইচ’ বলার ঘটনাও জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়।

অ্যান্থনি বুরডেইনের ‘কিচেন কনফিডেনশিয়াল’ বইয়েও রেস্তোরাঁর রান্নাঘরকে এমন এক জগৎ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যেখানে নিয়ম ভাঙা, বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ব্যবহার যেন পেশাটিরই অংশ।

তারপরও সেই কঠোর রান্নাঘরকে একসময় আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর পেশাজগত হিসেবে দেখা হতো।

Everyone knows about Noma. The Nordic fine dining restaurant dares diners  to spoon brains from smoked ducks' heads or eat salads crawling with snails.  Since its founding, Noma has been through umpteen

বদলে গেছে শেফদের গল্পও

এখন সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও শেফদের আর শুধু উদ্ধত, রাগী কিংবা ক্ষমতাবান চরিত্র হিসেবে দেখানো হচ্ছে না।

জুনে শেষ হওয়া জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘দ্য বিয়ার’-এ দেখা গেছে এক প্রতিভাবান কিন্তু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শেফের জীবন। ধারাবাহিকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তিনি একসময় নোমাতেও কাজ করেছিলেন।

অন্যদিকে চলতি মাসে অ্যান্থনি বুরডেইনকে নিয়ে নির্মিত জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘টনি’ মুক্তি পাওয়ার কথা। এতে রান্নাঘরের কঠিন ও নরকসম পরিবেশে তাঁর গড়ে ওঠার সময়টিকে তুলে ধরা হবে।

এ ছাড়া সামনে আসছে এমন একটি ধারাবাহিক, যেখানে মার্কো পিয়ের হোয়াইট, গর্ডন রামজে এবং হেস্টন ব্লুমেনথাল নিজেদের পুরোনো দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও সংঘাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলবেন।

তরুণ কর্মীরা আর সবকিছু মেনে নিতে রাজি নন

রেস্তোরাঁশিল্পের ভেতরেও পরিবর্তনের দাবি জোরালো হচ্ছে। নিউইয়র্কের মিশেলিন-স্বীকৃত রেস্তোরাঁ ডার্ট ক্যান্ডির শেফ আমান্ডা কোহেনের মতে, তরুণ রান্নাঘরকর্মীদের প্রত্যাশা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি।

একসময় তরুণ শেফরা কঠিন ও নিষ্ঠুর পরিবেশ সহ্য করতেন শুধু জীবনবৃত্তান্তে একটি নাম যোগ করার জন্য। বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় কাজ করার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের চাকরির জন্য বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো।

কিন্তু এখন কর্মীদের হাতে আগের চেয়ে বেশি বিকল্প ও দর-কষাকষির ক্ষমতা রয়েছে। মহামারির সময় শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই আতিথেয়তা খাতের প্রায় ১২ লাখ কর্মী চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে কর্মী ধরে রাখা এবং কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করা রেস্তোরাঁগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নোমার রান্নাঘরেও শুরু হয়েছে সংস্কার

An Exclusive Look at the New Kitchen at Noma, Copenhagen | Bon Appétit

এই পরিবর্তনের ঢেউ থেকে নোমাও বাইরে থাকছে না।

রেস্তোরাঁটির রান্নাঘরের নেতৃত্বে থাকা মেতে ব্রিংক সোবার্গ জানিয়েছেন, নোমা এখন অপেক্ষাকৃত কম কর্মঘণ্টা চালুর দিকে যাচ্ছে। রান্নাঘরের কাজকে আরও মানবিক ও টেকসই করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আগে নোমায় তিনটি মৌসুমি খাবারের তালিকা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হতো। এখন সেই ব্যবস্থার পরিবর্তে নিয়মিত ও ধাপে ধাপে খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনা হবে। এতে একই ধরনের কাজ বারবার করার চাপ এবং দীর্ঘ সময়ের একঘেয়েমি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুধু সৃজনশীল রান্নাই নয়, রান্নাঘরের সবচেয়ে একঘেয়ে ও শ্রমসাধ্য কাজগুলোও এখন ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যেমন কুমড়ার বীজ আলাদা করার মতো দীর্ঘ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ আর একজন কর্মীর ওপর চাপিয়ে না দিয়ে সবাই মিলে ভাগ করে করবেন।

পরিবর্তনের এই পরিবেশ কতদিন থাকবে?

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সৌহার্দ্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ কতদিন টিকে থাকবে?

রেস্তোরাঁর রান্নাঘর স্বভাবতই চাপপূর্ণ একটি জায়গা। নোমার ওপর সেই চাপ আরও বেশি, কারণ বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত রেস্তোরাঁ হিসেবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তার ওপর সাম্প্রতিক বিতর্কের পর নোমাকে শুধু খাবারের মান দিয়েই নয়, কর্মীদের সঙ্গে আচরণ ও কর্মপরিবেশ দিয়েও নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করতে হবে।

নোমার সংস্কৃতি সত্যিই যদি বদলে থাকে, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি রেস্তোরাঁয় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের রেস্তোরাঁশিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘কঠোর শেফই সেরা শেফ’ ধারণারও হয়তো পরিবর্তন ঘটবে।

আর যারা এখনো মনে করেন রান্নাঘরে টিকে থাকতে হলে অসহনীয় চাপ, রাগ আর দুর্ব্যবহার মেনে নিতেই হবে, তাদের হয়তো একদিন রেডজেপির মতো রান্নাঘরের কেন্দ্র থেকে সরে যেতে হতে পারে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

লিথিয়াম আর ভূতাপীয় বিদ্যুতের স্বপ্নে ক্যালিফোর্নিয়ার ‘হেলস কিচেন’, সামনে পরিবেশের কঠিন প্রশ্ন

তারকা শেফের যুগ কি শেষ? নোমার রান্নাঘরে বদলের হাওয়া

০৪:১৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রেস্তোরাঁ নোমা আবারও নতুনভাবে ফিরেছে। তবে এবার তার প্রত্যাবর্তনের গল্প শুধু খাবার, সৃজনশীলতা কিংবা মিশেলিন তারকার নয়; বরং রান্নাঘরের সংস্কৃতি, কর্মীদের অধিকার এবং ‘রক-স্টার শেফ’ হিসেবে পরিচিত এক যুগের অবসানেরও গল্প।

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করা নোমা অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত রেস্তোরাঁগুলোর একটি হয়ে ওঠে। অদ্ভুত ও সাহসী খাবারের জন্য রেস্তোরাঁটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। ধোঁয়ায় শুকানো হাঁসের মাথার ভেতর থেকে মস্তিষ্ক তুলে খাওয়া কিংবা শামুকে ভরা সালাদ—নোমার খাবারের তালিকায় এমন সব পদই দেখা গেছে, যা একদিকে বিস্মিত করেছে, অন্যদিকে খাবারের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে।

বারবার বদলেছে নোমার ঠিকানা, বদলায়নি খ্যাতি

প্রতিষ্ঠার পর থেকে নোমা বহুবার তার রূপ ও অবস্থান বদলেছে। কোপেনহেগেনের মূল রেস্তোরাঁ একবার অন্য জায়গায় সরেছে এবং দুই দফায় বন্ধও হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও জাপানের টোকিওতেও অস্থায়ীভাবে রেস্তোরাঁটির আয়োজন হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট নোমা আবার কোপেনহেগেনের আগের ঠিকানায় দরজা খুলেছে। কিন্তু এবারের প্রত্যাবর্তনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন রান্নাঘরের ভেতরে।

The world's top restaurant reopens

আলোচিত শেফ এবার রান্নাঘরের সামনে নেই

নোমার প্রধান শেফ রেনে রেডজেপিকে ঘিরে চলতি বছরের মার্চে নিউইয়র্ক টাইমস-এ কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ প্রকাশিত হয়। অভিযোগগুলো ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ের এবং তখন নোমা তৃতীয় মিশেলিন তারকা পাওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে ছিল।

রেডজেপি প্রতিবেদনে প্রকাশিত সব ঘটনার বিবরণ স্বীকার করেননি। তবে তিনি বলেন, সব তথ্যের সঙ্গে তিনি পুরোপুরি পরিচিত নন, এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি গভীরভাবে দুঃখিত। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, নিজের কাজের ধরন ও পরিবেশে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন।

নোমা এবার পুনরায় চালু হলেও তার ঝুলিতে কোনো মিশেলিন তারকা নেই। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, রেডজেপি আর রান্নাঘরের মূল দায়িত্বে থাকা শেফ নন। তিনি এখন রেস্তোরাঁটির সৃজনশীল পরিচালক। রান্নাঘরের সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন অন্যরা।

একসময় রাগী শেফই ছিলেন তারকা

রন্ধনশিল্পে একসময় ‘রক-স্টার শেফ’ ধারণাটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে কঠোর, রাগী এবং কর্তৃত্বপরায়ণ শেফদের ঘিরে এক ধরনের তারকাখ্যাতি তৈরি হয়েছিল।

ইংরেজ শেফ মার্কো পিয়ের হোয়াইট অধস্তন কর্মীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আবর্জনার বাক্সে ঢুকিয়ে রাখার মতো আচরণের জন্য পরিচিত ছিলেন। গর্ডন রামজে রাগের বিস্ফোরণ এবং কর্মীদের অপমানজনক ভাষায় কথা বলার কারণে খ্যাতি পেয়েছিলেন। তাঁর মুখে কর্মীদের ‘ইডিয়ট স্যান্ডউইচ’ বলার ঘটনাও জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়।

অ্যান্থনি বুরডেইনের ‘কিচেন কনফিডেনশিয়াল’ বইয়েও রেস্তোরাঁর রান্নাঘরকে এমন এক জগৎ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যেখানে নিয়ম ভাঙা, বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ব্যবহার যেন পেশাটিরই অংশ।

তারপরও সেই কঠোর রান্নাঘরকে একসময় আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর পেশাজগত হিসেবে দেখা হতো।

Everyone knows about Noma. The Nordic fine dining restaurant dares diners  to spoon brains from smoked ducks' heads or eat salads crawling with snails.  Since its founding, Noma has been through umpteen

বদলে গেছে শেফদের গল্পও

এখন সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও শেফদের আর শুধু উদ্ধত, রাগী কিংবা ক্ষমতাবান চরিত্র হিসেবে দেখানো হচ্ছে না।

জুনে শেষ হওয়া জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘দ্য বিয়ার’-এ দেখা গেছে এক প্রতিভাবান কিন্তু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শেফের জীবন। ধারাবাহিকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তিনি একসময় নোমাতেও কাজ করেছিলেন।

অন্যদিকে চলতি মাসে অ্যান্থনি বুরডেইনকে নিয়ে নির্মিত জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘টনি’ মুক্তি পাওয়ার কথা। এতে রান্নাঘরের কঠিন ও নরকসম পরিবেশে তাঁর গড়ে ওঠার সময়টিকে তুলে ধরা হবে।

এ ছাড়া সামনে আসছে এমন একটি ধারাবাহিক, যেখানে মার্কো পিয়ের হোয়াইট, গর্ডন রামজে এবং হেস্টন ব্লুমেনথাল নিজেদের পুরোনো দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও সংঘাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলবেন।

তরুণ কর্মীরা আর সবকিছু মেনে নিতে রাজি নন

রেস্তোরাঁশিল্পের ভেতরেও পরিবর্তনের দাবি জোরালো হচ্ছে। নিউইয়র্কের মিশেলিন-স্বীকৃত রেস্তোরাঁ ডার্ট ক্যান্ডির শেফ আমান্ডা কোহেনের মতে, তরুণ রান্নাঘরকর্মীদের প্রত্যাশা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি।

একসময় তরুণ শেফরা কঠিন ও নিষ্ঠুর পরিবেশ সহ্য করতেন শুধু জীবনবৃত্তান্তে একটি নাম যোগ করার জন্য। বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় কাজ করার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের চাকরির জন্য বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো।

কিন্তু এখন কর্মীদের হাতে আগের চেয়ে বেশি বিকল্প ও দর-কষাকষির ক্ষমতা রয়েছে। মহামারির সময় শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই আতিথেয়তা খাতের প্রায় ১২ লাখ কর্মী চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে কর্মী ধরে রাখা এবং কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করা রেস্তোরাঁগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নোমার রান্নাঘরেও শুরু হয়েছে সংস্কার

An Exclusive Look at the New Kitchen at Noma, Copenhagen | Bon Appétit

এই পরিবর্তনের ঢেউ থেকে নোমাও বাইরে থাকছে না।

রেস্তোরাঁটির রান্নাঘরের নেতৃত্বে থাকা মেতে ব্রিংক সোবার্গ জানিয়েছেন, নোমা এখন অপেক্ষাকৃত কম কর্মঘণ্টা চালুর দিকে যাচ্ছে। রান্নাঘরের কাজকে আরও মানবিক ও টেকসই করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আগে নোমায় তিনটি মৌসুমি খাবারের তালিকা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হতো। এখন সেই ব্যবস্থার পরিবর্তে নিয়মিত ও ধাপে ধাপে খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনা হবে। এতে একই ধরনের কাজ বারবার করার চাপ এবং দীর্ঘ সময়ের একঘেয়েমি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুধু সৃজনশীল রান্নাই নয়, রান্নাঘরের সবচেয়ে একঘেয়ে ও শ্রমসাধ্য কাজগুলোও এখন ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যেমন কুমড়ার বীজ আলাদা করার মতো দীর্ঘ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ আর একজন কর্মীর ওপর চাপিয়ে না দিয়ে সবাই মিলে ভাগ করে করবেন।

পরিবর্তনের এই পরিবেশ কতদিন থাকবে?

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সৌহার্দ্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ কতদিন টিকে থাকবে?

রেস্তোরাঁর রান্নাঘর স্বভাবতই চাপপূর্ণ একটি জায়গা। নোমার ওপর সেই চাপ আরও বেশি, কারণ বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত রেস্তোরাঁ হিসেবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তার ওপর সাম্প্রতিক বিতর্কের পর নোমাকে শুধু খাবারের মান দিয়েই নয়, কর্মীদের সঙ্গে আচরণ ও কর্মপরিবেশ দিয়েও নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করতে হবে।

নোমার সংস্কৃতি সত্যিই যদি বদলে থাকে, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি রেস্তোরাঁয় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের রেস্তোরাঁশিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘কঠোর শেফই সেরা শেফ’ ধারণারও হয়তো পরিবর্তন ঘটবে।

আর যারা এখনো মনে করেন রান্নাঘরে টিকে থাকতে হলে অসহনীয় চাপ, রাগ আর দুর্ব্যবহার মেনে নিতেই হবে, তাদের হয়তো একদিন রেডজেপির মতো রান্নাঘরের কেন্দ্র থেকে সরে যেতে হতে পারে।