বরফ গলন ঠেকাতে অভিনব উদ্যোগ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুত গলে যাচ্ছে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার হিমবাহগুলো। এই বরফ গলার গতি কমাতে এবার বিজ্ঞানীরা নিয়েছেন এক অভিনব উদ্যোগ—ভেড়ার উল দিয়ে হিমবাহ ঢেকে দেওয়া।
পশ্চিম সুইজারল্যান্ডের তসানফ্লুরন হিমবাহে চলছে এই ব্যতিক্রমী পরীক্ষা। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য, সূর্যের তাপ থেকে বরফকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া এবং একই সঙ্গে প্লাস্টিকের তৈরি প্রচলিত আবরণ ব্যবহারের বিকল্প খুঁজে বের করা।
বহু বছর ধরে গ্রীষ্মকালে হিমবাহের কিছু অংশে কৃত্রিম আবরণ বিছিয়ে দেওয়া হয়। এসব আবরণ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে এবং বরফের ওপর তাপ শোষণের পরিমাণ কমায়। ফলে বরফ গলার গতি কিছুটা ধীর হয়।
কিন্তু এসব কৃত্রিম আবরণের বড় একটি সমস্যা হলো এগুলো সাধারণত প্লাস্টিকজাত। ব্যবহারের সময় এগুলো থেকে ক্ষতিকর ক্ষুদ্র তন্তু ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে ভেড়ার উলকে পরীক্ষা করছেন সুইস গবেষকেরা।
ফেলনা উল পেল নতুন ব্যবহার
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন সামিট ফাউন্ডেশন ও লোজান বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ প্রকল্প। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘উলকে কাজে লাগাই’।
প্রকল্পের ব্যবস্থাপক তিমোথে স্টাইনার জানান, সুইজারল্যান্ডে উৎপাদিত মোট ভেড়ার উলের প্রায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ কোনো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হয় না। এর বড় অংশ কম্পোস্ট করা হয় অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়।
এই অব্যবহৃত প্রাকৃতিক উপাদানকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি হিমবাহ রক্ষার একটি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি খুঁজে বের করাই ছিল গবেষকদের উদ্দেশ্য।
চারজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী প্রথম এই ধারণাটি নিয়ে কাজ শুরু করেন। পরে তাদের উদ্যোগ বাস্তব পরীক্ষায় রূপ নেয়।
২০০ বর্গমিটার এলাকায় পরীক্ষা
জুন মাসে সুইজারল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি দুটি উলের বিশেষ চাদর তসানফ্লুরন হিমবাহের প্রায় ২০০ বর্গমিটার এলাকায় বিছিয়ে দেওয়া হয়।
গবেষকেরা পুরো গ্রীষ্মজুড়ে উলের আবরণের কার্যকারিতা প্রচলিত কৃত্রিম আবরণের সঙ্গে তুলনা করেন। প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর নেওয়া হয় বিভিন্ন পরিমাপ।
প্রাথমিক ফলাফল গবেষকদেরও বেশ অবাক করেছে। তাদের হিসাবে, উলের তৈরি আবরণও কৃত্রিম আবরণের মতোই বরফ গলার হার কমাতে সক্ষম হয়েছে।
উল দিয়ে তৈরি আবরণের স্থায়িত্ব নিয়েও শুরুতে সংশয় ছিল। কিন্তু পরীক্ষার পর সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে।
গবেষকদের একজন শিক্ষার্থী জানান, শুরুতে তারা জানতেন না উল কতটা কার্যকর হবে। এখন পরীক্ষার ফলাফল শুধু চোখে দেখা যাচ্ছে না, হাত দিয়েও অনুভব করা যাচ্ছে। তাদের মতে, পরীক্ষাটি আশাব্যঞ্জকভাবে সফল হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান নয় উল
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করে বলেছেন, ভেড়ার উল দিয়ে হিমবাহ ঢেকে দেওয়া কোনোভাবেই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের স্থায়ী সমাধান নয়।
সুইজারল্যান্ডের হিমবাহের মোট এলাকার মাত্র প্রায় ০ দশমিক ০২ শতাংশ বর্তমানে এ ধরনের সুরক্ষামূলক আবরণ দিয়ে ঢাকা হয়। ফলে এর প্রভাব খুবই সীমিত।
বিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ রক্ষার একমাত্র কার্যকর পথ হলো বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো ছাড়া বিশ্বজুড়ে দ্রুত বরফ গলার প্রবণতা থামানো সম্ভব নয়।
তবু ভেড়ার উল দিয়ে হিমবাহ রক্ষার এই পরীক্ষা দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কখনো কখনো খুব সাধারণ ও অবহেলিত প্রাকৃতিক উপাদানও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















