১১:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইমরানকে নিয়ে মুখ খুললেন ওয়াসিম, চাইলেন ‘ন্যায্য আচরণ’ বিরোধ মীমাংসার বৈঠকেই ছুরিকাঘাত, সাতকানিয়ায় প্রাণ গেল ১৯ বছরের হামিমের মার্কিন ডুবো ড্রোন বিকল, জব্দের দাবি ইরানের মার্কিন হামলায় ৫ ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস, পাল্টা জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বারডেম হাসপাতালের ১৬ তলা ভবন থেকে পড়ে যুবকের মৃত্যু ঢাকার যেসব এলাকায় বৃহস্পতিবার ৮ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না উত্তরার শপিং মলের রেস্টুরেন্টে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৬ ইউনিট চট্টগ্রামে ট্যাংকের গোলাবর্ষণ অনুশীলনে দুই সেনাসদস্য নিহত, কর্মকর্তা আহত মাধ্যমিক শিক্ষকদের সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, শেষ সময় ৩০ সেপ্টেম্বর সাতকানিয়ায় পূর্ববিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে তরুণ নিহত, কিশোর গ্যাং সদস্য আটক

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মিসরের সামনে যোগ দেওয়ার চেয়েও বড় প্রশ্ন

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ৭ আগস্ট ২০২৬ স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তবে এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এর তিন স্বাক্ষরকারী নয়; বরং চতুর্থ দেশ মিসর এতে নেই। কায়রোর জন্য এখন মূল প্রশ্ন চুক্তিতে যোগ দেওয়া হবে কি না—শুধু তা নয়। বরং কীভাবে নিজের কৌশলগত অবস্থান, রাজনৈতিক প্রভাব ও জাতীয় স্বার্থ কাজে লাগিয়ে উদীয়মান নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করা যায়, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

চুক্তিটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা, অবকাঠামো ও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা আঞ্চলিক পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলেছে।

চুক্তির শক্তি এখনো পরীক্ষিত হয়নি

প্রকাশিত চুক্তির বিবরণ বেশ সংক্ষিপ্ত। এতে তিন দেশ সম্মিলিত নিরাপত্তা, প্রতিরোধক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, কোনো একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

কিন্তু এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তার অনেকটাই এখনো অস্পষ্ট। কোন দেশ কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, যৌথ কমান্ড থাকবে কি না, স্থায়ী বাহিনী বা অভিন্ন সামরিক বাজেট গঠিত হবে কি না—এসব বিষয়ে প্রকাশ্য নথিতে বিস্তারিত নেই। একইভাবে, হামলা বা আসন্ন হুমকি কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত কে নেবে, তাও পরিষ্কার নয়।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান চুক্তির সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতিকে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে ন্যাটোর সঙ্গে মক্কা চুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এক করে দেখার সুযোগ এখনো নেই। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে যৌথ মহড়া, সামরিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা কতটা বাস্তব রূপ পায় তার ওপর।

কারা কীভাবে দেখছে

চুক্তিটি নিয়ে আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াও এর ভবিষ্যৎ চরিত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান মুসলিম সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়াকে স্বাগত জানালেও চুক্তিতে তার সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে। ইরান যদি শেষ পর্যন্ত এতে যুক্ত হয়, তাহলে চুক্তির কৌশলগত চরিত্রই বদলে যেতে পারে। যে কাঠামোকে কেউ কেউ ইরানের শক্তির ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, সেখানে ইরান নিজেই সদস্য হয়ে গেলে তার উদ্দেশ্য আরও বিস্তৃত মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে যেতে পারে।

ইসরায়েলের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক ভূমিকা এবং মিসরের সম্ভাব্য যোগদান। অন্যদিকে ভারত মূলত দেখতে চাইছে, চুক্তিটি বাস্তবে সদস্য দেশগুলোর চলমান নিরাপত্তা সংকটে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি-তুরস্ক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হলে তা ভারতের কৌশলগত হিসাবেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও গ্রিসের উদ্বেগ আবার ভিন্ন। আবুধাবি সৌদি নিরাপত্তায় পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, আর এথেন্স তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধিকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। মিসরের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কায়রোর সঙ্গে এসব দেশেরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।

আর ওয়াশিংটনের অবস্থান আপাতত ইতিবাচক। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৭ আগস্ট চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও কার্যকরভাবে নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। এর অর্থ হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তার বোঝা ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতাকে সমর্থন করছে, যদিও নিজস্ব সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বজায় রাখছে।What are the challenges facing the Mecca agreement?

আর-৪-এর ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে

মক্কা চুক্তিকে আর-৪ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইতোমধ্যেই আর-৪ নামে একটি পরামর্শ কাঠামো গড়ে তুলেছে। ২১ জুন মিসরে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়েছে। এরপর ৫ আগস্ট আম্মানে আবারও চার দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, উত্তেজনা প্রশমন এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হয়।

এখন সমস্যাটি হলো, আর-৪-এর তিন সদস্য প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এর ফলে আর-৪ কি কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরামর্শের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে, নাকি মক্কা চুক্তির সঙ্গে সমান্তরালভাবে আরও কার্যকর থাকবে—তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে দুই কাঠামোকে প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে পরস্পরের পরিপূরক করা। মক্কা চুক্তি সামরিক সহযোগিতার গভীরতা বাড়াবে, আর আর-৪ বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে। এমন ব্যবস্থায় মিসর তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা ধরে রাখতে পারবে।

মিসরের দ্বিধার কারণ শুধু রাজনীতি নয়

তুরস্ক ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে মিসরকে মক্কা চুক্তির স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলেছে। কিন্তু কায়রো বিষয়টি অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে দেখছে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি স্পষ্ট করেছেন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সঙ্গে যদি কোনো বাধ্যবাধকতা যুক্ত থাকে, তাহলে সংবিধান ও আইনি অঙ্গীকারের আলোকে গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এর পেছনে সাংবিধানিক বাস্তবতাও রয়েছে। মিসরের সংবিধানের ১৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের করা চুক্তির জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন এবং শান্তি, জোট বা সার্বভৌম অধিকারসংক্রান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান রয়েছে। ১৫২ অনুচ্ছেদ যুদ্ধ ঘোষণা ও দেশের বাইরে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করে।

এর সঙ্গে ১৯৭৯ সালের মিসর-ইসরায়েল শান্তিচুক্তিও বিবেচনায় রাখতে হবে। মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই শান্তিচুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কারণ নেই। তবে ভবিষ্যতে ইসরায়েলকে ঘিরে কোনো সংকট তৈরি হলে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার কীভাবে কার্যকর হবে, তা আগে থেকেই স্পষ্ট করা কায়রোর জন্য অপরিহার্য।

কায়রোর জন্য আসল হিসাব

মিসরের কৌশলগত অবস্থান অন্য তিন সদস্যের তুলনায় আলাদা। গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস, তুরস্ক, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে কায়রোর সম্পর্ক রয়েছে। একই সময়ে লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল, সুদান, লিবিয়া, সমুদ্র নিরাপত্তা ও পানিসম্পদ—এমন একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা মক্কা চুক্তির অন্য সদস্যদের অগ্রাধিকারের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

তাই মিসরের জন্য চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়া—দুইটিই সরল সিদ্ধান্ত নয়। কায়রো আঞ্চলিক প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে, কিন্তু এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নিতে চাইবে না যা ভবিষ্যতের পৃথক সংকটে তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করে।

এ কারণেই প্রশ্নটি ‘মিসর কি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেবে?’—এভাবে দেখা যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কোন শর্তে যোগ দিলে মিসরের নিরাপত্তা, প্রভাব ও কৌশলগত স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে?’

চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তিন বিষয়

প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। তিন দেশ সামরিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতাকে কতটা কার্যকর কাঠামোয় পরিণত করতে পারে, সেটিই চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতার প্রথম পরীক্ষা।

দ্বিতীয়ত, সংকটের সময় বাস্তব প্রতিরোধক্ষমতা। কোনো সদস্য গুরুতর নিরাপত্তা সংকটে পড়লে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা সামরিক সহায়তা ও প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে, তার ওপর চুক্তির গুরুত্ব নির্ভর করবে।

তৃতীয়ত, সম্প্রসারণ। নতুন সদস্য যুক্ত হলে তাদের নিরাপত্তা-ধারণা ও জাতীয় স্বার্থের পার্থক্য এতটা বেড়ে যায় কি না, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে—সেটিও বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি নতুন নিরাপত্তা ছাতার বদলে খণ্ডিত কাঠামো

মক্কা চুক্তি এবং আর-৪-কে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখলে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়। অঞ্চলটির দেশগুলো হয়তো একটি একক, সর্বব্যাপী নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক জোট তৈরি করতে বেশি আগ্রহী। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে এই ধরনের সীমিত ও নমনীয় অংশীদারত্ব অনেক সময় বড় কোনো স্থায়ী জোটের চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।

সে অর্থে মক্কা চুক্তি হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একক নিরাপত্তা ছাতার সূচনা নয়। বরং এটি এমন একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ, যেখানে পরিস্থিতি ও স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণের মাত্রা বদলাতে পারে।

মিসরের জন্য তাই এখনই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। চুক্তির লক্ষ্য, সামরিক সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ এবং আর-৪-এর ওপর এর প্রভাব—সবকিছু আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার। আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা ও অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত মিসরের সবচেয়ে বিচক্ষণ কৌশল হতে পারে অপেক্ষা করে দেখা—তবে নিষ্ক্রিয়ভাবে নয়। বরং আলোচনার টেবিলে নিজের প্রভাব ধরে রেখে, সম্ভাব্য শর্তগুলো মূল্যায়ন করে এবং প্রয়োজন হলে চুক্তির ভবিষ্যৎ কাঠামো গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইমরানকে নিয়ে মুখ খুললেন ওয়াসিম, চাইলেন ‘ন্যায্য আচরণ’

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মিসরের সামনে যোগ দেওয়ার চেয়েও বড় প্রশ্ন

০৮:৪৭:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ৭ আগস্ট ২০২৬ স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তবে এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এর তিন স্বাক্ষরকারী নয়; বরং চতুর্থ দেশ মিসর এতে নেই। কায়রোর জন্য এখন মূল প্রশ্ন চুক্তিতে যোগ দেওয়া হবে কি না—শুধু তা নয়। বরং কীভাবে নিজের কৌশলগত অবস্থান, রাজনৈতিক প্রভাব ও জাতীয় স্বার্থ কাজে লাগিয়ে উদীয়মান নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করা যায়, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

চুক্তিটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা, অবকাঠামো ও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা আঞ্চলিক পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলেছে।

চুক্তির শক্তি এখনো পরীক্ষিত হয়নি

প্রকাশিত চুক্তির বিবরণ বেশ সংক্ষিপ্ত। এতে তিন দেশ সম্মিলিত নিরাপত্তা, প্রতিরোধক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, কোনো একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

কিন্তু এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তার অনেকটাই এখনো অস্পষ্ট। কোন দেশ কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, যৌথ কমান্ড থাকবে কি না, স্থায়ী বাহিনী বা অভিন্ন সামরিক বাজেট গঠিত হবে কি না—এসব বিষয়ে প্রকাশ্য নথিতে বিস্তারিত নেই। একইভাবে, হামলা বা আসন্ন হুমকি কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত কে নেবে, তাও পরিষ্কার নয়।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান চুক্তির সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতিকে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে ন্যাটোর সঙ্গে মক্কা চুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এক করে দেখার সুযোগ এখনো নেই। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে যৌথ মহড়া, সামরিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা কতটা বাস্তব রূপ পায় তার ওপর।

কারা কীভাবে দেখছে

চুক্তিটি নিয়ে আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াও এর ভবিষ্যৎ চরিত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান মুসলিম সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়াকে স্বাগত জানালেও চুক্তিতে তার সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে। ইরান যদি শেষ পর্যন্ত এতে যুক্ত হয়, তাহলে চুক্তির কৌশলগত চরিত্রই বদলে যেতে পারে। যে কাঠামোকে কেউ কেউ ইরানের শক্তির ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, সেখানে ইরান নিজেই সদস্য হয়ে গেলে তার উদ্দেশ্য আরও বিস্তৃত মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে যেতে পারে।

ইসরায়েলের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক ভূমিকা এবং মিসরের সম্ভাব্য যোগদান। অন্যদিকে ভারত মূলত দেখতে চাইছে, চুক্তিটি বাস্তবে সদস্য দেশগুলোর চলমান নিরাপত্তা সংকটে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি-তুরস্ক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হলে তা ভারতের কৌশলগত হিসাবেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও গ্রিসের উদ্বেগ আবার ভিন্ন। আবুধাবি সৌদি নিরাপত্তায় পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, আর এথেন্স তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধিকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। মিসরের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কায়রোর সঙ্গে এসব দেশেরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।

আর ওয়াশিংটনের অবস্থান আপাতত ইতিবাচক। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৭ আগস্ট চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও কার্যকরভাবে নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। এর অর্থ হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তার বোঝা ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতাকে সমর্থন করছে, যদিও নিজস্ব সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বজায় রাখছে।What are the challenges facing the Mecca agreement?

আর-৪-এর ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে

মক্কা চুক্তিকে আর-৪ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইতোমধ্যেই আর-৪ নামে একটি পরামর্শ কাঠামো গড়ে তুলেছে। ২১ জুন মিসরে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়েছে। এরপর ৫ আগস্ট আম্মানে আবারও চার দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, উত্তেজনা প্রশমন এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হয়।

এখন সমস্যাটি হলো, আর-৪-এর তিন সদস্য প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এর ফলে আর-৪ কি কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরামর্শের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে, নাকি মক্কা চুক্তির সঙ্গে সমান্তরালভাবে আরও কার্যকর থাকবে—তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে দুই কাঠামোকে প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে পরস্পরের পরিপূরক করা। মক্কা চুক্তি সামরিক সহযোগিতার গভীরতা বাড়াবে, আর আর-৪ বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে। এমন ব্যবস্থায় মিসর তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা ধরে রাখতে পারবে।

মিসরের দ্বিধার কারণ শুধু রাজনীতি নয়

তুরস্ক ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে মিসরকে মক্কা চুক্তির স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলেছে। কিন্তু কায়রো বিষয়টি অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে দেখছে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি স্পষ্ট করেছেন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সঙ্গে যদি কোনো বাধ্যবাধকতা যুক্ত থাকে, তাহলে সংবিধান ও আইনি অঙ্গীকারের আলোকে গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এর পেছনে সাংবিধানিক বাস্তবতাও রয়েছে। মিসরের সংবিধানের ১৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের করা চুক্তির জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন এবং শান্তি, জোট বা সার্বভৌম অধিকারসংক্রান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান রয়েছে। ১৫২ অনুচ্ছেদ যুদ্ধ ঘোষণা ও দেশের বাইরে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করে।

এর সঙ্গে ১৯৭৯ সালের মিসর-ইসরায়েল শান্তিচুক্তিও বিবেচনায় রাখতে হবে। মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই শান্তিচুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কারণ নেই। তবে ভবিষ্যতে ইসরায়েলকে ঘিরে কোনো সংকট তৈরি হলে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার কীভাবে কার্যকর হবে, তা আগে থেকেই স্পষ্ট করা কায়রোর জন্য অপরিহার্য।

কায়রোর জন্য আসল হিসাব

মিসরের কৌশলগত অবস্থান অন্য তিন সদস্যের তুলনায় আলাদা। গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস, তুরস্ক, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে কায়রোর সম্পর্ক রয়েছে। একই সময়ে লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল, সুদান, লিবিয়া, সমুদ্র নিরাপত্তা ও পানিসম্পদ—এমন একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা মক্কা চুক্তির অন্য সদস্যদের অগ্রাধিকারের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

তাই মিসরের জন্য চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়া—দুইটিই সরল সিদ্ধান্ত নয়। কায়রো আঞ্চলিক প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে, কিন্তু এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নিতে চাইবে না যা ভবিষ্যতের পৃথক সংকটে তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করে।

এ কারণেই প্রশ্নটি ‘মিসর কি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেবে?’—এভাবে দেখা যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কোন শর্তে যোগ দিলে মিসরের নিরাপত্তা, প্রভাব ও কৌশলগত স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে?’

চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তিন বিষয়

প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। তিন দেশ সামরিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতাকে কতটা কার্যকর কাঠামোয় পরিণত করতে পারে, সেটিই চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতার প্রথম পরীক্ষা।

দ্বিতীয়ত, সংকটের সময় বাস্তব প্রতিরোধক্ষমতা। কোনো সদস্য গুরুতর নিরাপত্তা সংকটে পড়লে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা সামরিক সহায়তা ও প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে, তার ওপর চুক্তির গুরুত্ব নির্ভর করবে।

তৃতীয়ত, সম্প্রসারণ। নতুন সদস্য যুক্ত হলে তাদের নিরাপত্তা-ধারণা ও জাতীয় স্বার্থের পার্থক্য এতটা বেড়ে যায় কি না, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে—সেটিও বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি নতুন নিরাপত্তা ছাতার বদলে খণ্ডিত কাঠামো

মক্কা চুক্তি এবং আর-৪-কে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখলে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়। অঞ্চলটির দেশগুলো হয়তো একটি একক, সর্বব্যাপী নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক জোট তৈরি করতে বেশি আগ্রহী। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে এই ধরনের সীমিত ও নমনীয় অংশীদারত্ব অনেক সময় বড় কোনো স্থায়ী জোটের চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।

সে অর্থে মক্কা চুক্তি হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একক নিরাপত্তা ছাতার সূচনা নয়। বরং এটি এমন একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ, যেখানে পরিস্থিতি ও স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণের মাত্রা বদলাতে পারে।

মিসরের জন্য তাই এখনই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। চুক্তির লক্ষ্য, সামরিক সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ এবং আর-৪-এর ওপর এর প্রভাব—সবকিছু আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার। আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা ও অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত মিসরের সবচেয়ে বিচক্ষণ কৌশল হতে পারে অপেক্ষা করে দেখা—তবে নিষ্ক্রিয়ভাবে নয়। বরং আলোচনার টেবিলে নিজের প্রভাব ধরে রেখে, সম্ভাব্য শর্তগুলো মূল্যায়ন করে এবং প্রয়োজন হলে চুক্তির ভবিষ্যৎ কাঠামো গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে।