অস্কারজয়ী নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনির নতুন তথ্যচিত্র ‘মাস্ক’ ঘিরে ইতোমধ্যেই তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ৮ সেপ্টেম্বর প্রদর্শিত প্রায় চার ঘণ্টার এই তথ্যচিত্রে টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের নানা বিতর্কিত দিক তুলে ধরা হয়েছে।
তথ্যচিত্রটি নির্মাণের শুরু থেকেই মাস্ক ও গিবনির মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ চলে আসছে। ২০২৩ সালে ছবিটির ঘোষণা দেওয়ার পর মাস্ক এটিকে তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আক্রমণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। গিবনি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, ছবিটি না দেখে মাস্ক কীভাবে এমন মন্তব্য করছেন।
মাস্ক নিজে অবশ্য তথ্যচিত্রটির জন্য নির্মাতার সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি। তারপরও গিবনির দল তাঁকে ছবিতে উপস্থিত করার অভিনব পদ্ধতি নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মাস্কের বিভিন্ন প্রকাশ্য সাক্ষাৎকার থেকে তাঁর একটি কৃত্রিম অবয়ব তৈরি করা হয়েছে, যা ছবির বিভিন্ন অংশে মাস্কের বক্তব্যের আদলে মন্তব্য করে।
টেসলার স্বয়ংক্রিয় গাড়ি নিয়ে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে
তথ্যচিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে টেসলার স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালনা প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নির্মাতা টেসলার প্রচারণায় গাড়িকে প্রায় সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হিসেবে তুলে ধরার দৃশ্যের সঙ্গে একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার দৃশ্য পাশাপাশি রেখেছেন।
২০১৬ সালে প্রকাশিত টেসলার একটি প্রচারণামূলক ভিডিওতে গাড়িটিকে চালকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চলতে দেখা যায়। এর বিপরীতে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কি লার্গোতে টেসলার স্বয়ংক্রিয় চালনা ব্যবস্থা ব্যবহার করা একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। এতে একজন নিহত এবং আরেকজন গুরুতর আহত হন।
পরে এক রুশ হ্যাকার দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হন—যে তথ্য টেসলা আগে নিজেদের কাছে নেই বলে জানিয়েছিল। মামলায় শেষ পর্যন্ত একটি জুরি টেসলাকে দুর্ঘটনার জন্য আংশিক দায়ী করে এবং ক্ষতিপূরণ ও শাস্তিমূলক অর্থদণ্ড মিলিয়ে ২৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। টেসলা অবশ্য সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
গিবনির তথ্যচিত্রে ঘটনাটি নতুন করে বড় দর্শকসমাজের সামনে আসায় টেসলার ভাবমূর্তিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন নির্মাতা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্বাচন প্রভাবিত করার আশঙ্কা
তথ্যচিত্রের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর অংশগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দক্ষতা বিভাগে মাস্কের ভূমিকা নিয়ে।
মাস্ক ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারি ব্যয় কমানো এবং প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তবে তথ্যচিত্রে কয়েকজন প্রযুক্তি সাংবাদিক দাবি করেছেন, সরকারি দক্ষতা বিভাগে কাজ করার সময় মাস্কের দল বিপুল পরিমাণ মার্কিন নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নাগাল পেয়েছিল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্যতম পথিকৃৎ জিওফ্রি হিন্টনও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, এই ধরনের তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত বা বিকৃত করার চেষ্টা করা হতে পারে।
হিন্টনের বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চায়, তাহলে নাগরিকদের বিস্তারিত তথ্য হাতে থাকা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। সরকারি দক্ষতা বিভাগের কার্যক্রম তাঁর কাছে সেই ধরনের সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।
তবে তথ্যচিত্রে হিন্টন তাঁর আশঙ্কার পক্ষে আরও বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। নির্মাতা গিবনি বরং একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছেন—মাস্ক কি মানুষকে সংযুক্ত করতে চান, নাকি নিয়ন্ত্রণ করতে চান?
ব্যক্তিগত জীবন ও সন্তান নিয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি
তথ্যচিত্রের আরেকটি আলোচিত অংশ মাস্কের ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর বহু সন্তানকে ঘিরে।
মাস্কের সাবেক স্ত্রী জাস্টিন মাস্কের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ অ্যাশলি সেন্ট ক্লেয়ারও ছবিতে কথা বলেছেন। সেন্ট ক্লেয়ারের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্ক তাঁকে অনুসরণ করার পর তাঁদের যোগাযোগ শুরু হয় এবং মাস্ক তাঁকে আরও সন্তান নেওয়ার কথা বলতেন।
সেন্ট ক্লেয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তাঁদের সম্পর্কের অবনতি হলে তাঁকে একটি গোপনীয়তা চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিনিময়ে দেড় কোটি ডলার এককালীন এবং পরবর্তী ২১ বছর প্রতি মাসে এক লাখ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন বলে জানান।
তিনি আরও দাবি করেন, এক রাতে মাস্ক তাঁর সঙ্গে থাকার সময় মঙ্গোলীয় শাসক কুবলাই খানের জীবন নিয়ে একটি অনুষ্ঠান শুনছিলেন। কুবলাই খানের বহু সন্তান থাকার প্রসঙ্গের পর মাস্ক তাঁকে এমন একটি বার্তা পাঠান, যেখানে গৃহযুদ্ধের আগে তাঁর বিপুলসংখ্যক সন্তান প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
সেন্ট ক্লেয়ারের দাবি, শুধু তাঁর কাছেই নয়, সন্তান নেওয়ার উদ্দেশ্যে মাস্ক আরও অনেক নারীর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ করেছিলেন।
তবে এসব বক্তব্যের বিষয়ে মাস্কের কাছ থেকে তথ্যচিত্র নির্মাতারা কোনো মন্তব্য পাননি।
মুক্তির আগেই বিতর্কের কেন্দ্রে ‘মাস্ক’
তথ্যচিত্রটি নিয়ে মাস্কের সমর্থকরাও ইতোমধ্যে সরব হয়েছেন। সরকারি দক্ষতা বিভাগের সাবেক যোগাযোগ পরিচালক কেটি মিলার ছবিটিকে কাল্পনিক এবং মাস্ককে হেয় করার উদ্দেশ্যে নির্মিত বলে মন্তব্য করেছেন। মাস্ক তাঁর সেই মন্তব্যের জবাবে শুধু লিখেছেন, ‘ঠিক তাই’।
অন্যদিকে গিবনির দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট—তিনি মাস্কের সাফল্যের প্রচলিত গল্পের বাইরে গিয়ে তাঁর ক্ষমতা, প্রযুক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত আচরণের বিতর্কিত দিকগুলো দর্শকদের সামনে আনতে চান।
প্রায় চার ঘণ্টার এই তথ্যচিত্র আগামী ১৬ অক্টোবর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। মুক্তির পর ছবিটি মাস্কের জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















