মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টি নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে দেশটির প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি এই অর্থকে ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ বা ‘ট্রাম্প লভ্যাংশ’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে এই অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে, এর আইনি ভিত্তি কী এবং অর্থের উৎস কোথা থেকে আসবে—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
বুধবার টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির প্রথমবারের মতো আয়োজিত মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলনের প্রথম দিনের সমাপনী বক্তব্যে ট্রাম্প এই প্রস্তাব দেন। প্রায় দুই ঘণ্টার বক্তব্যে তিনি নিজেকেই আগামী নভেম্বরের নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে তিনি এমন সময়ে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যখন জনমত জরিপে তাঁর জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ট্রাম্প তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে সাংবিধানিকভাবে বাধাগ্রস্ত। ফলে রিপাবলিকানদের এই মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলনে তাঁর ভূমিকা শুধু বর্তমান নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় রাতে বৃহস্পতিবার প্রধান বক্তব্য দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। পরে দুই দিনের এই টেলিভিশনকেন্দ্রিক সম্মেলনের শেষ বক্তব্যও দেবেন ট্রাম্প। ভ্যান্সের বক্তব্যকে অনেকেই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাঁর প্রাথমিক রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন।
ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রায় ২৭ কোটি মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ৫ হাজার ডলার করে দিলে মোট ব্যয় ১ লাখ কোটি ডলারেরও বেশি হতে পারে। ফলে এই অর্থের ব্যবস্থা কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এমন একটি অর্থপ্রদানের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিপাবলিকানদের এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল ট্রাম্পের নীতিগুলো তুলে ধরা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের পক্ষে ভোটারদের উজ্জীবিত করা। কিন্তু সম্মেলনের অধিকাংশ বক্তার বক্তব্যে ট্রাম্পের নীতির পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটদের তীব্র আক্রমণই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
রিপাবলিকানদের কেউ কেউ সম্মেলনটিকে মজা করে ‘ট্রাম্পাপালুজা’ বলছেন। দলের জন্য এটি একই সঙ্গে বড় সুযোগ এবং ঝুঁকির বিষয়। কারণ, ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করে রিপাবলিকানরা সেই ভোটারদের আবারও সক্রিয় করতে চাইছে, যারা দুই বছর আগে তাঁকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী করেছিল। কিন্তু তাঁর কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ট্রাম্প নিজেই ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, তাঁরা যেন এমনভাবে ভাবেন, যেন তিনিই ব্যালটে প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ভোটারদের তাঁকে ব্যালটে থাকার মতো করে কল্পনা করতে হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কার্যত নভেম্বরের নির্বাচনকে নিজের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার ওপর গণভোটের মতো করে তুলতে চাইছেন।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও কিছু ঘটনা রিপাবলিকানদের জন্য অপ্রত্যাশিত সুবিধা তৈরি করেছে। বুধবার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান একটি আগে ধারণ করা ভিডিওতে তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন পেনসিলভানিয়ার রিপাবলিকান সিনেটর ডেভ ম্যাককরমিককে।
ফেটারম্যান বলেন, তিনি সব সময় সমাজতন্ত্রের চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করবেন। তাঁর এই বক্তব্য রিপাবলিকানদের হাতে ডেমোক্র্যাটদের ‘বামপন্থী’ হিসেবে আক্রমণের জন্য নতুন রাজনৈতিক অস্ত্র তুলে দিতে পারে। তবে ফেটারম্যান নিজে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে আগে জানিয়েছিলেন।
তবে সব রিপাবলিকান নেতা যে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মঞ্চ ভাগ করতে চাইছেন, তা নয়। নির্বাচনী লড়াইয়ে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিতে থাকা কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা সম্মেলনটি এড়িয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে আলাস্কার সিনেটর ড্যান সুলিভান এবং মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্স রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তার সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়কে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে ফেলতে তাঁরা সতর্ক।
সম্মেলনে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের আক্রমণের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং খেলাধুলায় হিজড়া নারীদের অংশগ্রহণের মতো সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইস্যু। বক্তারা বারবার ডেমোক্র্যাটদের ‘সমাজতন্ত্রী’ ও ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে তুলে ধরেন।
সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর টিম স্কট, যিনি রিপাবলিকানদের সিনেট নির্বাচনী প্রচারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, ডেমোক্র্যাটদের ‘বিপজ্জনক, উগ্রপন্থী ও অদ্ভুত’ বলে আক্রমণ করেন।
তবে রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে শুধু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইস্যু নয়, ইরান যুদ্ধও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সম্মেলনে অংশ নেওয়া আলাবামার এক রাজ্য প্রতিনিধি আর্নি ইয়ারব্রো বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কতদিন চলবে, সে বিষয়ে ট্রাম্পকে ভোটারদের আরও স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।
ট্রাম্প ইরানে হামলার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা ঠেকাতেই তিনি হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই তেলের দাম কমে যাবে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার ছয় মাসেরও বেশি সময় পরও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়। ইরান অবশ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন এখন দুই মাসেরও কম দূরে। এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা। জনমত জরিপগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সূচকও বেশ নিচে রয়েছে।
এ অবস্থায় ৫ হাজার ডলারের ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ প্রস্তাব নির্বাচনী প্রচারে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়। একদিকে এটি ভোটারদের কাছে সরাসরি আর্থিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি হিসেবে কাজ করতে পারে, অন্যদিকে এর বিপুল সম্ভাব্য ব্যয়, কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা এবং বাস্তবায়নের আইনি প্রশ্ন রিপাবলিকানদের জন্য নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প আবারও প্রমাণ করছেন যে রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রে তিনিই রয়েছেন। কিন্তু তাঁর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দলকে কতটা লাভ দেবে আর কতটা ঝুঁকিতে ফেলবে, তার উত্তর মিলবে নির্বাচনের ফলাফলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















