যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার গভীর শোক ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করছেন দেশটির মানুষ। এক শতকের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময় পেরিয়ে গেলেও ওই হামলার ক্ষত এখনো মুছে যায়নি। নিহতদের পরিবার, বন্ধু, উদ্ধারকর্মী এবং হামলার পরের প্রজন্মের কাছে ৯/১১ এখনো বেদনা, স্মৃতি ও পরিবর্তিত এক আমেরিকার প্রতীক।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ছিনতাই করা চারটি যাত্রীবাহী বিমান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। দুটি বিমান আঘাত হানে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে। তৃতীয় বিমানটি আঘাত করে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে। আর চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলে বিধ্বস্ত হয়। সব মিলিয়ে ওই হামলায় ২ হাজার ৯৭৭ জন প্রাণ হারান।
নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে স্মরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। ঠিক এই সময়ই আমেরিকান এয়ারলাইনসের ১১ নম্বর ফ্লাইট ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করেছিল।
নিহতদের স্বজনেরা হাতে প্রিয়জনদের ছবি নিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং চার সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এরপর নিহত ২ হাজার ৯৭৭ জনের নাম একে একে পড়ে শোনান তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। ১৯৯৩ সালের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বোমা হামলায় নিহত ছয়জনের নামও পাঠ করা হয়। দীর্ঘ এই নাম পাঠের অনুষ্ঠান কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে।
এবারের অনুষ্ঠানে সময়ের পরিবর্তনের একটি বিশেষ প্রতিচ্ছবিও দেখা গেছে। নিহতদের কয়েকজন স্বজনের সন্তান এমনকি এমন কিছু শিশুও নাম পাঠ করেছে, যারা ২০০১ সালে নিহত সেই স্বজনদের কখনো দেখেনি। তাঁদের কাছে ৯/১১ এখন ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া ইতিহাস।
চারটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সময় এবং টুইন টাওয়ার ধসে পড়ার সময়ও নীরবতা পালন করা হয়। তবে এবারের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো আরও একটি বিশেষ নীরবতা পালন করা হচ্ছে। ২০০১ সালের পর বিষাক্ত ধুলা ও ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসে যেসব মানুষ অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন, তাঁদের স্মরণেও এই নীরবতা পালন করা হয়েছে।
৯/১১-এর প্রত্যক্ষ ক্ষয়ক্ষতি শুধু সেদিনের নিহতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। হামলার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ও মাসের পর মাস উদ্ধারকাজ চালানো হয়। ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধুলা ও অন্যান্য দূষিত পদার্থের সংস্পর্শে আসেন হাজারো উদ্ধারকর্মী, অগ্নিনির্বাপণকর্মী, পুলিশ সদস্য, আশপাশের বাসিন্দা এবং অন্যান্য মানুষ। পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁদের অনেকে নানা অসুস্থতায় আক্রান্ত হন এবং মারা যান।
নিউইয়র্ক সিটি ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ৩৪৩ সদস্য ১১ সেপ্টেম্বরের হামলায় নিহত হন। এরপর ৯/১১-সংক্রান্ত অসুস্থতায় আরও ৬০০-এর বেশি অগ্নিনির্বাপণকর্মী মারা গেছেন। এর মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত এমন সদস্যও রয়েছেন, যারা হামলার পর উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। চলতি বছরেই এ ধরনের অসুস্থতায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভাগটির হিসাবে জানা গেছে।
গ্রাউন্ড জিরোর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া গ্রেগরি কারাফেলো তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু জেমস মার্টেলোর স্মরণে এসেছিলেন। মার্টেলো ক্যান্টর ফিটজেরাল্ড নামের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। ৯/১১ হামলায় প্রতিষ্ঠানটির ৬৫০-এর বেশি কর্মী নিহত হন। কারাফেলো নিজেও দক্ষিণ টাওয়ারের ১৮ তলায় ছিলেন। তবে তিনি সেখান থেকে বের হয়ে বেঁচে যান।
কারাফেলোর কাছে ৯/১১ কোনো দূরের রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং অসংখ্য সাধারণ মানুষের জীবনের করুণ পরিণতি। তাঁর ভাষায়, সেদিনের ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছিলেন তাঁরা যোদ্ধা ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন তাঁর ও আমাদের মতো সাধারণ মানুষ, যারা প্রতিদিনের মতো কাজে গিয়েছিলেন।
নিউইয়র্কের পাশাপাশি ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনেও স্মরণ অনুষ্ঠান হয়েছে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা পেন্টাগনের পশ্চিম পাশে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠান দেখেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকান এয়ারলাইনসের ৭৭ নম্বর ফ্লাইট পেন্টাগনে আঘাত করেছিল। ওই ঘটনায় মোট ১৮৪ জন নিহত হন। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেখানে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
পেনসিলভেনিয়ার শ্যাঙ্কসভিলেও নিহতদের স্মরণে মানুষ জড়ো হয়েছেন। সেখানে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ৯৩ নম্বর ফ্লাইট বিধ্বস্ত হয়েছিল। বিমানটি ওয়াশিংটনের দিকে যাচ্ছিল। তবে বিমানের যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় বিমানটি নির্ধারিত লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে চলেছে ৯/১১-এর প্রভাব
৯/১১ হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বদলায়নি, দেশটির পররাষ্ট্রনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণাকেও গভীরভাবে পরিবর্তন করেছে।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হয়, যা বহু বছর ধরে চলে। এসব যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।
হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে গভীর দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সংহতির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে মুসলিম আমেরিকান এবং মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও বৈষম্যও বেড়ে যায়। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৯/১১-এর প্রভাব এখনো অনেক আমেরিকানের মুসলিমদের সম্পর্কে ধারণায় রয়ে গেছে।
নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানিকেও ৯/১১ স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কিছু রিপাবলিকান নেতা। তবে তিনি সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।
এদিকে ২০০১ সালের পর জন্ম নেওয়া বা খুব অল্প বয়সে থাকা একটি প্রজন্ম এখন বড় হয়ে উঠেছে। তাদের অনেকেই ৯/১১-এর দিনটি নিজের চোখে দেখেনি। তবু ওই হামলার পর বদলে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই তাদের বেড়ে ওঠা। নিরাপত্তা, যুদ্ধ, অভিবাসন, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বৈদেশিক নীতির নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের প্রজন্ম তৈরি হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের কাছে পুরোনো এক শোক
কারোলিন ওগোনোভস্কির বাবা জন ওগোনোভস্কি ছিলেন আমেরিকান এয়ারলাইনসের ১১ নম্বর ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বোস্টন থেকে উড্ডয়নের ৪৭ মিনিট পর বিমানটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করে।
কারোলিনের বয়স এখন ৩৯ বছর। চলতি বছর তাঁর একটি সন্তান জন্ম নিয়েছে। তিনি ছেলের নাম রেখেছেন তাঁর বাবার নামে। ৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তির আগে তিনি শিশুটিকে নিয়ে বাবার সমাধিতে যান। শুক্রবার বোস্টনের স্মরণ অনুষ্ঠানেও অংশ নেন।
বাবার মৃত্যুর ২৫ বছর পর নিজের সন্তানকে নিয়ে তাঁর অনুভূতিতে নতুন এক ধরনের শোক যোগ হয়েছে। তাঁর বাবা কখনো তাঁর নাতিকে দেখতে পারবেন না, আর তাঁর সন্তানও কখনো তার দাদাকে জানতে পারবে না—এই বাস্তবতা তাঁকে নতুন করে কষ্ট দেয়।
কারোলিন মনে করেন, ৯/১১-তে নিহত মানুষদের স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। কারণ তাঁদের জীবন, তাঁদের পরিবার এবং তাঁদের হারানোর গল্প শুধু অতীতের ঘটনা নয়; এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অংশ।
২৫ বছর পরও তাই ৯/১১ শুধু একটি তারিখ নয়। এটি একই সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার মানুষের মৃত্যুর স্মৃতি, উদ্ধারকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি ত্যাগ, বিষাক্ত ধুলায় অসুস্থ হয়ে পরবর্তী সময়ে মারা যাওয়া মানুষের বেদনা এবং একটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস।
একটি পরিষ্কার নীল আকাশের সকালে শুরু হওয়া সেই ভয়াবহতা শেষ হয়ে গেলেও তার প্রভাব শেষ হয়নি। নিহতদের পরিবারে প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা, উদ্ধারকর্মীদের অসুস্থতা, মুসলিম ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর বৈষম্যের স্মৃতি এবং যুদ্ধ ও নিরাপত্তানীতির দীর্ঘ ছায়া—সব মিলিয়ে ৯/১১-এর ক্ষত আজও আমেরিকার সমাজে বহমান।
Sarakhon Report 


















