বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে খুব কমই প্রশ্ন আছে। কিন্তু সামরিক শক্তির প্রকৃত পরীক্ষা শুধু অত্যাধুনিক অস্ত্র, বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট কিংবা বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতিতে নয়; দীর্ঘ সংঘাতের সময় প্রয়োজনীয় অস্ত্র দ্রুত সরবরাহ করার সক্ষমতাতেও। আর সেখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ঘাটতি দ্রুত পূরণ করার মতো দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতাও পর্যাপ্ত নয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ এবং নতুন অস্ত্র সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের আড়ালের দুর্বলতা
একটি দেশের সামরিক শক্তি তখনই কার্যকর থাকে, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্রের জায়গায় দ্রুত নতুন অস্ত্র পৌঁছে দেওয়া যায়। অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন হলে সেগুলোর ধারাবাহিক উৎপাদনও নিশ্চিত করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা এখানেই। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত যদি বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করে, তাহলে বর্তমান মজুত কতদিন টিকবে—এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মজুত কমে গেলে তা পুনর্গঠনে কত সময় লাগবে।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহব্যবস্থায় এই চাপ ইতোমধ্যেই বাস্তব প্রভাব ফেলছে। মিত্র দেশগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অস্ত্র সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্বের সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেসের সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য
এই সংকটকে শুধু বর্তমান প্রশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি বহু বছরের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, বাজেট বরাদ্দ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবু কংগ্রেসের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সামরিক মজুত পুনর্গঠন, প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার জন্য ধারাবাহিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এসব সিদ্ধান্তের অনেকটাই ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে কঠিন। ফলে দ্বিদলীয় সহযোগিতার প্রয়োজন হলেও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বিভাজন সেই কাজকে জটিল করে তুলছে।

এখানে সমস্যাটি শুধু অর্থ বরাদ্দেরও নয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়াতে কারখানা, দক্ষ শ্রমিক, যন্ত্রপাতি, উপাদান এবং সরবরাহকারীদের পুরো একটি নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই অবকাঠামো তৈরি করতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।
অস্ত্রের ঘাটতি কৌশলগত স্বাধীনতাও কমায়
অস্ত্রভাণ্ডার সীমিত হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসরও সংকুচিত হতে পারে। একদিকে ইউরোপ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় একাধিক নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে হলে একই অস্ত্রভাণ্ডার থেকে বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে হয়।
ফলে একটি সংঘাতে অস্ত্রের ব্যবহার শুধু সেই যুদ্ধের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সঙ্গে অন্য সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য অবশিষ্ট মজুতের হিসাবও যুক্ত হয়।
এই বাস্তবতা ইতোমধ্যে মিত্রদের অস্ত্র সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুত পুনর্গঠনের প্রয়োজনের কারণে কিছু মিত্র দেশকে অস্ত্র সরবরাহে কয়েক বছর পর্যন্ত বিলম্বের আশঙ্কা জানানো হয়েছে।

শুধু আরও অস্ত্র নয়, প্রয়োজন উৎপাদনক্ষমতা
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তাই প্রশ্নটি কেবল প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর নয়। আসল প্রশ্ন হলো, সেই অর্থের মাধ্যমে কত দ্রুত এবং কত বড় পরিসরে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও যদি দীর্ঘ সংঘাতে প্রয়োজনীয় অস্ত্রের সরবরাহ ধরে রাখতে না পারে, তাহলে তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সামরিক প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, পর্যাপ্ত মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা ছাড়া তা দীর্ঘমেয়াদি শক্তিতে পরিণত হয় না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অস্ত্র-ঘাটতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছেন। কিন্তু বিতর্কের রাজনৈতিক দিক যাই হোক, অস্ত্রের মজুত, উৎপাদন ও সরবরাহের বাস্তব হিসাব আলাদা বিষয়। সামরিক প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে শুধু আধুনিক রাখাই নয়, দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যেও সেটিকে কার্যকর রাখার মতো শিল্প ও অস্ত্রভিত্তি তৈরি করা। আর সেই কাজ যত দেরি হবে, ভবিষ্যৎ সংকটে ওয়াশিংটনের কৌশলগত বিকল্পও তত সীমিত হতে পারে।











