চীনের কারখানা ও গিগ অর্থনীতির শ্রমজীবী মানুষের জীবন, সংকট ও স্বপ্ন এখন উঠে আসছে নতুন এক সাহিত্যধারায়। ‘শ্রমিক সাহিত্য’ নামে পরিচিত এই ধারায় কারখানার কর্মী, পণ্য সরবরাহকারী ও অভিবাসী শ্রমিকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা কবিতা, প্রবন্ধ ও বইয়ের মাধ্যমে তুলে ধরছেন। একই সঙ্গে এই সাহিত্যধারা জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি সরকারি নজরদারির মধ্যেও পড়ছে।
শ্রমিকজীবনের অদৃশ্য গল্প
চীনের গ্রামাঞ্চল থেকে উন্নত জীবনের আশায় বেইজিংসহ বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমানো চার কোটিরও বেশি মানুষের জীবন এই সাহিত্যধারার অন্যতম প্রধান বিষয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারখানার শ্রমের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক পণ্য সরবরাহ ও গিগ অর্থনীতির কাজও এসব লেখায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
চীনা শ্রমিকদের লেখা বই ও কবিতা দেশের বাইরেও পাঠকের নজর কাড়ছে। হু আনইয়ানের ‘আই ডেলিভার পার্সেলস ইন বেইজিং’ এবং শিয়াও হাইয়ের ‘অ্যাড্রিফট ইন দ্য সাউথ’-এর মতো বইয়ের ইংরেজি অনুবাদও হয়েছে। এসব লেখার প্রতি আগ্রহের একটি কারণ হলো—শহুরে জীবনে যাদের উপস্থিতি সর্বত্র, তাদের কণ্ঠস্বর সাধারণত খুব কমই শোনা যায়।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি
চীনের অর্থনীতিতে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উন্নত জীবনের পুরোনো প্রত্যাশা দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়ও এই সাহিত্যধারায় প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে শ্রমিকদের লেখা শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়; অনেক পাঠকের কাছে তা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
এই সাহিত্যধারার শিকড় অবশ্য আরও পুরোনো। মাও সে তুংয়ের সময় শ্রমিক ও কৃষকদের সমাজের ‘মালিক’ হিসেবে তুলে ধরা হতো। তাদের অতীতের কষ্টের কথা প্রকাশ্যে বলার জন্য উৎসাহ দেওয়া হতো। তবে ম্যাকালেস্টার কলেজের চীনা সাহিত্য বিশেষজ্ঞ শিন ইয়াংয়ের মতে, বর্তমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় শ্রমিকদের অবস্থান আগের তুলনায় অনেক নিচে নেমেছে।
সাহিত্যে কষ্ট, মর্যাদা ও প্রতিরোধ
কিছু লেখায় কারখানার কঠোর শ্রম ও হতাশার চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৪ সালে আত্মহত্যার পর ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠা ফক্সকনের শ্রমিক শু লিঝির কবিতায় সেই যন্ত্রণার প্রতিফলন ছিল। অন্যদিকে ৫৬ বছর বয়সী পণ্য সরবরাহকারী ও কবি ওয়াং জিবিং শ্রমের অমানবিক চাপের মধ্যেও মানুষের মর্যাদা ও টিকে থাকার অভিজ্ঞতা লিখেছেন। জুলাইয়ে তিনি চীনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার লু শুন সাহিত্য পুরস্কার পান।
ওয়াংয়ের পুরস্কার শ্রমিক সাহিত্যের জন্য বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। তবে সাহিত্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তার লেখায় বৈষম্য বা বিদ্যমান ব্যবস্থার সরাসরি সমালোচনার বদলে শ্রমিকের ব্যক্তিগত মর্যাদা, সহনশীলতা ও দৈনন্দিন সংগ্রাম বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে এই ধরনের সাহিত্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
কণ্ঠস্বরের বিস্তার, নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা
শ্রমিক সাহিত্য বহু বছর ধরে লেখকগোষ্ঠী ও অনলাইন স্বপ্রকাশনার মাধ্যমে নিজস্ব পরিসর তৈরি করেছে। এখন মূলধারার প্রকাশনায় প্রবেশের সুযোগ বাড়ায় আরও অনেক শ্রমিক লেখক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই সুযোগ মূলত সেই লেখকদের কাছেই বেশি পৌঁছাবে, যাদের দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কাছে গ্রহণযোগ্য।
তবু শ্রমিক সাহিত্যের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে এসব গল্প মানুষের কাছে কতটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ‘মেড ইন চায়না’ শব্দবন্ধের পেছনে যে বিপুল শ্রম, সময় ও জীবনের গল্প রয়েছে, এই সাহিত্যধারা সেই অদৃশ্য শ্রমিকদের কণ্ঠস্বরই সামনে আনছে।









