কলেজে ভর্তি হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীই মনে করেন, এবার বুঝি জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় শুরু হলো। নতুন বন্ধু, স্বাধীনতা, নতুন পরিবেশ—সব মিলিয়ে কলেজজীবনকে ঘিরে থাকে নানা প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবে ক্যাম্পাসে পা রাখার পর অনেকেরই সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের ফারাক দেখা যায়।
পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারা, একাকীত্ব, পড়াশোনার চাপ, অনিয়মিত ঘুম কিংবা পরীক্ষার উদ্বেগ—সব মিলিয়ে শুরুটা অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তখন কারও মনে হতে পারে, তিনি হয়তো ভুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নিয়েছেন। কেউ আবার ভাবতে পারেন, অন্য সবাই ভালো আছেন, শুধু তিনিই পিছিয়ে পড়ছেন।
কিন্তু এই ধারণা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের জীবনের যে ছবি দেখা যায়, সেখানে সাধারণত সাফল্য ও আনন্দের মুহূর্তগুলোই বেশি থাকে; দুশ্চিন্তা, একাকীত্ব কিংবা ব্যর্থতার গল্পগুলো আড়ালেই থেকে যায়।
২০২৬ সালের বসন্তে আমেরিকান কলেজ হেলথ অ্যাসোসিয়েশন-ন্যাশনাল কলেজ হেলথ অ্যাসেসমেন্টের জরিপে ৮৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৪ হাজারের বেশি স্নাতক শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্তত কিছু সময় সঙ্গীর অভাব, একঘরে হয়ে পড়া কিংবা বিচ্ছিন্নতার অনুভূতির কথা জানিয়েছেন। তবে একই জরিপে ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, তারা নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বোধ করেন।
অর্থাৎ, কলেজে একাকীত্ব বা বাড়ির জন্য মন খারাপ হওয়া মানেই কেউ ভুল জায়গায় আছেন—এমন নয়। বরং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগাটাই স্বাভাবিক।
১. বাড়ির জন্য মন খারাপ হলে ক্যাম্পাসেই নিজের পৃথিবী গড়ে তুলুন
কলেজে নতুন পরিবেশে গিয়ে বাড়ির কথা মনে পড়া খুবই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যারা প্রথমবার দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিবার থেকে দূরে থাকছেন, তাদের জন্য এই পরিবর্তন আরও কঠিন হতে পারে।
তবে সপ্তাহান্তে সুযোগ পেলেই বাড়ি ফিরে যাওয়া সবসময় সমস্যার সমাধান করে না। বরং যাদের বাড়ি কাছে, তারা নিয়মিত বাড়ি গিয়ে খাওয়া, কাপড় ধোয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পান। এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও ক্যাম্পাসে নিজের একটি সামাজিক ও মানসিক পরিসর গড়ে তোলার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে।
তাই বাড়ির কথা মনে পড়লে নিজেকে ঘরের মধ্যে আটকে না রেখে ক্যাম্পাসের জীবনে ধীরে ধীরে যুক্ত হওয়া জরুরি।
নিজের আগ্রহের অন্তত তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কার্যক্রম বেছে নেওয়া যেতে পারে। যেমন—স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বই বা খেলাধুলার ক্লাব, নিজের বিভাগের কোনো সংগঠন কিংবা বিনোদনমূলক দল।
খেলাধুলায় দক্ষ না হলেও সমস্যা নেই। প্রতিযোগিতামূলক খেলার পাশাপাশি আনন্দের জন্য নানা ধরনের খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডেও অংশ নেওয়া যায়।
মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের মতো আগ্রহ ও মানসিকতার মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। কলেজের শুরুতে যে বন্ধুত্ব বা সংগঠন বেছে নেওয়া হবে, সেটিই সারাজীবনের জন্য ধরে রাখতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজের জন্য উপযুক্ত মানুষ ও পরিবেশ খুঁজে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
২. ভালো ঘুমকে পড়াশোনারই একটি অংশ হিসেবে দেখুন
কলেজজীবনে ঘুমকে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা হয়। অথচ পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম না হলে এর প্রভাব পড়ে মেজাজ, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং শেখার ক্ষমতার ওপর।
ঘুমের ঘাটতিতে আবেগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে। নতুন তথ্য শেখা ও মনে রাখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। মনোযোগ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এরপর পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না এলে তৈরি হতে পারে আরও বেশি উদ্বেগ—যা আবার পরবর্তী পড়াশোনাকেও কঠিন করে তোলে।
আবাসিক হলে ভালো ঘুম পাওয়া অনেক সময় সহজ নয়। কক্ষের শব্দ, আলো, গরম কিংবা রুমমেটের ভিন্ন জীবনযাপন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই সম্ভব হলে ঘুমের পরিবেশকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা উচিত।
আলো কমাতে ঘুমের মুখোশ, শব্দ কমাতে উপযুক্ত হেডফোন বা ধ্যানের অডিও এবং ঘর ঠান্ডা রাখতে পাখা ব্যবহার করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রুমমেটের সঙ্গে শুরুতেই ঘুমের সময়, শব্দ এবং ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ে পরিষ্কারভাবে কথা বলা।
তবে শুধু কখন ঘুমাতে যাচ্ছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিদিন কখন ঘুম থেকে উঠছেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহের কিছু দিন ভোরে উঠে ক্লাস করা এবং অন্য দিন দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
তাই সম্ভব হলে প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করা ভালো। প্রয়োজন হলে দুপুরের দিকে অল্প সময় বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। আর কোনো দিন রাত জেগে পড়াশোনা বা অন্য কাজে সময় দিলে পরদিন পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ রাখা জরুরি।
৩. স্কুলে ভালো করলেই কলেজেও একই কৌশল কাজ করবে—এমন নয়
কলেজের পড়াশোনা অনেক সময় উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনার চেয়ে কঠিন নয়; তবে এর ধরন ভিন্ন। যে শিক্ষার্থী স্কুলে রচনাধর্মী পরীক্ষায় খুব ভালো করতেন, তিনি কলেজে এসে বহু নির্বাচনী বা সবচেয়ে উপযুক্ত উত্তর বেছে নেওয়ার পরীক্ষায় নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন।
তাই শুরু থেকেই নিজের পড়াশোনার কৌশল নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া দরকার।
এর একটি কার্যকর উপায় হলো প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যেই শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। তাদের নির্ধারিত সাক্ষাতের সময়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দেওয়া যেতে পারে। এতে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে চিনতে পারেন এবং পরবর্তীতে কোনো বিষয়ে সাহায্য চাইতে শিক্ষার্থীরও অস্বস্তি কমে।
সমস্যা হওয়ার পর নয়, সমস্যা হওয়ার আগেই শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা বেশি কার্যকর।
পরীক্ষার সময় ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার পরও যদি উদ্বেগের কারণে উত্তর জানা সত্ত্বেও মাথা ফাঁকা হয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়। ক্যাম্পাসের পরামর্শকেন্দ্র বা শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
২০২৬ সালের জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, উদ্বেগ কোনো একটি বিষয়ে তাদের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে অথবা ডিগ্রি সম্পন্ন করার পথে বিলম্ব ঘটিয়েছে। তাই পরীক্ষার উদ্বেগকে শুধু ‘স্বাভাবিক চাপ’ হিসেবে না দেখে প্রয়োজন হলে সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
৪. মদ্যপানের ঝুঁকি শুধু পানকারীর নয়
সব শিক্ষার্থী মদ্যপান করেন না। কিন্তু কলেজজীবনে কেউ মদ্যপান করলে তার আশপাশের বন্ধুদেরও পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্ব নিতে হতে পারে।
কোনো বন্ধু মদ্যপ অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লে তাকে সহজে জাগানো যাচ্ছে কি না, সেটি খেয়াল করা জরুরি। কাঁধ ধরে নাড়ানোর পরও এবং জোরে ডাকলেও যদি সে সাড়া না দেয় বা খুব সামান্য সাড়া দেয়, তাহলে বিষয়টি জরুরি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
কারণ শেষবার মদ্যপানের পরও কিছু সময় রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা বাড়তে পারে। ফলে একজন ব্যক্তি প্রথমে জাগ্রত থাকলেও পরে অচেতন হয়ে যেতে পারেন। তাই মদ্যপ বন্ধুকে ‘ঘুমিয়ে ঠিক হয়ে যাবে’ ভেবে একা রেখে যাওয়া নিরাপদ নয়।
মদ্যপান সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে কেউ পরিকল্পনার চেয়ে বেশি পান করতে পারেন কিংবা এমন যৌন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা স্বাভাবিক অবস্থায় হয়তো নিতেন না।
অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে যৌনবাহিত সংক্রমণ বা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব ঘটনা একজন শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস এবং পড়াশোনার ওপরও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. সমস্যা বড় হওয়ার আগেই সাহায্য চাইতে শিখুন
গলা ব্যথা থেকে শুরু করে উদ্বেগ, বিষণ্নতা কিংবা পড়াশোনায় সমস্যা—যে বিষয়ই হোক, সংকট তৈরি হওয়ার অপেক্ষা না করাই ভালো।
অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, তাদের সমস্যা হয়তো এতটা গুরুতর নয় যে চিকিৎসক, পরামর্শদাতা বা শিক্ষকের কাছে যেতে হবে। কিন্তু ছোট অবস্থায় কোনো সমস্যা শনাক্ত করা গেলে সেটি মোকাবিলা করাও অনেক সময় সহজ হয়।
কলেজের স্বাস্থ্যসেবা, পরামর্শকেন্দ্র এবং একাডেমিক সহায়তা কেন্দ্রগুলো সেমিস্টারের শুরুতে তুলনামূলকভাবে কম ব্যস্ত থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে শুরুতেই সেসব সেবা নেওয়া ভালো। পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলে এসব কেন্দ্রে অপেক্ষার সময়ও বেড়ে যেতে পারে।
শিক্ষার্থীরা নিয়মিত কোনো ওষুধ সেবন করলে অসুস্থ হওয়ার আগেই ক্যাম্পাসের চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাটি সম্পর্কে জেনে নেওয়া উপকারী। একইভাবে একাডেমিক সহায়তা কেন্দ্রে শুধু ফলাফল খারাপ হওয়ার পর নয়, বরং শুরুতেই যাওয়া যায়—জীবনবৃত্তান্ত হালনাগাদ করা, ভবিষ্যৎ কর্মজীবন সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়া কিংবা প্রথম গবেষণাপত্রে মতামত পাওয়ার জন্যও।
কলেজজীবনের সাফল্যের মানে নিখুঁত হওয়া নয়
কলেজে যারা ভালোভাবে এগিয়ে যান, তারা সব পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া মানুষ নন। তাদেরও কখনো ভুল বন্ধু হয়, কখনো পরীক্ষায় খারাপ ফল আসে, কখনো বাড়ির জন্য মন কাঁদে, কখনো অসুস্থ হয়ে পড়েন কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে অনুতপ্ত হন।
তাদের বিশেষত্ব হলো—তারা সমস্যাকে অস্বীকার করে বসে থাকেন না।
কখন সাহায্য প্রয়োজন, কোথায় সেই সাহায্য পাওয়া যায় এবং প্রয়োজন হলে কীভাবে দ্রুত সেটি নিতে হয়—এই বিষয়গুলো তারা ধীরে ধীরে শিখে নেন।
তাই কলেজজীবনকে নিখুঁত করে তোলার চেষ্টা না করে এটিকে শেখার সময় হিসেবে দেখা উচিত। নতুন মানুষকে চেনা, নিজের জায়গা তৈরি করা, ভুল করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাওয়ার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় পরিণত ও সুস্থ কলেজজীবন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, শুরুটা কঠিন হলেই ধরে নেওয়া উচিত নয় যে পুরো কলেজজীবনও কঠিন হবে। সময়, অভিজ্ঞতা এবং সঠিক সহায়তার মাধ্যমে অনেক কিছুই বদলে যেতে পারে।












