শৈশব বা কৈশোরে বন্ধুত্ব তৈরি করা যতটা সহজ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি ততটাই কঠিন হয়ে ওঠে। পড়াশোনা, চাকরি, পরিবার, দায়িত্ব ও ব্যস্ততার চাপে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সেই পরিচয়কে গভীর বন্ধুত্বে পরিণত করার সুযোগ কমে যায়। অনেকেই তাই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এসে একাকীত্ব অনুভব করেন।
তবে বন্ধুত্ব তৈরি করা শুধু ভাগ্য বা আকস্মিক ঘটনার বিষয় নয়। গবেষণা বলছে, বন্ধুত্বের পেছনে এমন কিছু আচরণ ও দক্ষতা রয়েছে, যেগুলো চর্চার মাধ্যমে শেখা সম্ভব। অর্থাৎ বয়স বাড়লেও নতুন বন্ধু তৈরি করা এবং পুরোনো বন্ধুত্ব ধরে রাখা সম্ভব।
প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) সেন্টার ফর ফ্রেন্ডশিপ রিসার্চের পরিচালক জেইমি ক্রেমস। নিজের জীবনের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতাই তাকে এই বিষয়ে গবেষণায় আগ্রহী করে তোলে।
২০০৮ সালে, তখন তিনি বিশের কোঠার শুরুতে। একদিন নিজের কম্পিউটারে তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু ও বাসার এক সহবাসীর কথোপকথন দেখতে পান। ওই কথোপকথনে তাকে নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল, আর বিষয়টি মোটেই সুখকর ছিল না। ঘটনাটি তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। এরপর থেকেই বন্ধুত্ব কেন তৈরি হয়, কেন ভেঙে যায় এবং কীভাবে তা টিকিয়ে রাখা যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেন তিনি।
ক্রেমসের মতে, বন্ধুত্ব নিয়ে গবেষণা দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে অবহেলিত। মানুষের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় প্রেম, দাম্পত্য কিংবা বৈষম্য ও সামাজিক বিভাজন বেশি গুরুত্ব পেলেও বন্ধুত্বের গুরুত্ব অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। অথচ মানুষের জীবনে বন্ধুত্বের প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক।
বন্ধুত্বের দুটি মূল উপাদান
গবেষকদের মতে, বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার জন্য প্রধানত দুটি বিষয় প্রয়োজন—নিয়মিত যোগাযোগ এবং পারস্পরিক আকর্ষণ বা আগ্রহ।
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ড্যানিয়েল হারুশকার গবেষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্রেমস বলেন, একই মানুষের সঙ্গে বারবার দেখা হওয়া বন্ধুত্বের সম্ভাবনা বাড়ায়। এর জন্য খুব বড় কোনো আয়োজনও প্রয়োজন নেই। যেমন, প্রতি সপ্তাহে একই সময়ে একই কফিশপে গিয়ে বই পড়া বা নিজের কাজ করা—এমন নিয়মিত উপস্থিতিও একই ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এরপর সেই পরিবেশে এমন কারও সঙ্গে পরিচয় হতে পারে, যার সঙ্গে পারস্পরিক আগ্রহ তৈরি হবে।
অর্থাৎ বন্ধুত্ব অনেক সময় হঠাৎ করে তৈরি হলেও তার পেছনে নিয়মিত দেখা হওয়া এবং একে অপরের প্রতি আগ্রহ তৈরির মতো কিছু বাস্তব প্রক্রিয়া কাজ করে।
কোথায় নতুন বন্ধু পাওয়া সহজ
ডার্টমাউথের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেনিস ম্যাকক্যাবে ‘বন্ধুত্বের বাজার’ বা এমন জায়গার কথা বলেছেন, যেখানে অনেক মানুষই নতুন বন্ধুত্ব তৈরিতে আগ্রহী থাকেন।
এ ধরনের জায়গা হতে পারে দৌড়ানোর দল, শিল্পচর্চার ক্লাস, অভিনয় বা তাৎক্ষণিক অভিনয়ের প্রশিক্ষণ, বই পড়ার দল কিংবা এমন কোনো সংগঠন যেখানে একই মানুষদের নিয়মিত দেখা হয়।
বিশেষ করে জীবনে নতুন কোনো পরিচয় বা ভূমিকা তৈরি হলে সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে যাওয়া উপকারী হতে পারে। কেউ নতুন শহরে চলে গেলে, নতুন চাকরিতে যোগ দিলে কিংবা অন্য কোনো নতুন সামাজিক পরিবেশে প্রবেশ করলে একই পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সহজ হতে পারে।
বিদেশে বসবাসকারী মানুষের ক্ষেত্রে অভিবাসী বা প্রবাসী সম্প্রদায়ও এমন একটি জায়গা হতে পারে। একই দেশে না জন্মালেও অন্য দেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন পরিচয় তৈরি করতে পারে। সেই অভিজ্ঞতাই নতুন সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে।
ম্যাকক্যাবের মতে, জীবনে কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবেও নতুন পরিচয় তৈরি হয়। সেই পরিবর্তন বুঝতে পারা এবং একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের খোঁজ করা নতুন বন্ধুত্বের সুযোগ বাড়াতে পারে।
বন্ধুত্ব গভীর করতে সাহায্য চাইতে পারেন
পরিচিত কাউকে বন্ধুতে পরিণত করার ক্ষেত্রে একটি বিষয় অনেকেই এড়িয়ে চলেন—সাহায্য চাওয়া।
বর্তমান সময়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও অ্যাপ মানুষের দৈনন্দিন অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়া, অসুস্থ অবস্থায় বাজার করে দেওয়া, সন্তান দেখাশোনা করা কিংবা ভারী কোনো জিনিস সরাতে সাহায্য করা—এসব কাজের জন্য আমরা আগের মতো বন্ধু বা পরিচিতদের ওপর নির্ভর করি না।
কিন্তু গবেষণা বলছে, কারও কাছে যুক্তিসংগত কোনো সাহায্য চাওয়া সম্পর্ককে বরং আরও ঘনিষ্ঠ করতে পারে। কারণ কেউ যখন অন্যকে সাহায্য করতে পারেন, তখন তার নিজের মধ্যেও ভালো লাগা তৈরি হয়।
অনেকেই মনে করেন, অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া তাকে বিরক্ত বা বিব্রত করতে পারে। কিন্তু ক্রেমসের যুক্তি হলো, বিষয়টিকে অন্য ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাও জরুরি। আপনি যেমন বন্ধুকে সাহায্য করে আনন্দ পান, অন্য ব্যক্তিও আপনাকে সাহায্য করে একই ধরনের ইতিবাচক অনুভূতি পেতে পারেন।
নিজের কিছু কথা বলুন, তবে ধীরে
বন্ধুত্ব গভীর করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো নিজের সম্পর্কে কিছুটা খোলামেলা হওয়া।
ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার কানেকশন প্রজেক্টের পরিচালক অ্যালিসন নাগেলের মতে, গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে কিছু ব্যক্তিগত কথা বললে অন্য ব্যক্তিও নিজের কথা বলতে বেশি আগ্রহী হন। একই সঙ্গে সামান্য ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করে নেওয়া মানুষকে অন্যের কাছে বেশি পছন্দনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নতুন পরিচিত কাউকে প্রথম দেখাতেই জীবনের সব গোপন কথা বলে দিতে হবে।
নাগেল একটি সহজ মানদণ্ডের কথা বলেছেন। নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে—বাসে পাশে বসা এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কি আপনি এই কথাটি বলতেন? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে সেটি হয়তো ব্যক্তিগত বা কিছুটা সংবেদনশীল বিষয়, যা ধীরে ধীরে ভাগ করে নেওয়া যায়।
তবে সম্পর্কের সীমারেখাও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের মতো থাকা এবং সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশ করা ভালো, কিন্তু সম্পর্ক যতটুকু গভীর হয়েছে, তার চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। তাই ধীরে, স্বাভাবিক গতিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই নিরাপদ।
বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে বড় আয়োজন দরকার নেই
নতুন বন্ধুত্ব তৈরি করার চেয়ে অনেক সময় পুরোনো বন্ধুত্ব ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কাজের চাপ, পরিবার ও দূরত্বের কারণে অনেক বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকে না।
এ ক্ষেত্রে ক্রেমসের পরামর্শ খুবই সহজ—কথা বলার জন্য দুই ঘণ্টা সময় বের করার অপেক্ষা না করে ফোন করুন।
মাত্র পাঁচ মিনিটের আন্তরিক কথোপকথনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে যোগাযোগ করার পরিকল্পনা করতে করতে সেটি যদি আর কখনো করা না হয়, তাহলে সেই পরিকল্পনার চেয়ে কয়েক মিনিটের বাস্তব যোগাযোগ অনেক বেশি মূল্যবান।
দৈনন্দিন ছোট ছোট সুযোগও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে কাজে লাগানো যায়।
যেমন, ছোটবেলায় কোনো আত্মীয়ের বানানো বিশেষ খাবারের কথা মনে পড়ল। সেই খাবারের রেসিপি ইন্টারনেটে খুঁজে বের করার বদলে সেই আত্মীয়কে ফোন করে রেসিপিটি জিজ্ঞেস করা যায়। এতে শুধু খাবারের তথ্যই পাওয়া হবে না, কয়েক মিনিটের একটি কথোপকথনও হবে।
এ ধরনের ছোট যোগাযোগগুলো সম্পর্কের দুর্বল হয়ে যাওয়া বন্ধনকে আবার শক্তিশালী করতে পারে।
বন্ধুত্ব শুধু আনন্দের নয়, স্বাস্থ্যেরও বিষয়
বন্ধুত্বের গুরুত্ব শুধু মানসিক স্বস্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে শারীরিক স্বাস্থ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষক জুলিয়ান হোল্ট-লানস্টাডের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামাজিক সংযোগের অভাব স্বাস্থ্যের ওপর এমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট পর্যন্ত ধূমপানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে একাকীত্বের বিষয়টিও ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশটির অর্ধেকের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক কোনো না কোনোভাবে একাকীত্ব অনুভব করেন—এমন তথ্য উদ্ধৃত করে সামাজিক সংযোগের সংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেলও সামাজিক সংযোগ ও একাকীত্ব নিয়ে বিশেষ পরামর্শ প্রকাশ করেন।
বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে মানসিক চাপ ভালোভাবে সামলানো, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং অসুস্থতার ঝুঁকি কমার সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকির মধ্যেও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিছু গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমার সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে ব্যাখ্যা না করে সামাজিক সংযোগ ও স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক হিসেবে দেখা বেশি সতর্কতার।
বন্ধুত্বও শেখা যায়
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বন্ধুত্বকে শুধু ভাগ্যের বিষয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
কখন কোথায় যাওয়া, একই মানুষের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করা, সম্পর্ক তৈরির উপযোগী পরিবেশ বেছে নেওয়া, প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া, নিজের কিছু কথা ধীরে ধীরে ভাগ করে নেওয়া এবং যোগাযোগের ছোট সুযোগগুলো কাজে লাগানো—এসবই বন্ধুত্ব তৈরির বাস্তব দক্ষতা।
একইভাবে, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে নিখুঁত সময় বা বড় আয়োজনের অপেক্ষা না করে ছোট ছোট যোগাযোগ চালু রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রেমসের ভাষায়, বন্ধুত্ব যদি একটি ওষুধ হতো, তাহলে সম্ভবত এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওষুধগুলোর একটি হতো। কারণ মানুষের জীবনে বন্ধুত্ব শুধু আনন্দ বা সঙ্গ দেয় না; সামাজিক সংযোগ মানসিক সুস্থতা, দৈনন্দিন চাপ সামলানো এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।












