২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা নেপালের জলবিদ্যুৎনির্ভর উন্নয়ন মডেলকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এমন দুর্যোগের পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্তার নিয়ে পুনর্বিবেচনার দাবি স্বাভাবিক। তবে বাস্তবতা হলো, এই বিপর্যয় নেপালের জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেনি। বরং সামনে যে পরিবর্তনটি জরুরি, তা হলো, আগের গতিতে নয়, বরং আরও কঠোর প্রযুক্তিগত, নিয়ন্ত্রক ও আর্থিক শর্তের আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।
নেপালের অর্থনীতিতে জলবিদ্যুৎ এখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে পুরো খাত থামিয়ে দিলে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা তৈরি হবে। বর্তমানে প্রায় ২৬০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণাধীন। আরও প্রায় ৩৬০টি প্রকল্প সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা, অর্থায়ন বা অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এই খাতের সঙ্গে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নয়, সিমেন্ট ও ইস্পাত কারখানা, যন্ত্রাংশ নির্মাতা, প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান, পরিবহন সংস্থা, পরামর্শক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, বিমা কোম্পানি, ব্যাংকসহ বহু খাত সরাসরি যুক্ত।
তাই প্রশ্নটি জলবিদ্যুৎ বন্ধ করা হবে কি না, এমন সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কীভাবে ঝুঁকি কমিয়ে জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন অব্যাহত রাখা যায়।

দুই দশকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে
গত ২৫ বছরে নেপাল জলবিদ্যুৎ খাতকে ঘিরে শক্তিশালী দেশীয় দক্ষতা তৈরি করেছে। প্রকৌশলী, জলবিদ্যাবিশারদ, ভূতত্ত্ববিদ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, সুড়ঙ্গ নির্মাণ বিশেষজ্ঞ এবং ঠিকাদাররা পাহাড়ি অঞ্চলের নানা ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করেছেন। হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা, ভূমিধস এবং ভূমিধসে নদী আটকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার মতো ঝুঁকি সম্পর্কে খাতটির অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ একটি ঝুঁকিকে সামনে এনেছে, হিমবাহে আবৃত পাহাড়ি ঢাল ধসে সৃষ্ট বন্যা। ফলে পুরোনো ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি আর যথেষ্ট নয়।
নতুন বাস্তবতায় প্রয়োজন আরও উন্নত তথ্য সংগ্রহ, কঠোর ঝুঁকি বিশ্লেষণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। কোথায় বিদ্যুৎকেন্দ্র বা পানি গ্রহণের অবকাঠামো স্থাপন করা যাবে, তার ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার অবকাঠামো ও পরিকল্পনাও বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
এতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে এবং নির্মাণ শেষ করতে বেশি সময় লাগবে। কিছু অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রকল্প হয়তো আর আর্থিকভাবে লাভজনক থাকবে না। কিন্তু নেপালের জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা এত বিস্তৃত যে শক্তিশালী সম্পদভিত্তি, ভালো যোগাযোগব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি এবং গ্রহণযোগ্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনাসম্পন্ন প্রকল্পগুলো বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে থাকবে।
শুধু জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে
এখানেই নেপালের জ্বালানি নীতিতে আরেকটি পরিবর্তন জরুরি। বর্তমানে ২০৩৫ সালের মধ্যে জলবিদ্যুৎ ছাড়া অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এই লক্ষ্য নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দেশটির হিমালয়ের উত্তরাঞ্চলে সৌর ও বায়ুশক্তির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ট্রান্স-হিমালয় অঞ্চলের কিছু জেলায় সূর্যালোকের প্রাচুর্য, কম মেঘাচ্ছন্ন আকাশ এবং ভালো বায়ুপ্রবাহ রয়েছে। একই সঙ্গে এসব অঞ্চলের অনেক জায়গা হিমালয়ের দক্ষিণ ঢালে দেখা বন্যার ঝুঁকিতে তুলনামূলকভাবে কম আক্রান্ত।
বিশ্বজুড়ে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নেপাল যদি দুর্গম সম্ভাবনাময় এলাকায় সড়ক ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে এসব উৎস জলবিদ্যুতের কার্যকর পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে। ২০৩৫ সালের মধ্যে অ-জলবিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট বিদ্যুতের এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদনের লক্ষ্য নিলে জলবায়ুজনিত পানিপ্রবাহের ঝুঁকির ওপর নির্ভরতা কমবে।
ঝুঁকির মানচিত্র প্রকাশ জরুরি
তবে হিমবাহনির্ভর নদী ও হিমবাহজনিত বিপদের মুখে থাকা নদীকে এক করে দেখা যাবে না। নেপালের ১০ মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার অধিকাংশ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কোনো না কোনোভাবে তুষার ও হিমবাহ গলিত পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সব প্রকল্প একই মাত্রায় হিমবাহজনিত ঝুঁকিতে নেই।
যেসব অববাহিকায় বড় হিমবাহ, অস্থিতিশীল হিমবাহ হ্রদ বা ঝুলন্ত হিমবাহ রয়েছে, সেসব এলাকায় ঝুঁকি আলাদা করে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পানি সম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয়ের উচিত নদী অববাহিকাভিত্তিক হিমবাহজনিত ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা এবং তা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা।
প্রতিটি বিনিয়োগকারীকে আলাদাভাবে একই ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে বাধ্য করা কার্যকর নয়। সরকারের হাতে থাকা তথ্য ও সক্ষমতা ব্যবহার করে পরিকল্পনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়াতেই ঝুঁকি বিবেচনা করা উচিত।
‘শতবর্ষের বন্যা’ ধারণাও বদলাতে হবে

অতীতের বন্যার রেকর্ডের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণের সময় শেষ হয়ে গেছে। যে ধরনের বন্যাকে একসময় ‘শতবর্ষের বন্যা’ বলা হতো, তা যদি এখন অনেক ঘন ঘন দেখা দেয়, তাহলে জলবায়ু ও জলপ্রবাহের নতুন বাস্তবতাকে প্রকৌশল নকশায় প্রতিফলিত করতে হবে।
প্রকল্প অনুমোদনের আগে পুরো অববাহিকাকে বিবেচনায় নিয়ে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এতে অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা, হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ, ভূমিধসে নদী আটকে গিয়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি এবং হিমবাহধসজনিত বন্যা, সবই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
নির্মাণকালীন নিরাপত্তাও বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। নির্মাণস্থলে একসঙ্গে শত শত শ্রমিক থাকতে পারেন। তাই প্রতিটি প্রকল্পের জন্য কার্যকর জরুরি কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, যা নির্মাণ ও উৎপাদন, উভয় পর্যায়েই প্রয়োগযোগ্য হবে।
নিরাপত্তা এখন ব্যবসায়িক প্রয়োজনও
ভবিষ্যতের প্রকল্পে প্রকৌশলগত পরিবর্তনও প্রয়োজন হতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নদীর তলদেশের তুলনায় আরও উঁচুতে স্থাপন করতে হতে পারে। এতে কিছুটা বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা কমলেও বন্যার ঝুঁকি কমবে। গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও উপকেন্দ্রকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে হবে। উচ্চঝুঁকির প্রকল্পে চরম পরিস্থিতিতে পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।

আগাম সতর্কতা, দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি সময়ে দ্রুত প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ করার ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক প্রকৌশল মানদণ্ডে পরিণত হতে পারে। ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানও নিরাপত্তাকে অর্থায়ন ও বিমা ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত করবে, এমন সম্ভাবনা রয়েছে। শক্তিশালী ঝুঁকি মূল্যায়ন ও স্থিতিস্থাপক নকশার প্রকল্প কম ব্যয়ে অর্থায়ন বা বিমা সুবিধা পেতে পারে। বিপরীতে, দুর্বল প্রকল্পকে বেশি ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
২৬ আগস্টের বিপর্যয়ের শিক্ষা তাই জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন বন্ধ করা নয়। শিক্ষা হলো, নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতকে দেশটির পরিবেশগত ও জলবায়ুগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, বৈচিত্র্য এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই ঝুঁকির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
লেখক ; বিকাশ পাণ্ডে উইনরক ইন্টারন্যাশনালের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও বৃত্তাকার অর্থনীতি বিভাগের পরিচালক।












