চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন, কমে যাওয়া অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার মধ্যে বড় ধরনের একীভূতকরণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির দুই শীর্ষ বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা এনআইও ও ঝেজিয়াং গিলি হোল্ডিং গ্রুপ তাদের ব্যাটারি বদল ও চার্জিং-সংক্রান্ত ব্যবসা একীভূত করার চুক্তি করেছে।
চুক্তির আওতায় গিলির ব্যাটারি বদল ব্যবসা এনআইওর তুলনামূলক বড় ব্যাটারি বদল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর বিনিময়ে গিলি ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেবে এবং সম্মিলিত ব্যবসায় ৩০ শতাংশ অংশীদারত্ব পাবে। অন্যদিকে, গিলির বড় বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জিং নেটওয়ার্কের ১০ শতাংশ অংশীদারত্ব নেবে এনআইও।

দুই কোম্পানি জানিয়েছে, সম্মিলিত ব্যাটারি বদল ব্যবসার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার স্টেশন স্থাপন করা। একই সময়ে গিলির চার্জিং নেটওয়ার্ক আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ২২ হাজার স্টেশনে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
শুধু ব্যবসা একীভূত করাই নয়, ব্যাটারি বদল ও দ্রুত চার্জিংয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গাড়ির নকশাতেও সমন্বয় করার কথা জানিয়েছে দুই প্রতিষ্ঠান। এর ফলে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে ব্যাটারি প্রযুক্তি ও চার্জিং ব্যবস্থায় একটি অভিন্ন মান তৈরির পথ কিছুটা সহজ হতে পারে।
ব্যাটারি বদল প্রযুক্তিতে গাড়ি একটি নির্দিষ্ট স্টেশনে গেলে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় খালি ব্যাটারি খুলে সম্পূর্ণ চার্জ থাকা ব্যাটারি বসিয়ে দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে প্রায় তিন থেকে চার মিনিট। অত্যাধুনিক দ্রুত চার্জারেও ব্যাটারির ৮০ শতাংশ চার্জ করতে এর প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগতে পারে।
তবে সুবিধা থাকলেও চীনে এবং বিশ্বের অন্যান্য বাজারে ব্যাটারি বদল ব্যবস্থা এখনো প্রচলিত প্লাগ-ইন চার্জিংয়ের তুলনায় অনেক কম জনপ্রিয়। শিল্প বিশ্লেষকদের একটি অংশও প্রশ্ন তুলেছেন, এই প্রযুক্তি কখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত চার্জিং ব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে কি না।

তবু এনআইও ও গিলির চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দুই কোম্পানি মিলিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ব্যাটারি-চালিত বা প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি বিক্রি করেছে। ফলে তাদের অবকাঠামো ও গাড়ির নকশায় সমন্বয় হলে ভবিষ্যতে ব্যাটারি প্রযুক্তির মান নির্ধারণে এর প্রভাব পড়তে পারে।
চীনের গাড়ি শিল্পে এমন একীভূতকরণের প্রবণতা নতুন নয়। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে গুয়াংঝো অটোমোবাইল গ্রুপ বা জিএসি, ফার্স্ট অটোমোটিভ ওয়ার্কসের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। গত বছর ডংফেং মোটর ও চ্যাংআন অটোমোবাইলের মধ্যে একীভূত হওয়ার আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হয়নি।
এর পেছনে বড় কারণ চীনের গাড়ি শিল্পের অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা। দেশটির কারখানাগুলোতে এত বেশি গাড়ি তৈরির সক্ষমতা রয়েছে যে চীনের পুরো অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের উৎপাদনের সমপরিমাণ গাড়িও তৈরি করা সম্ভব। অথচ চীনের অভ্যন্তরীণ গাড়ির বাজার ২০১৭ সাল থেকে সংকুচিত হচ্ছে।
আবাসন খাতে দীর্ঘ সময়ের মূল্যপতন এবং এর ফলে ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়া গাড়ির বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চীনে গাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।

চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকায় কোম্পানিগুলোর মধ্যে মূল্যযুদ্ধও তীব্র হয়েছে। অনেক নির্মাতা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে গাড়ি বিক্রি করছে। এতে ব্যাপক লোকসান হচ্ছে এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা পরিশোধেও দেরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে চীনের গাড়ি নির্মাতারা বিদেশি বাজারের দিকে বেশি ঝুঁকছে। ২০২০ সালে দেশটি প্রায় ১০ লাখ গাড়ি রপ্তানি করলেও চলতি বছর সেই সংখ্যা অন্তত ১ কোটি ছাড়াতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
চীনা গাড়ির রপ্তানি বাড়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নও উদ্বিগ্ন। ইউরোপের নিজস্ব গাড়ি শিল্প দ্রুত চাপের মুখে পড়ায় চীনা গাড়ির আরও রপ্তানির ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। জার্মান গাড়ি নির্মাতা ফক্সভাগেনও চীনা গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চাপের মুখে পড়ে অতিরিক্ত ৫০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা জানিয়েছে।
চীনের গাড়ি শিল্পে অতিরিক্ত কোম্পানি ও উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। হুয়াংহে ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ভিজিটিং অধ্যাপক ডেভিড ঝাংয়ের মতে, চীনে গাড়ি নির্মাতার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে সামনে একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ ও পুনর্গঠনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

এদিকে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের দ্রুত সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের জন্য যৌথ উদ্যোগের শর্ত আরোপ করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে চীনে বিদেশি গাড়ি নির্মাতাদের স্থানীয় কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের নিয়ম ছিল। এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে চীনা কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের এমন উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে। তাদের বক্তব্য, যৌথ উদ্যোগ বাধ্যতামূলক করা, প্রযুক্তি ভাগাভাগির শর্ত দেওয়া বা এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা বিনিয়োগের পথে গুরুতর বাধা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে এনআইও ও গিলির চুক্তি শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সমঝোতা নয়; এটি চীনের অতিরিক্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতও দিচ্ছে। বাজার সংকোচন, অতিরিক্ত কারখানা, মূল্যযুদ্ধ এবং বিদেশি বাজারে বাড়তে থাকা চাপের মধ্যে টিকে থাকতে ছোট ও দুর্বল নির্মাতাদের সামনে ভবিষ্যতে একীভূত হওয়া বা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চাপ আরও বাড়তে পারে।












