যুক্তরাষ্ট্রে আটটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ১২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে দক্ষিণ কোরিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তির অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও সিউল আলাস্কায় একটি বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি প্রকল্পের সম্ভাব্যতাও পর্যালোচনা শুরু করবে। ওই প্রকল্পের আওতায় উত্তর আলাস্কা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে গ্যাস পরিবহনের জন্য বড় পাইপলাইন এবং বিদেশে গ্যাস রপ্তানির জন্য একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে আলাস্কার প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে প্রকল্পটি লাভজনক কি না, তা পর্যালোচনার পরই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া এই প্রকল্পে ৫৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী কিম জুং-কোয়ান বলেছেন, এই সমঝোতার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পারমাণবিক শক্তি ও এলএনজির মতো কৌশলগত খাতে দুই দেশের সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব খাত ভবিষ্যৎ শিল্প ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে সিউল স্পষ্ট করে দিয়েছে, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে শুধু বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর প্রকল্পেই বিনিয়োগ করা হবে। আলাস্কার এলএনজি প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করবে দক্ষিণ কোরিয়া।
প্রায় এক বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বা এপেক নেতাদের বৈঠকের সময় ট্রাম্প ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনে সম্মত হয়েছিলেন। এর মধ্যে ১৫০ বিলিয়ন ডলার জাহাজ নির্মাণ খাতে এবং বাকি ২০০ বিলিয়ন ডলার অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের জন্য নির্ধারিত হয়।
এর বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে সেই বৃহত্তর সমঝোতার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ বাড়ানোর পেছনে শুধু অর্থনৈতিক হিসাব নয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ও ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে আগস্টে ট্রাম্প যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডে দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর সিউলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হলে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। তবে একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা এসব প্রকল্পের বাণিজ্যিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছেন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনায় দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি দুটি কেন্দ্র নির্মাণ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়াভিত্তিক ওয়েস্টিংহাউস ইলেকট্রিক নির্মাণ করবে আরও ছয়টি। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বিদেশি দেশের নিজস্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে এটি হবে প্রথম উদ্যোগ।
এ প্রকল্প থেকে লাভ ভাগাভাগির লক্ষ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো ওয়েস্টিংহাউসে অংশীদারত্ব কেনার বিষয়েও আলোচনা করছে। চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া তার বিনিয়োগের পুরো অর্থ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর মুনাফার ৫০ শতাংশ পাবে। বিনিয়োগের অর্থ উঠে যাওয়ার পর মুনাফার ৯০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র পাবে বলে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার জানিয়েছে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি টেক্সাসে ৬ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও নির্মাণ করবে দক্ষিণ কোরিয়া। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। আশপাশের তথ্যকেন্দ্রগুলোতে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কেন্দ্রটি তৈরি করা হবে।
প্রকল্পটির প্রথম ধাপ ২০২৯ সালে বাণিজ্যিকভাবে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০৩২ সালের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দুই দেশের ঘোষণায় বিনিয়োগের অঙ্ক নিয়ে যে পার্থক্য দেখা গেছে, সে বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ট্রাম্প যে ২০০ বিলিয়ন ডলারের কথা বলেছেন, তা জাহাজ নির্মাণ বাদে অন্যান্য সব বিনিয়োগের মোট অঙ্ক। এর মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ১২০ বিলিয়ন ডলারও রয়েছে।
আলাস্কার এলএনজি পাইপলাইন প্রকল্প নিয়েও সিউল একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে—বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়ার প্রমাণ পাওয়া এবং দেশের প্রাসঙ্গিক আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ প্রকল্পটির চূড়ান্ত আকার বা আদৌ তা বাস্তবায়িত হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি দক্ষিণ কোরিয়া।












