হরমুজ প্রণালির সংকটকে বিশ্ব এত দিন মূলত জ্বালানি সংকট হিসেবে দেখেছে। কিন্তু এর আড়ালে আরেকটি সংকট ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। সেটি হলো হরমুজে সারের সংকট, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যসংকটে গড়াতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের মহাসচিব জন ডেন্টন বুধবার এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সিঙ্গাপুরে ফিউচার অব ট্রেড ফোরামের এক ফাঁকে তিনি একে এক নীরব সংকট বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, হরমুজের আসল গল্প জ্বালানি নয়, খাদ্য। তাঁর সংগঠন ১৭০টির বেশি দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করে।
হিসাবটি সহজ। সমুদ্রপথে বিশ্বে যত সার পরিবহন হয়, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এশিয়ার বাজারে যাওয়া ইউরিয়া রপ্তানির ৩৫ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। সালফারের ক্ষেত্রে এই অংশ ৫৩ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়ার ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ। থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের মতো দেশ এসব সারের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সার সময়মতো না পেলে কৃষকেরা কম জমিতে চাষ করেন বা কম সার দেন। ফলন কমে যায় পরের মৌসুমে, যখন সংকট সামলানোর সময় আর থাকে না। এ কারণেই এই সংকট চোখে পড়তে দেরি হয়। যুদ্ধের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের দানাদার ইউরিয়ার দাম এক সপ্তাহেই প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছিল। একই সময়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছিল, প্রতি মাসে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টন সারের বাণিজ্য আটকে যাচ্ছে।
ডেন্টন বলেছেন, পরিস্থিতিটি কৃষ্ণসাগরের সংকটের সঙ্গে তুলনীয়। দুই ক্ষেত্রেই একটি বাণিজ্যপথ কার্যত জমে গেছে এবং সামরিকীকরণ হয়েছে। তিনি আসিয়ানের পরবর্তী সভাপতি দেশ সিঙ্গাপুরকে বিষয়টি অগ্রাধিকারে রাখার আহ্বান জানান। জাতিসংঘেও জোরালো উদ্যোগ চান তিনি। একটি হিসাবে, সার সরবরাহে এই বিঘ্নের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অন্তত সাড়ে চার কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ডেন্টন সতর্ক করেছেন, দেশগুলো যেন আতঙ্কে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ না করে। এমন নিষেধাজ্ঞা অতীতের খাদ্যসংকটগুলোকে আরও তীব্র করেছিল।
এই সতর্কবার্তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য দেওয়া হলেও বাংলাদেশের জন্যও সমান প্রযোজ্য। দেশের চাহিদার বড় অংশের ইউরিয়া আমদানি হয়। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশ এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দেশের সার কারখানাগুলোও চলে প্রাকৃতিক গ্যাসে, যার সরবরাহ এখন চাপে। সামনে বোরো মৌসুম, যা দেশের চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে এই মৌসুমে সারের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। হরমুজে সারের সংকট দীর্ঘ হলে আগামী বছরের চালের বাজারেও তার ছায়া পড়তে পারে। তাই এখনই আমদানির বিকল্প উৎস ও মজুত পরিকল্পনার প্রশ্নটি জরুরি।
ডেন্টনের প্রস্তাবিত সমাধানের মডেলটিও উল্লেখযোগ্য। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় কৃষ্ণসাগর শস্য চুক্তির মাধ্যমে আটকে থাকা খাদ্যশস্য বের করে আনা হয়েছিল। তিনি হরমুজে সার পরিবহনের জন্য তেমনই একটি ব্যবস্থা চান। তেল ও গ্যাস নিয়ে দর-কষাকষির ভিড়ে সারের জাহাজের জন্য আলাদা নিরাপদ পথের কথা খুব কমই উঠেছে। কৃষ্ণসাগরের সেই পুরোনো চুক্তিই এখন হরমুজে সারের সংকট ঠেকানোর সম্ভাব্য নকশা।












