ইউরোপে আসার পর বহু অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। তবে বেলজিয়ামের পেয়ারি দাইজা চিড়িয়াখানায় দুই সোনালি নাকওয়ালা বানরের শতদিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি সম্ভবত সবচেয়ে স্মরণীয়। প্রথম দেখায় এটি দুটি প্রাণীর জন্ম উদ্যাপন মাত্র মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন।
সকাল ১১টার দিকে চিড়িয়াখানার একটি শান্ত হ্রদের পাশে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় একশ অতিথি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বেলজিয়ামে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ফেই শেংচাও, ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনা মিশনের কূটনীতিক এবং ব্রুজেলেত্তের মেয়র ইসাবেল লিয়েজিওয়া। চীনের শানসি প্রাদেশিক বন বিভাগ থেকেও অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন উপপরিচালক চেন বাওলিন। তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চীন থেকে ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন।
এত বড় আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু অবশ্য কোনো কূটনৈতিক বৈঠক বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছিল না। সেখানে সবার আগ্রহের কেন্দ্র ছিল মাত্র ১০০ দিন বয়সী দুটি সোনালি নাকওয়ালা বানর। চীনা ঐতিহ্যে জীবনের এই সময়টি নবজাতকের আরও শক্তিশালী ও কিছুটা স্বাধীন হয়ে ওঠার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।

তবে দিনের দুই তারকা নিজেদের এই বিশেষ তারকাখ্যাতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। একটি শাবক তার মা লুলুকে শক্ত করে আঁকড়ে ছিল। মাঝে মাঝে ছোট্ট হাত বাড়িয়ে পাশের ঝুলে থাকা পাতাগুলো ছুঁয়ে দেখছিল। অন্যটি জুয়ানজুয়ান নামের আরেক স্ত্রী বানরের আড়ালে লুকিয়ে থেকে কৌতূহলী চোখে ভিড়ের দিকে তাকাচ্ছিল, আবার মুহূর্তেই আড়ালে চলে যাচ্ছিল।
তাদের বাবা লিউইউনের কাছে অবশ্য কূটনৈতিক আয়োজনের চেয়ে নিজের ব্যস্ত পরিবারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছিল। অনুষ্ঠান চলার মধ্যেই তার আচরণে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গত মে মাসে চীনের কিনলিং জাতীয় উদ্যান থেকে তিনটি সোনালি নাকওয়ালা বানর বেলজিয়ামে আনা হয়েছিল। তখন তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে পাঁচ, চার ও সাত বছর। প্রজাতিটির বিচারে তারা তখনও তরুণ বয়সী ছিল।
এ কারণেই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূতের একটি রসিকতা উপস্থিত অতিথিদের বেশ আনন্দ দেয়। তিনি স্মরণ করেন, গত বছর এই দুষ্টু তরুণ বানরটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। এখন সে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করেছে। কথাটির পরপরই চারপাশে হাসি ও করতালি ছড়িয়ে পড়ে।
সম্ভবত সেই পরিবেশের প্রভাবেই লিউইউনও ভেতরের আশ্রয়স্থল থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর ঝুলন্ত দড়ির সেতুতে উঠে তার এমন দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়, যা অনেকটা কসরত প্রদর্শনের মতোই মনে হচ্ছিল।
কিন্তু এই হাসি-আনন্দের আড়ালে রয়েছে চীনের অন্যতম উচ্চাভিলাষী বিদেশভিত্তিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্প।
সোনালি নাকওয়ালা বানর চীনের সবচেয়ে বিরল প্রাইমেটগুলোর অন্যতম। কিনলিং অঞ্চলের উপপ্রজাতিটির সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। অন্য চারটি উপপ্রজাতির সংখ্যা কয়েকশ থেকে কয়েক হাজারের মধ্যে।

এই প্রাণীর প্রজনন নিয়ে বহু বছর ধরেই প্রাণিবিজ্ঞানীদের কাজ করতে হচ্ছে। এর কারণ তাদের জটিল সামাজিক কাঠামো এবং নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রয়োজনীয়তা। পাশাপাশি গাছে ওঠানামা ও বিচরণের পর্যাপ্ত সুযোগও প্রয়োজন। সব অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলেও একটি স্ত্রী সোনালি নাকওয়ালা বানর সাধারণত দুই বছরে একবার গর্ভধারণ করে এবং প্রতিবার একটি মাত্র শাবকের জন্ম দেয়।
পেয়ারি দাইজা চিড়িয়াখানা তাই কিনলিং পর্বতমালার প্রাকৃতিক পরিবেশের কাছাকাছি একটি বিশেষ আবাস তৈরিতে কয়েক মাস ব্যয় করেছে। প্রায় ৬০০ বর্গমিটারের এই আবাসকে শুধু খাঁচা বলা ঠিক হবে না; বরং এটি একটি বাগানের মতো। পাথর ও ঘন গাছপালার মধ্য দিয়ে জলধারা বয়ে গেছে। বিভিন্ন উচ্চতাকে যুক্ত করেছে উঁচু চলাচলের পথ। কাঠের মাচা, ওঠানামার কাঠামো এবং অসংখ্য গাছের কাণ্ড বানরগুলোকে মাটির ওপরে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে—বন্য পরিবেশে তারা যেমন থাকে।
সেখানে দাঁড়িয়ে কিছু সময়ের জন্য ভুলেই যাওয়া সম্ভব যে জায়গাটি বেলজিয়াম। মনে হতে পারে, চীনের গভীর কোনো অরণ্যে দাঁড়িয়ে আছি।
সম্ভবত এ কারণেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীনের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সমিতি ও পেয়ারি দাইজার মধ্যে ১০ বছরের সহযোগিতা চুক্তি করা হয়েছিল। চুক্তিটির লক্ষ্য ছিল কিনলিংয়ের সোনালি নাকওয়ালা বানরের জন্য বিদেশে প্রথম পরিচিত প্রজনন কর্মসূচি প্রতিষ্ঠা করা। ২০২৫ সালের মে মাসে তিনটি বানর বেলজিয়ামে আসে। মাত্র ১১ মাসের মধ্যে দুটি সুস্থ শাবকের জন্ম চীনা ও বেলজিয়ান বিশেষজ্ঞদের নিষ্ঠা এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।
তবে সেদিন আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল বানরগুলোর আবাসের বাইরের দৃশ্য।
অনুষ্ঠান শেষে চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখার সময় লক্ষ্য করলাম, দর্শনার্থীদের মধ্যে হাঁস অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষ দুপুরের খাবার খাচ্ছিল, আর কয়েক মিটার দূরে শিশুরা বসে ছিল। হাঁসগুলোও নির্বিকারভাবে পিকনিকের টেবিলের নিচে খাবারের টুকরো খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
অন্য একটি আবাসে বানরের একটি দলকে দেখা গেল বিশাল এক আবাসে। সেখানে ছিল পাহাড়ি ঢাল, জলপ্রপাত এবং পরিখা দিয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। মহান বনমানুষগুলোর জন্য তৈরি আবাসের ওপর ছিল বিশাল কাচের ছাদ, আর ভেতরে এমন সব ওঠানামার কাঠামো ছিল, যা দেখলে অনেক শিশুও সেখানে খেলতে চাইবে।

তখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল, চিড়িয়াখানাটির লক্ষ্য শুধু প্রাণী প্রদর্শন করা নয়। বরং প্রাণীগুলোকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক আচরণের সুযোগ দেওয়া এবং একই সঙ্গে মানুষকে কিছুটা থেমে তাদের পর্যবেক্ষণ করতে শেখানো। প্রাণীদের প্রতি কৌতূহলের পাশাপাশি তাদের প্রতি সম্মানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে রাষ্ট্রদূত ফেই শেংচাও মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে একটি কথা বলেন, যা আমার মনে গেঁথে যায়। এই সম্পর্ক বোঝার জন্য সব সময় বড় কোনো তত্ত্বের প্রয়োজন হয় না। কখনো প্রকৃতির মধ্যে হাঁটা, কখনো একটি চিড়িয়াখানায় গিয়ে প্রাণীদের দেখা—এ ধরনের সাধারণ অভিজ্ঞতাই মানুষকে সেই সম্পর্ক উপলব্ধি করতে সাহায্য করতে পারে।
এরপর রাষ্ট্রদূত ও পেয়ারি দাইজার প্রতিষ্ঠাতা এরিক ডম দুই শাবকের নাম ঘোষণা করেন। তাদের নাম রাখা হয় ঝেনঝেন ও শিইলে। নাম দুটির অর্থ ‘যত্ন’ ও ‘আনন্দ’। নামের মধ্যে যেন তাদের বাবা-মা এবং তাদের যত্ন নেওয়া প্রত্যেক মানুষের আন্তরিক শুভকামনাই প্রতিফলিত হয়েছে।
দুই ছোট্ট সোনালি নাকওয়ালা বানরের জন্ম তাই কেবল একটি চিড়িয়াখানার আনন্দের ঘটনা নয়। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, বিরল প্রাণী সংরক্ষণ শুধু একটি দেশের দায়িত্ব নয়। উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, দীর্ঘমেয়াদি যত্ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করলে একটি প্রজাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আর শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বোঝার জন্য হয়তো খুব জটিল কোনো তত্ত্বেরও প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো দুটি ছোট প্রাণীর স্বাভাবিক জীবন দেখাই যথেষ্ট—মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে এই পৃথিবীতে আমরা একা নই।












