দুবাই থেকে তেল আবিবের পথে আকাশে থাকা একটি যাত্রীবাহী বিমানে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরিস্থিতি। ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে সহকারী বৈমানিক ককপিটে প্রধান বৈমানিকের ওপর হামলা করে উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। হামলার পর বিমানটি দ্রুত নিচে নেমে যায়। যাত্রী ও অন্য ক্রু সদস্যদের হস্তক্ষেপ এবং বিমানে থাকা একজন অতিরিক্ত বৈমানিকের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে।
ঘটনাটি এখন আর শুধু একটি উড়োজাহাজে সহিংসতার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টা, বৈমানিকের পূর্ববর্তী নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য, নিয়োগ ও যাচাইপ্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে একাধিক প্রশ্ন।

ককপিটে কী ঘটেছিল
৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করে এফজেড১০৭৩। রয়টার্সের ফ্লাইট-তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের আকাশসীমার ওপর দিয়ে প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল। বিমানে ছিলেন ১৭৪ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য।
হঠাৎ উড়োজাহাজটির গতিপথে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে এটি প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়। একপর্যায়ে ভূমির তুলনায় বিমানের গতি স্বাভাবিক ভ্রমণগতির চেয়েও প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি হয়ে যায়। সর্বোচ্চ অবতরণগতির পর্যায়ে বিমানটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৬৬ মিটার বা ৫৪৪ ফুট বেগে নিচে নামছিল।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির পেছনে ছিলেন বিমানের সহকারী বৈমানিক। তিনি প্রধান বৈমানিককে আক্রমণ করে বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
৩ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল শামসি প্রথমবারের মতো জানান, তদন্তে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, সহকারী বৈমানিক ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা’ করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সহকারী বৈমানিক ককপিটে থাকা জরুরি ব্যবহারের কুঠার দিয়ে প্রধান বৈমানিকের ওপর হামলা করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।

শেষ মুহূর্তে কীভাবে বাঁচল বিমান
আহত অবস্থাতেও প্রধান বৈমানিক ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু সদস্য ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
বিমানে থাকা একজন অতিরিক্ত বৈমানিকও পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে আসেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সহায়তায় বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ সহকারী বৈমানিককে আটক করে। পরে চিকিৎসকের ছাড়পত্র পাওয়ার পর প্রধান ও সহকারী—দুই বৈমানিককেই সৌদি আরব থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেওয়া হয়।
ফ্লাইদুবাইয়ের নিজস্ব বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইটে মাঝপথে একটি ঘটনা ঘটে এবং বিমানটি নিরাপদে তাবুকে অবতরণ করে। বিমান সংস্থাটি জানিয়েছে, যাত্রী ও ক্রু সবাই নিরাপদ ছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা তদন্তে সহযোগিতা করছে।
কে সেই সহকারী বৈমানিক
রয়টার্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সন্দেহভাজন সহকারী বৈমানিকের নাম হামাম আল-হামামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ওমানের নাগরিক। রয়টার্স জানিয়েছে, তাঁর পরিচয় সম্পর্কে সরাসরি অবগত একটি সূত্র এবং তদন্ত সম্পর্কে অবহিত আরেকটি সূত্র তাঁর নাম নিশ্চিত করেছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পরিচয় প্রকাশ করেনি এবং ওমান সরকারও প্রকাশ্যে এ ঘটনায় মন্তব্য করেনি।
এখানেই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি সামনে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হামামি ২০২৪ সালে ওমান এয়ারে সহকারী বৈমানিক হিসেবে প্রশিক্ষণের সময় কথিত উগ্রপন্থী উপকরণ তাঁর কাছে ছিল বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। পরে তাঁকে উড়োজাহাজ চালনা থেকে সরিয়ে প্রশাসনিক কাজে রাখা হয়েছিল বলে ওই সূত্রগুলোর দাবি।
তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। ফলে কথিত উগ্রপন্থী সংশ্লিষ্টতা, তাঁর উদ্দেশ্য এবং ফ্লাইদুবাইয়ে তাঁর নিয়োগের প্রক্রিয়া—সবকিছুই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বড় প্রশ্ন: আগের সতর্কতা থাকলে তিনি আবার ককপিটে এলেন কীভাবে?
ঘটনার পর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে বৈমানিকদের নিয়োগ ও পুনঃযাচাই নিয়ে।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা—আইসিএও—বিমান খাতের ‘ইনসাইডার থ্রেট’ বা প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে তৈরি নিরাপত্তা ঝুঁকিকে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। সংস্থাটির নির্দেশনায় কর্মীদের পরিচয়, পূর্ববর্তী কর্মসংস্থান, শিক্ষাগত ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিক নিরাপত্তা তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত পুনঃযাচাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ধারাবাহিক নিরাপত্তা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
আইসিএওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিমান খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের হাতে এমন কিছু প্রবেশাধিকার ও জ্ঞান থাকে, যা সাধারণ যাত্রীর থাকে না। ফলে কোনো কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপব্যবহার করলে ঝুঁকির ধরনও আলাদা হয়ে যায়। এ কারণেই বিমানবন্দর ও বিমান সংস্থাগুলোর জন্য শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তা যাচাই যথেষ্ট নয়; কর্মীদের ক্ষেত্রেও শক্তিশালী ও নিয়মিত যাচাই প্রয়োজন।
ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনায় যদি পূর্ববর্তী নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হবে—ওই তথ্য পরবর্তী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছেছিল কি না, পৌঁছে থাকলে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে তাঁকে ককপিটে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচনা করা হলো।

‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলার আগে তদন্তের কী বাকি
সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, ঘটনার পূর্ণ পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা এবং শারীরিক ও ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণের কাজ এখনো চলছে। প্রয়োজনীয় আইনি ও তদন্তপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
অর্থাৎ, হামলার ঘটনা ঘটেছে—এ বিষয়ে এখন যথেষ্ট তথ্য রয়েছে; কিন্তু এর পেছনে কোনো সংগঠন, নেটওয়ার্ক বা অন্য কারও নির্দেশ ছিল কি না, সেটি এখনো তদন্তের বিষয়।
ইসরায়েলের তদন্তকারীরাও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বাধীন তদন্তে অংশ নেবেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। কারণ ঘটনাটি একসঙ্গে কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত—বিমানটি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ছেড়েছিল, সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করেছে, গন্তব্য ছিল ইসরায়েল এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তি ওমানের নাগরিক।
বিমান নিরাপত্তার জন্য নতুন সতর্কবার্তা
ঘটনাটি বিমান নিরাপত্তার একটি মৌলিক বাস্তবতা সামনে এনেছে—সব ঝুঁকি যাত্রীর ব্যাগ, অস্ত্র বা বিমানবন্দরের বাইরে থাকা কোনো হুমকি থেকে আসে না। কখনো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এমন একজন ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি ইতিমধ্যেই ককপিটে প্রবেশের বৈধ অনুমতি পেয়েছেন।

আইসিএওর নীতিমালায় এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কর্মীদের পটভূমি যাচাই, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পুনঃযাচাই, নজরদারি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনাটি তাই কেবল একজন সহকারী বৈমানিকের কথিত হামলার তদন্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন—আধুনিক বিমান চলাচলে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, ককপিটের ভেতরে থাকা কোনো ব্যক্তির উদ্দেশ্য যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যায়, তখন বিদ্যমান প্রতিরোধব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর। বিশেষ করে হামাম আল-হামামির পূর্ববর্তী নিরাপত্তা-তথ্য, ফ্লাইদুবাইয়ে তাঁর নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও যাচাইপ্রক্রিয়া এবং হামলার পেছনে কোনো সংগঠিত যোগাযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ঘটনাটি বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা কি না, নাকি আরও বড় কোনো নিরাপত্তা দুর্বলতার ইঙ্গিত।
বর্তমানে নিশ্চিত বিষয় একটাই: কয়েক মিনিটের মধ্যে ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যাওয়া একটি যাত্রীবাহী বিমান বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হয়েছে। আর সেই অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় ‘ভেতর থেকে আসা ঝুঁকি’কে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।












