যুক্তরাজ্যের ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার বৃহস্পতিবার ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। লেনদেনের একপর্যায়ে এই হার ওঠে ৬ দশমিক ০২৯ শতাংশে। ১৯৯৮ সালের শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ। বিশ্বজুড়ে সরকারি বন্ড বিক্রির চাপের মধ্যে এই উত্থান ঘটে। একই দিনে লন্ডনের শেয়ারবাজারও পড়ে যায়। দেশটির প্রধান শেয়ার সূচক এফটিএসই ১০০ নিম্নমুখী ছিল দিনভর। ডলারের বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ডও দুর্বল হয়। ব্রিটিশ বন্ডের সুদহার বাড়ার এই ধারা দেশটির সরকারের ঋণ ব্যয় নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার আবার বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও সুদের হার কমাতে আগ্রহী নয়। সুদহার বাড়লে সরকারকে নতুন ঋণের জন্য বেশি খরচ করতে হয়। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে অর্থ রাখতে এখন বাড়তি ঝুঁকির দাম চাইছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের সরকার রেকর্ড পরিমাণ নতুন ঋণ নিচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও জাপানেও রাজস্বের চাপ বিনিয়োগকারীদের বাড়তি সুদ দাবি করতে বাধ্য করছে। মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য নতুন ১০ বছর মেয়াদি বন্ড বিক্রি করে। সেটির সুদহার ছিল ১৯৯৯ সালের পর ওই মেয়াদের যেকোনো ইস্যুর চেয়ে বেশি। ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদও উঠেছে ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশে, যা ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ।
যুক্তরাজ্যের চাপ ইউরোপের অন্য দেশের চেয়ে বেশি। ঘর গরম রাখা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশটি প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অনেক নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই নির্ভরতা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে ব্রিটিশ বন্ডের সুদহার ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় পেনশন ও সামাজিক কর্মসূচির খরচ সামলাতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর রাজনৈতিক চাপও রয়েছে। চলতি মাসের শেষে অর্থমন্ত্রী জন হিলি তাঁর প্রথম বাজেট দেবেন। সেখানে কর বাড়ানো হতে পারে বলে বাজারের ধারণা। সুদ যত বাড়বে, বাজেটের হিসাব মেলানো ততই কঠিন হবে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি দূরের খবর নয়। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বড় বাজার। গত অর্থবছরে সেখানে প্রায় ৪৩৯ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও রপ্তানি বেড়েছে প্রায় পৌনে ৪ শতাংশ। ঋণের খরচ বাড়লে ব্রিটিশ পরিবারগুলোর ব্যয়ক্ষমতা কমতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে কেনাকাটায়। বিশ্বজুড়ে বন্ডের সুদ বাড়লে ডলার শক্তিশালী হয়। তাতে উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিদেশি ঋণের খরচও বাড়ে। বাজারভিত্তিক সুদে নেওয়া বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের কিস্তিতেও এর চাপ পড়তে পারে। যুক্তরাজ্যে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাড়ির কিস্তিও বাড়তে পারে। দেশটিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বড় একটি জনগোষ্ঠী আছে, যাঁরা নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠান। তাঁদের খরচ বাড়লে সেই প্রবাহেও টান পড়তে পারে।
শেষবার ব্রিটিশ সরকারকে ৩০ বছরের জন্য এত বেশি সুদ দিতে হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। তখন ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সবে স্বাধীনভাবে সুদহার নির্ধারণের ক্ষমতা পেয়েছিল। প্রায় তিন দশক পর একই উচ্চতায় ফেরা বলছে, কম সুদের যুগ পুরোপুরি শেষ। জন হিলির প্রথম বাজেটের আগে বাজার তাই ব্রিটিশ বন্ডের সুদহারের ৬ শতাংশের এই সংকেতটিকেই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছে।












