ঢাকার একটি মুদি দোকানে চাল, ডাল, তেল ও চিনির দাম জানতে চাইছেন একজন ক্রেতা। কয়েক বছর আগেও মাসের বাজারের স্বাভাবিক অংশ ছিল এসব পণ্যের দাম। এখন সেগুলোই অনেক পরিবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চাপের জায়গা। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার দুই বছর আগের তুলনায় কমেছে। কিন্তু বাজারের বাস্তবতা হলো, খাদ্যের দাম আগের অবস্থানে ফিরে আসেনি। বরং উচ্চ একটি মূল্যস্তরের ওপর দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে।
এই পার্থক্যই বাংলাদেশের খাদ্যবাজারের গত দুই বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিত্র।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। একই মাসে খাদ্য মূল্যসূচক ছিল ১৩৩ দশমিক ৭২। ২০২৬ সালের আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে। অর্থাৎ দাম বাড়ার বার্ষিক গতি কমেছে, কিন্তু আগের দুই বছরে জমে থাকা মূল্যবৃদ্ধি মুছে যায়নি।
খাদ্য মূল্যসূচকের ভিত্তিতে হিসাব করলে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যস্তর আনুমানিক ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এটি কোনো একটি পণ্যের খুচরা দামের পরিবর্তন নয়; বরং একটি বিস্তৃত খাদ্যঝুড়ির সামগ্রিক মূল্যপরিবর্তনের চিত্র। ফলে একজন ভোক্তার বাস্তব অভিজ্ঞতা পণ্যভেদে এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, দাম কি কমেছে?
অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতি হলো দাম বাড়ার হার, দাম নিজে নয়।
ধরা যাক, কোনো খাদ্যপণ্যের দাম এক বছরে ২০ শতাংশ বেড়ে পরের বছরে আরও ৭ শতাংশ বাড়ল। দ্বিতীয় বছরে মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু পণ্যটির দাম কমেনি। বাংলাদেশের বাজারে গত দুই বছরে অনেকটা এমন ঘটনাই ঘটেছে।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল দুই অঙ্কে। আগস্টে তা ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমে এলেও তখনও খাদ্যের দাম দ্রুত বাড়ছিল। ২০২৬ সালের আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নামার অর্থ হলো নতুন করে দাম বাড়ার গতি কমেছে। এর অর্থ দুই বছর আগের দামে বাজার ফিরে গেছে—এমন নয়।
এই কারণেই সাধারণ মানুষের বাজার-অভিজ্ঞতা এবং সরকারি মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের মধ্যে আপাত পার্থক্য দেখা যায়।
ভোজ্যতেলে দুই বছরের হিসাব
ভোজ্যতেল এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
২০২৪ সালের এপ্রিলে সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের খুচরা দাম লিটারপ্রতি ১৬৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ের কর-সুবিধার পরিবর্তনও স্থানীয় বাজারে প্রভাব ফেলেছিল।

দুই বছর পর, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা দাম বাড়িয়ে ২০৪ টাকা করা হয়। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ওই নির্ধারিত দরের তুলনায় দাম বেড়েছে ৩৭ টাকা বা প্রায় ২২ শতাংশ। সরকার তখন আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছিল।
তবে শুধু দামই পুরো চিত্র নয়। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরবরাহ কম থাকায় দাম বৃদ্ধির পরও অনেক দোকানে বোতলজাত তেল সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
অর্থাৎ বাংলাদেশের খাদ্যবাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং পণ্যের প্রাপ্যতার সংকট কখনো কখনো একই সঙ্গে কাজ করছে।
চালের বাজারের চিত্র কিছুটা আলাদা
চালের বাজারে পরিস্থিতি আরও জটিল।
গত দুই বছরে চালের দাম তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে ছিল। তবে ২০২৬ সালে কিছু জাতের চালের দাম আগের বছরের তুলনায় কমেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বাংলাদেশবিষয়ক তথ্যেও ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চালের দাম এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম থাকার কথা উঠে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ খাদ্যদাম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় দেশের ১১০টি বাজারের মাসিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। চাল, ডাল, তেল ও গমের আটাসহ প্রধান খাদ্যপণ্যের বাজারদর নিয়ে এই তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হয়েছে। তথ্যগুলো জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, বিভিন্ন জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা এবং অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহ ও নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়।
এটি দেখায়, জাতীয় খাদ্য মূল্যস্ফীতির একটি সংখ্যা দিয়ে পুরো বাজারের আচরণ বোঝা যায় না। একটি পণ্যের দাম কমতে পারে, আবার একই সময়ে অন্য কোনো পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারের ঢেউ আবারও আসছে
বাংলাদেশের খাদ্যবাজার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন দ্রুত স্থানীয় বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্য মূল্যসূচক ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ১৩৬ দশমিক ০ পয়েন্টে উঠেছে। আগস্টের তুলনায় এটি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি এবং এক বছর আগের তুলনায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। সেপ্টেম্বরের এই বৃদ্ধিতে খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল ও চিনির দাম বেড়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, হরমুজ প্রণালি ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে পরিবহন ও বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়া এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার ঝুঁকি আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে সরবরাহের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরোর মতে, এসব চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ের খাদ্য ব্যয়ে পৌঁছাতে পারে—বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে।
বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের বাজারে চালের মতো কিছু পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন শক্তিশালী হলেও ভোজ্যতেল, গম, ডাল, চিনি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা রয়েছে।
শুধু আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করা যায় না
বাংলাদেশের খাদ্যদামের পুরো ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক বাজারে খুঁজলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
একই আন্তর্জাতিক পণ্যের দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে তার সুফল পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি, গুদামজাতকরণ, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাজারের বিভিন্ন স্তরের বাণিজ্যিক মার্জিন।

বিশ্বব্যাংকের খাদ্যদামবিষয়ক তথ্যভাণ্ডার এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু জাতীয় গড় নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১১০টি বাজারের পণ্যভিত্তিক দাম পর্যবেক্ষণ করে। ফলে ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের বাজারে একই পণ্যের মূল্যচাপ কীভাবে ভিন্ন হতে পারে, তারও একটি ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের বাজারে আরেকটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খল। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে কোনো পণ্যের দাম কমলেও খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন সবসময় একই মাত্রায় দেখা যায় না।
সবচেয়ে বড় চাপ নিম্নআয়ের পরিবারের ওপর
খাদ্যদামের এই দীর্ঘস্থায়ী উচ্চতা শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়; এটি পরিবারের ব্যয়ের কাঠামোকেও প্রভাবিত করে।
আয় যদি খাদ্যের দামের তুলনায় দ্রুত না বাড়ে, তাহলে পরিবারকে একই পরিমাণ খাবার কিনতে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হয়। এতে পোশাক, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন বা সঞ্চয়ের মতো অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হয়।
২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ গড় হিসাবে মজুরি ও খাদ্যদামের পরিবর্তনের ব্যবধান খুব বড় না হলেও গত দুই বছরের সঞ্চিত মূল্যচাপ পরিবারের ওপর রয়ে গেছে।
এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির মূল দ্বন্দ্ব—নতুন করে দাম বাড়ার গতি কমেছে, কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
সামনে ঝুঁকি কোথায়?
আন্তর্জাতিক বাজারে সেপ্টেম্বরে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কসংকেত।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সূচকে সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি চাপ এসেছে শস্য, চিনি ও ভোজ্যতেল থেকে। বিশ্ববাজারে আবহাওয়ার ঝুঁকি, পরিবহনপথে বিঘ্ন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা একসঙ্গে কাজ করলে আমদানি ব্যয় আবার বাড়তে পারে।

তবে বাংলাদেশের সামনে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। স্থানীয় চাল উৎপাদন ভালো থাকলে চালের বাজারে আমদানিনির্ভর চাপ কমানো সম্ভব। একইভাবে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গেলে সবজি, ডিম ও অন্যান্য দ্রুত পচনশীল পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে।
কিন্তু শুধু সরবরাহ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। আমদানি ব্যয়, মুদ্রাবাজার, পরিবহন, মজুত, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার মূল্য ব্যবধান—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
তাহলে দুই বছরে কতটা বেড়েছে খাদ্যদাম?
একটি সংখ্যায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন। জাতীয় খাদ্য মূল্যসূচকের হিসাবে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যস্তর আনুমানিক ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে পণ্যভেদে বাস্তব পরিবর্তন আলাদা।
ভোজ্যতেলে সরকারি নির্ধারিত বোতলজাত সয়াবিনের দাম একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। চালের কিছু জাতের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে উল্টো দাম কমেছে। ডিম, সবজি, চিনি, মাছ ও মুরগির ক্ষেত্রে মৌসুমি সরবরাহ, আমদানি, উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির কারণে দামে ওঠানামা হয়েছে।

তাই বাংলাদেশের গত দুই বছরের খাদ্যবাজারকে শুধু ‘দাম বেড়েছে’ বা ‘দাম কমেছে’—এই দুই শব্দে ধরা যায় না।
বাস্তব চিত্র হলো, ২০২৪ সালের উচ্চ মূল্যস্ফীতি খাদ্যের দামকে যে উচ্চ স্তরে নিয়ে গিয়েছিল, ২০২৬ সালে সেই স্তর থেকে দাম বাড়ার গতি কমেছে; কিন্তু দাম ব্যাপকভাবে আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।
আন্তর্জাতিক বাজার যখন আবার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সংকেত দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু খাদ্য মূল্যস্ফীতি কত—তা নয়।
প্রশ্ন হলো, বিশ্ববাজারের পরবর্তী ধাক্কা বাংলাদেশের ভোক্তা পর্যায়ের বাজারে পৌঁছানোর আগেই সরবরাহব্যবস্থা কতটা সামলানো যাবে।
কারণ গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়ার খবর স্বস্তির হতে পারে; কিন্তু তার অর্থ বাজারদর কমে যাওয়া নয়।












