বাংলাদেশে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরকারি খুচরা দাম গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে লিটারপ্রতি ১৬৭ টাকা থেকে বেড়ে ২০৪ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাম বেড়েছে ৩৭ টাকা বা প্রায় ২২ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু এই বৃদ্ধিকে শুধু ‘স্বাভাবিক বাজার সমন্বয়’ কিংবা ‘অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি’—কোনো একক ব্যাখ্যায় দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার, কর-সুবিধা, আমদানি ব্যয় এবং দেশের বাজারের প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো একসঙ্গে বিবেচনা করলে চিত্রটি অনেক বেশি জটিল।
১৬৭ টাকা থেকে ২০৪ টাকা
২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল সরকার এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৬৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল। এর আগে দাম ছিল ১৬৩ টাকা। সে সময় সরকার জানিয়েছিল, আমদানি পর্যায়ের কর-সুবিধা শেষ হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কারণে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দাম ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৭৫ টাকা করা হয়। তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে যুক্তি দিয়েছিল।

২০২৫ সালের এপ্রিলে বড় ধরনের আরেক দফা মূল্য সমন্বয়ে দাম ১৪ টাকা বেড়ে ১৮৯ টাকা হয়। ব্যবসায়ীরা কর-সুবিধা প্রত্যাহার এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলেছিলেন। বাণিজ্য উপদেষ্টা তখন বলেন, ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের ব্যয় প্রায় ১৯৭ টাকা হলেও আলোচনার ভিত্তিতে খুচরা দাম ১৮৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে দাম আরও ৬ টাকা বেড়ে ১৯৫ টাকা হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তা ১৯৯ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ২০৪ টাকা করা হয়। ফলে এপ্রিল ২০২৪-এর ১৬৭ টাকা থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ২০৪ টাকা—মোট বৃদ্ধি ২২ দশমিক ২ শতাংশ।
দুই বছরের মূল্যচিত্র
| সময় | বোতলজাত সয়াবিন তেল | আগের পর্যায় থেকে পরিবর্তন |
|---|---|---|
| এপ্রিল ২০২৪ | ১৬৭ টাকা | — |
| ডিসেম্বর ২০২৪ | ১৭৫ টাকা | ৮ টাকা |
| এপ্রিল ২০২৫ | ১৮৯ টাকা | ১৪ টাকা |
| অক্টোবর ২০২৫ | ১৯৫ টাকা | ৬ টাকা |
| এপ্রিল ২০২৬ | ১৯৯ টাকা | ৪ টাকা |
| সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০৪ টাকা | ৫ টাকা |
| মোট | ২০৪ টাকা | ৩৭ টাকা, প্রায় ২২ দশমিক ২ শতাংশ |
আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাব কী বলছে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি দেখা যায়।
বিশ্বব্যাংকের পণ্যদ্রব্যের মাসিক তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের বেঞ্চমার্ক মূল্য ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ছিল প্রতি টন প্রায় ৯৫৯ ডলার। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তা ১,০৯৫ ডলার এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ১,১২০ ডলারে ওঠে। এরপর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি কিছুটা বাড়লেও বছরের শেষদিকে ১,১১৬ ডলারের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক মূল্য দ্রুত বেড়ে আগস্টে ১,৬৩৮ ডলারে পৌঁছায়।
অর্থাৎ এপ্রিল ২০২৪ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক প্রায় ৭১ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের সরকারি বোতলজাত দাম বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ।
এ থেকে সরাসরি বলা যাবে না যে বাংলাদেশে দাম কমই বেড়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক হলো অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক মূল্য। বাংলাদেশের ভোক্তারা যে দামে তেল কেনেন, তার মধ্যে আমদানি, জাহাজভাড়া, বন্দর ও ব্যাংক ব্যয়, শোধন, বোতলজাতকরণ, পরিবহন, মজুত, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের ব্যয় এবং করের প্রভাব থাকে।
তবে আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশের খুচরা মূল্য বৃদ্ধির অনুপাত এক নয়—এটি প্রশাসনিক মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

ডলারের দামও বড় বিষয়
বাংলাদেশের সয়াবিন তেলের বাজার আমদানিনির্ভর। ফলে ডলারের বিনিময় হার সরাসরি স্থানীয় ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে গড় বিনিময় হার ছিল প্রায় ১১৭ টাকা ৯৯ পয়সা প্রতি ডলার। ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২২ টাকা ৮৪ পয়সায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের ভোজ্যতেল আমদানির ওপর আন্তর্জাতিক বাজার ও বিনিময় হারের যৌথ প্রভাব তাই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের একটি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ভোজ্যতেল ও তেলবীজ আমদানির ব্যয় আগের বছরের তুলনায় কমলেও মোট ব্যয় ছিল ২২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে।
কর কমলে দাম কতটা কমার কথা?
এখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
২০২৪ সালের শেষদিকে সরকার সয়াবিন ও পাম তেলের আমদানি পর্যায়ে কর-সুবিধা এবং কম হারে মূল্য সংযোজন করের সুবিধা বাড়িয়েছিল। পরে ২০২৫ সালের মার্চের শেষে ওই সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়াকে ব্যবসায়ীরা মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখান।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ৫ শতাংশ অগ্রিম করও অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল আমদানির ক্ষেত্রে প্রত্যাহার করা হয়। অর্থাৎ সরকার একদিকে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে কর-সুবিধা দিয়েছে, অন্যদিকে আমদানিকারকদের প্রকৃত ব্যয় যাচাই করে মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা করেছে।

এ কারণে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দাম দেখেই ভোক্তা পর্যায়ের দাম নির্ধারণ করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একইভাবে শুধু ব্যবসায়ীদের দেওয়া ব্যয় হিসাব গ্রহণ করলেও প্রশ্ন থেকে যায়।
‘১৯৭ টাকা ব্যয়’—কিন্তু দাম ১৮৯ টাকা কেন?
২০২৫ সালের এপ্রিলের ঘটনাটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়ীদের হিসাবের ভিত্তিতে ট্যারিফ কমিশনের সূত্র উল্লেখ করে তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের হিসাব করা ব্যয় প্রায় ১৯৭ টাকা। কিন্তু সরকার ১৮৯ টাকা দাম নির্ধারণ করে। অর্থাৎ হিসাব করা ব্যয়ের চেয়ে ৮ টাকা কমে সরকারি খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এটি দেখায়, প্রশাসন চাইলে ব্যবসায়ীদের দাবি করা পূর্ণ ব্যয় সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপিয়ে না দিয়ে কিছুটা কম দাম নির্ধারণ করতে পারে। তবে এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিকারক ও শোধনকারীরা ক্ষতির মুখে পড়ছে কি না, সেটিও একই সঙ্গে যাচাই করা জরুরি।
বাজারে প্রতিযোগিতার প্রশ্নও আছে
বাংলাদেশের ভোজ্যতেল বাজারের কাঠামো এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
২০২৪ সালের একটি বিশ্লেষণে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, দেশে সক্রিয় ভোজ্যতেল শোধনাগারের সংখ্যা কমে ১১টিতে দাঁড়িয়েছে এবং টিকে গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ মিলে ২০২৩ সালে আমদানি করা সয়াবিন ও পাম তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করেছিল। পত্রিকাটি অর্থনীতিবিদদের উদ্ধৃত করে বাজারটিকে ঘনীভূত বা অলিগোপলিক কাঠামোর বলে বর্ণনা করেছে।
২০২৫ সালের শুরুর দিকেও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের একটি নথি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ভোজ্যতেলের দাম তখন তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল এবং বড় আমদানিকারকরা আগের বছরের তুলনায় বেশি তেল সরবরাহ করছিলেন।
অন্যদিকে ২০২৬ সালে পরিস্থিতি বদলেছে। এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে আমদানি কমে যাওয়া, উৎপাদন সক্ষমতার কম ব্যবহার এবং সরবরাহ সংকটের কথা উঠে আসে। কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় বাজার আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তাহলে ২০৪ টাকা কি ‘স্বাভাবিক’?
উপলব্ধ তথ্য থেকে ২০৪ টাকা পুরোপুরি অস্বাভাবিক—এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই। বরং ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক সয়াবিন তেলের মূল্য যে দ্রুত বেড়েছে, তা বাংলাদেশের মূল্য সমন্বয়ের পক্ষে একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা দেয়। এ সময় আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের বৃদ্ধি বাংলাদেশের খুচরা দামের বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
কিন্তু এর বিপরীত প্রশ্নটিও যথেষ্ট যৌক্তিক—সব সময় কি দাম ২০৪ টাকা থাকা প্রয়োজন ছিল?
এর উত্তর নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃতপক্ষে কোন দামে তেল আমদানি করেছে, তাদের মজুতের গড় ক্রয়মূল্য কত, শোধন ও বোতলজাত ব্যয় কত, ব্যাংক ও পরিবহন ব্যয় কত এবং প্রতি লিটারে প্রকৃত বাণিজ্যিক মার্জিন কত—এসব তথ্যের ওপর।
২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক দাম কমলেও স্থানীয় দাম দ্রুত কমেনি—বিশেষ করে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের বেঞ্চমার্ক ১,১২০ ডলার থেকে ১,১১৬ ডলারে নেমে গেলেও বাংলাদেশে সরকারি বোতলজাত দাম ১৮৯ থেকে ১৯৫ টাকায় উঠেছিল।
সুতরাং দাম বৃদ্ধির প্রতিটি ধাপ একই মাত্রায় বাজার-সমর্থিত ছিল—এমন দাবি করা কঠিন। আবার কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফা করেছে—এমন সিদ্ধান্তেও যাওয়ার মতো প্রকাশ্য নিরীক্ষিত ব্যয়ের তথ্য নেই।
প্রশাসনের জন্য আসল পরীক্ষা
সয়াবিন তেলের বাজারে কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত একটি স্বচ্ছ মূল্য-সূত্র। আন্তর্জাতিক দাম, আমদানির এলসি মূল্য, বন্দর পর্যন্ত প্রকৃত ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, শোধন ও বোতলজাত ব্যয়, পরিবহন, অনুমোদিত মুনাফা এবং আগের মজুত—সবকিছুর বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করা হলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই মূল্য নির্ধারণের যুক্তি পরিষ্কার হবে।
কারণ বর্তমানে বাংলাদেশে দাম নির্ধারণে তিনটি মূল্য—এক্স-বন্ড, ইন-বন্ড ও এলসি খোলার মূল্যের গড়ের সঙ্গে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বোতলজাত ব্যয় যোগ করার পদ্ধতি ব্যবহারের কথা ব্যবসায়ী পক্ষ জানিয়েছে।
এই সূত্রটি নিয়মিত, নিরীক্ষাযোগ্য এবং প্রকাশ্য করা গেলে ‘আন্তর্জাতিক বাজার বেড়েছে’—এই সাধারণ যুক্তির বদলে প্রতি লিটার তেলের দামের পেছনে প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব বোঝা সম্ভব হবে।
সারকথা: গত দুই বছরে বাংলাদেশের সরকারি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। একই সময়ে বৈশ্বিক সয়াবিন তেলের বেঞ্চমার্ক মূল্য বেড়েছে অনেক বেশি। ফলে বর্তমান ২০৪ টাকা কেবল আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি—এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ২০২৫ সালের মতো কিছু পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মূল্য স্থিতিশীল বা কম থাকার পরও স্থানীয় দাম না কমার ঘটনা দেখায় যে সময়োপযোগী, স্বচ্ছ ও ব্যয়ভিত্তিক মূল্য-পর্যালোচনার সুযোগ ছিল এবং এখনও আছে। প্রকৃতপক্ষে দাম আরও কত কম হতে পারত, তা নির্ধারণের জন্য কোম্পানিগুলোর আমদানি, মজুত, শোধন ও বিপণন ব্যয়ের নিরীক্ষিত তথ্য প্রকাশ করাই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা।












