স্কুলের খাবার, হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কারাগার পরিচালনা, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন, কল্যাণ ভাতা মূল্যায়ন থেকে শুরু করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সরকারি তথ্যব্যবস্থা—যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা প্রতিদিন যেসব সরকারি সেবার মুখোমুখি হন, সেগুলোর বড় একটি অংশ এখন সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনা করে না। গত চার দশকে বেসরকারি ও তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি সেবা পরিচালনার যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা এখন ব্রিটিশ রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এই ব্যবস্থার মূল যুক্তি ছিল দক্ষতা। সরকারের ধারণা ছিল, বেসরকারি খাত বিশেষজ্ঞ দক্ষতা, দ্রুততা, উদ্ভাবন এবং কম খরচে সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিনের চুক্তিগত ব্যর্থতা, প্রতিষ্ঠান ধস, বিতর্কিত ক্রয়প্রক্রিয়া এবং ব্যয়বহুল পুনঃআলোচনার অভিজ্ঞতার পর সেই ধারণা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
ব্রিটেনের বিশাল আউটসোর্সিং বাজার
সরকারি সেবায় বেসরকারি খাতের প্রবেশ শুরু হয় মূলত ১৯৮০-এর দশকের বাজারমুখী সংস্কারের সময়। স্থানীয় সরকারকে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও খাবার সরবরাহের মতো সেবা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের আওতায় আনার মাধ্যমে এই প্রবণতা বিস্তৃত হয়। পরে জন মেজর এবং টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সরকারের সময়ে বেসরকারি অর্থায়ন উদ্যোগের মাধ্যমে হাসপাতাল, স্কুল ও সড়কের মতো অবকাঠামোতেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি চালু হয়।
২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের সরকারি সেবা চুক্তির বাজারের মূল্য ছিল আনুমানিক ৯৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড। বর্তমানে সরকারি ক্রয়ব্যয়ের পরিমাণ বছরে ৩৫০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বড় কৌশলগত সরবরাহকারীরা সরকারি খাত থেকে ২৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন পাউন্ড আয় করেছে।
তবে সব আউটসোর্সিং ব্যর্থ হয়নি। সরকারি সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন হলে কিংবা কোনো সেবায় কার্যকর বাণিজ্যিক বাজার থাকলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজে লাগানো যুক্তিযুক্ত হতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাবার সরবরাহ ও কিছু তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় অতীতে পরিচালন ব্যয় কমার উদাহরণও রয়েছে।
চুক্তিতে যে সেবাগুলোর মান ধরা কঠিন
সমস্যা বেশি দেখা যায় এমন ক্ষেত্রে, যেখানে সেবার মান কেবল সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। প্রবেশন, সামাজিক সেবা, শিশুদের আবাসিক যত্ন, আশ্রয়প্রার্থী ব্যবস্থাপনা ও কল্যাণ মূল্যায়নের মতো কাজে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, আস্থা, ধারাবাহিকতা ও স্থানীয় জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়কে নির্দিষ্ট চুক্তির শর্তে পুরোপুরি বেঁধে ফেলা কঠিন।
ইংল্যান্ডে আবাসিক প্রাপ্তবয়স্ক সামাজিক সেবার ৯৬ শতাংশ এবং শিশুদের আবাসিক সেবার ৮০ শতাংশের বেশি বেসরকারি মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, পরিচর্যাধীন শিশুদের ৪৩ শতাংশকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এলাকার বাইরে রাখা হয়েছিল। একই গবেষণায় সরকারি ও তৃতীয় খাতের পরিচালিত সেবাকেন্দ্রগুলোর পরিদর্শন ফল তুলনামূলকভাবে ভালো এবং মুনাফাভিত্তিক পরিচালকদের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃতভাবে সেবাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশি পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্যসেবাতেও একই ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত অস্ত্রোপচারের অপেক্ষমাণ তালিকা কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু যদি চুক্তিতে বেশি সংখ্যক রোগী চিকিৎসা করানোর ওপর পুরস্কার নির্ভর করে, তাহলে তুলনামূলক সহজ ও কম ঝুঁকির রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
কারিলিয়ন থেকে পোস্ট অফিস—জবাবদিহির সংকট
২০১৮ সালে কারিলিয়নের পতন আউটসোর্সিং ব্যবস্থার ঝুঁকি স্পষ্ট করে। প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড ঋণ ও প্রায় ৫৮০ মিলিয়ন পাউন্ড পেনশন ঘাটতিতে প্রতিষ্ঠানটি ধসে পড়ে। হাসপাতাল নির্মাণ, কারাগার রক্ষণাবেক্ষণ ও হাসপাতালের খাবার সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানটির পতন দেখিয়ে দেয়—বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলেও রাষ্ট্রকে জনসেবা চালু রাখতেই হয়।
পোস্ট অফিসের হরাইজন কেলেঙ্কারিও জবাবদিহির জটিলতার বড় উদাহরণ। ত্রুটিপূর্ণ সফটওয়্যারের তথ্যের ভিত্তিতে ৯০০-এর বেশি সাব-পোস্টমাস্টারের বিরুদ্ধে ভুলভাবে মামলা করা হয়েছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় টেস্ট অ্যান্ড ট্রেস ব্যবস্থার ব্যাপক বেসরকারিকরণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটার বিতর্কও সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ে আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কি ফিরছে?
ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাজ্যের কিছু স্থানীয় সরকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সেবা ও পরিবহনের মতো কাজ আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনছে। শিশুদের পরিচর্যায় গত তিন বছরে প্রায় অর্ধেক স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের শিশুদের আবাসনকেন্দ্র চালু করেছে। একই সময়ে বড় কৌশলগত সরবরাহকারীদের সরকারি ক্রয়ব্যয়ের অংশ ২০২৪-২৫ সালে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।
২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর লেবার সরকার এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিসরে সেবা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া বড় চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে জনস্বার্থ যাচাই চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। লক্ষ্য হলো প্রয়োজন হলে সেবা সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে নেওয়া।
তবে চার দশকে গড়ে ওঠা এই বিশাল অবকাঠামো রাতারাতি বদলানো সহজ নয়। সরকারি ব্যবস্থায় সেবা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা, তথ্য, ভবন, প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। ফলে ব্রিটেনের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু বেসরকারি না সরকারি, তা নয়; বরং কোন সেবা বাজারের মাধ্যমে পরিচালনা করা নিরাপদ, আর কোন সেবা নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সরাসরি সম্পর্কের অংশ হিসেবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন।
চার দশকের অভিজ্ঞতায় ব্রিটিশ আউটসোর্সিং এখন দক্ষতার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, জনসেবা ও জবাবদিহির কাঠামো নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।












