ইরানের সঙ্গে সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধ শেষ করতে হলে দেশটিকে তার পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর বক্তব্য, শুধু ভবিষ্যতে সমৃদ্ধকরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি নয়, ইরানকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
আলাস্কায় নির্বাচনী প্রচারের পর রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ইরান যদি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না চায়, তাহলে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেখাতে হলে সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতায় ‘অর্থবহ’ পরিবর্তন আনতে হবে।
ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কথার বিনিময়ে বাস্তব পদক্ষেপ মেনে নেবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যে কোনো সমঝোতায় ইরানের পক্ষ থেকে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দৃশ্যমান ও বাস্তব ছাড় থাকতে হবে।
গত কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধ বন্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান আরও জোরদার হতে পারে।

ইরানে কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন
আলোচনার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় জটিলতা হিসেবে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে ইরানের ক্ষমতার কাঠামোয় তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট ধারণা নেই।
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়ে এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে ভ্যান্স জানান।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ইরানের আলোচনাকারী প্রতিনিধিদের এবং দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন। বরং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান ও মিশ্র বার্তাই মূল সমস্যা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভ্যান্স আরও জানান, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বোঝার জন্য তিনি ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইরত মার্কিন সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন। ইরানের হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি তৈরি হয়েছে—এমন উদ্বেগও তিনি নাকচ করেন।
তাঁর ভাষ্য, ইরানি বাহিনী মাঝে মাঝে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে পারলেও ওই জলপথ দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করার সক্ষমতা তাদের নেই।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপও বড় বিষয়
ইরান যুদ্ধের ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। যুদ্ধের মাসিক ব্যয় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে সাম্প্রতিক এক হিসাবের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ওপর চাপ বাড়ছে।
আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন ভ্যান্স। সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, বিশেষ করে জ্বালানির দাম নিয়ে কথা বলেন। আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভ্যান্স নিজেও বর্তমানে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে আলোচিত একটি নাম। তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন তিনি। রয়টার্সকে ভ্যান্স বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি খুব বেশি ভাবেননি।












