বিশ্ববাজারে আবারও বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য শক্তিশালী ঝড়, সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচল ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া উদ্বেগ তেলের সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এর বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ায় বাজারে দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা সীমিত রয়েছে।
বুধবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ০৫ ডলার বা ১ দশমিক ০৪ শতাংশ বেড়ে ১০১ দশমিক ৬৩ ডলারে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দামও ৮০ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ২৪ ডলারে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, মেক্সিকো উপসাগরে তৈরি হওয়া একটি ঝড় আগামী দুই দিনের মধ্যে ২০২৬ সালের প্রথম আটলান্টিক হারিকেনে পরিণত হতে পারে। ঝড়টির সম্ভাব্য গতিপথে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস উৎপাদন এলাকা। ফলে উৎপাদন, পরিবহন ও পরিশোধন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মেক্সিকো উপসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ অফশোর এলাকাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মোট অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। ঝড়টি প্রায় ছয়টি তেল শোধনাগারের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঙ্গরাজ্যগুলোর শোধনাগারগুলো দেশটির মোট ১৮ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল দৈনিক পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের সরবরাহ নিয়ে এমনিতেই উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে ঝড়ের কারণে উৎপাদন বা শোধনাগারে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। ফলে ব্যবসায়ীরা এখন সম্ভাব্য সরবরাহ ঘাটতির যেকোনো ইঙ্গিত খুব সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুতও গত সপ্তাহে কমেছে। শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল কমেছে। মজুত কমে যাওয়াও তেলের দাম বাড়ার পেছনে একটি কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ পুরোপুরি থেমে নেই। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে তেল পরিবহন সক্ষমতা প্রতিদিন ৫৮ লাখ ব্যারেলে ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান।
এ ছাড়া গত ৭ থেকে ১০ দিনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ট্যাংকারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং আরও প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য বের হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম বড় তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ভিটলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
তবে সরবরাহ পুনরুদ্ধারের মধ্যেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। সোমবার রাতে সৌদি আরবের জাজান ও নাজরান বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার মধ্যেই এ হামলার ঘটনা ঘটে।

সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হুতিদের কাছ থেকে দখল করা এলাকা পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে হুতিদের অগ্রযাত্রার পর সৌদি আরবও ওই অভিযানে বিমান হামলা বাড়িয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামো ঘিরে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হামলা, শোধনাগারে সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যাঘাত এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের দাম অপরিশোধিত তেলের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের দামেও পড়তে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের একজনের মতে, বড় ধরনের উত্তেজনা কমার লক্ষণ না দেখা গেলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও সরবরাহ ঝুঁকি কমার আগে বিশ্ববাজারে তেলের দামে স্থায়ী স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা সীমিত।
সব মিলিয়ে একদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হারিকেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন হামলা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে তেলের দাম কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ঝড়ের তীব্রতা, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ কতটা স্থিতিশীল থাকে তার ওপর।












