বিশ্ব অর্থনীতি এখন একই সঙ্গে ঋণের বোঝা, যুদ্ধের ধাক্কা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের মতো বড় তিনটি চ্যালেঞ্জের মুখে। এ পরিস্থিতিতে ধনী ও দরিদ্র—সব দেশকেই ঋণ কমানো, বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
সিঙ্গাপুরে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আর দেরি করার সুযোগ নেই। বিশ্ব অর্থনীতির নীতিনির্ধারকদের হাতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে, এখন সেগুলো বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহারের সময়।
আগামী সপ্তাহে ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের শরৎকালীন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ১৯১ সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবেন। পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার উপায় নিয়েও আলোচনা হবে।
জর্জিয়েভার মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি তৈরি করেছে। তবে যুদ্ধের পাশাপাশি অতিরিক্ত ঋণও এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও জার্মানির মতো উন্নত অর্থনীতিগুলোও বিপুল সরকারি ঋণের চাপে রয়েছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে উচ্চ সুদের হারে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো জনকল্যাণমূলক খাতে অর্থ ব্যয়ের মধ্যে কঠিন ভারসাম্য তৈরি করতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার। এ প্রযুক্তির জন্য তথ্যকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। এর প্রভাব শেয়ারবাজারেও দেখা যাচ্ছে। অনেক দেশে শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে এবং উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করছে।
জর্জিয়েভা বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলক বিচারে রেলপথ, বিদ্যুৎ গ্রিড ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে অতীতের বড় বিনিয়োগগুলোর মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভালোবাসা, অপছন্দ করা কিংবা ভয় পাওয়া—যাই হোক না কেন, এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে বিভিন্ন দেশের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠছে।
তবে এ প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগের ঝুঁকিও রয়েছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল আর্থিক ব্যবস্থা বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বিশ্বজুড়ে বড় বিনিয়োগ কোনো হতাশাজনক পরিস্থিতিকে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী। বিশ্বের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যে শীর্ষ ১০ দেশের সাতটিই এ অঞ্চলের। ১৯৯১ সালে ব্যাংককে সর্বশেষ আইএমএফ- বিশ্বব্যাংকের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় বিশ্ব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এ অঞ্চলের অংশ ছিল ২৫ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ হয়েছে।
চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ থেকে সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু অনেক দেশ এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জর্জিয়েভা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেকটি প্রভাব জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধি। তথ্যকেন্দ্র ও প্রযুক্তি অবকাঠামো পরিচালনায় বাড়তি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হওয়ায় জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। এর প্রভাব জ্বালানি, সার, খাদ্যসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপরও পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারগুলোর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজন হলে ঋণের খরচ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন আইএমএফ প্রধান।
তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তির কারণে কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে শ্রমিকদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা, শ্রমবাজারকে আরও নমনীয় করা, উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়া এবং জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার মতো নীতিও জরুরি।
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিকে বড় প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করলেও অন্যদিকে ঋণ, বৈষম্য, কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্থিতিশীলতার নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত নীতি গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হতে পারে।












