রাশিয়ার তুলনায় অনেক ছোট নৌবাহিনী নিয়েও কৃষ্ণসাগরে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে ইউক্রেন। রিমোটচালিত বিস্ফোরক নৌযান বা সমুদ্র ড্রোন ব্যবহার করে রুশ নৌবহরের বড় অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পর এবার আরও এক ধাপ এগিয়েছে কিয়েভ। সমুদ্র ড্রোনকে শুধু আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে নয়, আকাশ প্রতিরক্ষা ও আকাশপথে হামলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ব্যবহার করছে দেশটি। ফলে নৌযুদ্ধের প্রচলিত ধারণায় নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
ইউক্রেনের তৈরি কিছু নৌ ড্রোন এখন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ভূমি বা আকাশের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো কোনো ড্রোনে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বসানো হয়েছে। আবার কিছু নৌযান ছোট আকারের আকাশ ড্রোন বহন করে নির্দিষ্ট এলাকার কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারছে। অর্থাৎ ছোট আকারের এসব নৌযান অনেকটা ভাসমান ক্ষুদ্র বিমানবাহী জাহাজের মতো কাজ করছে।
রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার সময় কৃষ্ণসাগরে মস্কোর নৌ-প্রাধান্য ছিল স্পষ্ট। কিন্তু ইউক্রেন তুলনামূলক কম খরচের রিমোটচালিত বিস্ফোরক নৌযান দ্রুত তৈরি ও ব্যবহার শুরু করে। ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী, এসব ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এখন সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে সমুদ্রের ওপর একাধিক স্তরের ড্রোন প্রতিরক্ষা ও আক্রমণব্যবস্থা গড়ে তুলছে ইউক্রেন। নতুন প্রযুক্তিও দ্রুত যুক্ত হচ্ছে। এমনকি একটি ঘটনায় নৌ ড্রোন থেকে চার চাকার রিমোটচালিত একটি স্থলযান নামানো হয়, যার ওপর মেশিনগান ছিল। ইউক্রেন এটিকে সম্পূর্ণ রোবটনির্ভর উভচর অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশও ইউক্রেনের অভিজ্ঞতার দিকে নজর দিচ্ছে। তাইওয়ান থেকে এস্তোনিয়া পর্যন্ত সামরিক পরিকল্পনাকারীরা ইউক্রেনের সমুদ্র ড্রোন ব্যবহারের কৌশল বিশ্লেষণ করছেন। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এমা স্যালিসবারির মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের নৌবাহিনীতে এ ধরনের প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা ইউক্রেনকে দেখে বোঝার চেষ্টা করছে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের কেউই মনে করছেন না যে সমুদ্র ড্রোন প্রচলিত যুদ্ধজাহাজের পুরো বিকল্প হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌযুদ্ধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্যাম জে. ট্যাংগ্রেডির মতে, ড্রোন মূলত নৌবাহিনীর অস্ত্রভান্ডারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। এগুলো যুদ্ধে ব্যবহার হবে, কিন্তু একাই যুদ্ধের পুরো সমীকরণ বদলে দেবে—এমনটা বলা যায় না।
তবে ড্রোনের বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক কম খরচ। ইউক্রেনের ২৭টি কোম্পানি বর্তমানে নতুন ধরনের নৌ প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এর ফলে একাধিক নকশা ও সক্ষমতা দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। একটি বড় যুদ্ধজাহাজ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচের তুলনায় অনেক কম অর্থে ছোট দেশের উপকূলীয় নিরাপত্তায় একাধিক জল ড্রোন ব্যবহার করা যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিদেশেও বাড়ছে আগ্রহ
ইউক্রেনের সমুদ্র ড্রোন প্রযুক্তি এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও আগ্রহ তৈরি করেছে। ইউক্রেনে প্রতিষ্ঠিত ইউফোর্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে যৌথভাবে এসব ড্রোন তৈরির জন্য চুক্তি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ইউক্রেনের ম্যাগুরা সিরিজের সমুদ্র ড্রোন তৈরি করে। এই ড্রোনগুলো ইউক্রেনের ব্যবহৃত প্রথম দিকের আত্মঘাতী বা বিস্ফোরক নৌ ড্রোনগুলোর মধ্যে অন্যতম।
নরওয়ের বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান কংসবার্গও ইউক্রেনে কার্যালয় খুলেছে এবং ইউক্রেনের সারগান সমুদ্র ড্রোন নির্মাতার সঙ্গে সহযোগিতা শুরু করেছে। ইউক্রেনীয় উদ্যোক্তাদের দাবি, নর্ডিক ও বাল্টিক অঞ্চলের কয়েকটি দেশ এবং জাপানও এ ধরনের প্রযুক্তিতে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের প্রধান কিরিলো বুদানভের ভাষ্য অনুযায়ী, রুশ নৌবহরের বিরুদ্ধে সমুদ্র ড্রোনের সাফল্যের পর বিভিন্ন দেশ নিজেদের জন্য এ ধরনের নৌযান কেনা কিংবা নিজস্ব দেশে উৎপাদনের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশও এ বিষয়ে যোগাযোগ করেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সমুদ্রভিত্তিক ড্রোনের আরেকটি সুবিধা হলো আগাম সতর্কতার সময় বাড়ানো। উপকূলীয় শহর ও বন্দরগুলো অনেক সময় দূর থেকে আসা বিস্ফোরক ড্রোনের হামলা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সময় পায় না। সমুদ্রে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করা গেলে আকাশপথে আসা ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিহত করার জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া সম্ভব।
আরেকটি বড় সুবিধা হলো দ্রুত প্রযুক্তি পরিবর্তনের সুযোগ। বড় যুদ্ধজাহাজ তৈরি ও আধুনিকায়নে বহু বছর সময় লাগে। বিপরীতে ছোট ড্রোনভিত্তিক প্রকল্প দ্রুত বদলানো যায়। কোনো প্রযুক্তি কয়েক বছরের মধ্যে অচল হয়ে গেলে পুরো বড় জাহাজ বদলানোর পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত ছোট প্ল্যাটফর্ম নতুন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

ব্যর্থতা থেকেই শুরু
ইউক্রেনের এই নতুন নৌযুদ্ধের কৌশল একদিনে তৈরি হয়নি। প্রথম দিকের ম্যাগুরা ড্রোন তৈরি হয়েছিল ওডেসায় উৎপাদিত একটি বেসামরিক মোটরবোটের ভিত্তিতে। ২০২৩ সালের বসন্তে এগুলোর পরীক্ষা শুরু হয়। শুরুতে বারবার ব্যর্থতা ও প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল নির্মাতা ও সামরিক দলগুলোকে।
ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একটি নৌ ড্রোন ইউনিটের এক কমান্ডার জানান, পরীক্ষার সময় বারবার ড্রোন হারিয়ে যেত। পরে সেটিকে উদ্ধার করে তীরে এনে মেরামত করা হতো, পরিবর্তন করা হতো বিভিন্ন যন্ত্রাংশে, এরপর আবার পরীক্ষা চালানো হতো। এভাবেই ধীরে ধীরে প্রযুক্তিটি উন্নত করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে নৌ ড্রোন শুধু বিস্ফোরক বহনের প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এগুলো থেকে আকাশ ড্রোনও উৎক্ষেপণ করা শুরু হয়। এর ফলে সমুদ্র থেকে স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পাশাপাশি আকাশপথের প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের এক সামরিক কর্মকর্তা জানান, গত বছর রাশিয়ার তুয়াপসে ও নভোরোসিস্ক বন্দর এলাকায় অভিযান চালানোর প্রস্তুতির সময় এই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল। রুশ বাহিনী সমুদ্রের তেল প্ল্যাটফর্মে রাডার বসিয়েছিল, যা ইউক্রেনীয় নৌ ড্রোনের গতিবিধি শনাক্ত করতে সহায়তা করছিল।
তখন একটি সাড়ে তিন টন ওজনের কাটরান নৌ ড্রোনের ওপর একাধিক আকাশ ড্রোন বহনের পরিকল্পনা করা হয়। রাতে সেগুলো সমুদ্র থেকে উড়িয়ে দেওয়া হয় এবং লক্ষ্যবস্তুতে পাঠানো হয়। আকাশ ড্রোনগুলো রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করার পর ইউক্রেনের অন্যান্য নৌ ড্রোন রুশ বন্দরগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয় বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান।
চলতি বছরের এপ্রিলেও ইউক্রেনের ৪১২তম মানববিহীন ব্যবস্থা ব্রিগেড একটি জলভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম থেকে আকাশ প্রতিরোধী ড্রোন উৎক্ষেপণ করে দুটি রুশ শাহেদ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
এ অভিজ্ঞতা থেকে ইউক্রেনীয় কমান্ডারদের একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—ড্রোন যুদ্ধের ক্ষেত্রে শুধু কোনো একটি প্রযুক্তি বা যন্ত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। দ্রুত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন দক্ষ দলই বড় ভূমিকা রাখে।
ইউক্রেনের ৪১২তম ব্রিগেডের সমুদ্র ইউনিটের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইউরি কোচেভেনকোর ভাষায়, প্রযুক্তির চেয়ে মানুষই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে ইউক্রেনের সমুদ্র ড্রোন যুদ্ধ শুধু রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি কৌশল হয়ে থাকছে না। তুলনামূলক কম খরচে দ্রুত পরিবর্তনযোগ্য এবং বহুমুখী এসব প্রযুক্তি ভবিষ্যতের উপকূলীয় নিরাপত্তা ও নৌযুদ্ধের পরিকল্পনায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।












