যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, জ্বালানির বাজার এবং রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী প্রচারে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও এখন পর্যন্ত সংঘাতের অবসান ঘটাতে না পারায় ট্রাম্প প্রশাসনকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। আইওয়া, ওহাইও ও নর্থ ক্যারোলাইনার মতো অঙ্গরাজ্যে সিনেট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আসন ঘিরে লড়াইয়ের মধ্যে ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এসব অঙ্গরাজ্যে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধবিরোধী মনোভাব এবং পেট্রল ও ডিজেলের উচ্চমূল্য এবার ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের তেল রপ্তানি ও জাহাজ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ দেশটিকে ‘খুব খারাপ অবস্থায়’ নিয়ে গেছে। একই পোস্টে তিনি জানান, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কোনো সময়েই ইরানে হামলা চালানো হবে না।
তবে তাঁর ঘোষণার অর্থ এই নয় যে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে। নির্বাচনের পর আবারও সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাবনা খোলা রেখেছেন ট্রাম্প। ফলে আপাতত হামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসানের পরিবর্তে রাজনৈতিক চাপ সামলানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের হিসাব ও যুদ্ধের চাপ
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি ছিল তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য বিচার করা হবে তারা কোন কোন যুদ্ধে জড়ায়নি, তা দিয়ে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তাঁর সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা প্রকাশ করা হলেও সংঘাত এখন অষ্টম মাসে গড়িয়েছে। এদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক মূল্যও এখন মার্কিন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করছিলেন ট্রাম্প। তবে এ ধরনের হামলা যুদ্ধের বিরোধিতা আরও বাড়াতে পারে এবং জ্বালানির বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে—এমন পরিস্থিতিতে হামলার ঘোষণা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তটি তাৎপর্যপূর্ণ।
রিপাবলিকান দলের কয়েকজন প্রার্থীও দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মিশিগানে দলটির সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্স গত মাসের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিওতে বলেন, ইরানের যুদ্ধ শেষ করতে হবে, এবং তা দ্রুতই করতে হবে।
অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক চাপকে কাজে লাগিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাত থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে চেয়েছে—এমন বিশ্লেষণও রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তেহরান নিজের শর্তে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটনকে রাজি করাতে পারেনি।
হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা
ইরান যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংঘাত। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরানের তেল রপ্তানি ও বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও হয়রানির ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অবরোধের ফলে ইরানের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে দেশটির নিয়ন্ত্রণও আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। ৮ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সপ্তাহের মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র সাতটি জাহাজ চলাচল করেছিল, যা দুই মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। বুধবার চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা ছিল ১০। সাম্প্রতিক হামলা ও জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। সিএনএনের ৯ অক্টোবরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ছিল ৪ দশমিক ৩৬ ডলার। ডিজেলের দামও আগের রেকর্ড উচ্চতা থেকে কিছুটা কমলেও পরিবহন খাত ও সাধারণ মানুষের জন্য তা ব্যয়বহুল রয়ে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ায় বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছিল বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তেলের দাম কমানোর জন্য যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বাস্তব সমস্যা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে যেসব পরিবার অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে জ্বালানি কিনেছে, দাম কমলেও সেই ব্যয় আর ফেরত পাবে না। ফলে নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কিছুটা কমলেও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ পুরোপুরি দূর হবে কি না, তা অনিশ্চিত।
ইরানের অর্থনীতিতে চাপ, কিন্তু আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত নেই
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং মুদ্রা রিয়ালের দর কমেছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়িকে উদ্ধৃত করে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের জন্য অত্যন্ত কঠিন সময়গুলোর একটি।
তবে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হওয়া আর রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করা এক বিষয় নয়। ইরানের নেতারা এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেওয়ার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ৩১ আগস্ট জি২০-এর বৈঠকে বলেছিলেন, কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে যুদ্ধের অবসান হতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়া জরুরি নয়; বরং দেশটির নেতৃত্বকে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে।
কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের পূর্বাভাস প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের মুখেও ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক যুদ্ধেও ব্যর্থ হবে। এটি ইরানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার দাবি; যুদ্ধের সামগ্রিক ফলাফল সম্পর্কে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিনিময়ে দেশটি অবরোধ শিথিল করার বিষয়টি সামনে এনেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথও এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
নির্বাচনের পর আবারও হামলা হতে পারে?
নির্বাচনের আগে হামলা না চালানোর ঘোষণা দিলেও ট্রাম্প যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের নিশ্চয়তা দেননি। বরং তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে সামরিক পদক্ষেপ আবার শুরু করার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি বিমানবাহী রণতরির আক্রমণকারী বহর এবং অতিরিক্ত মেরিন সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প তাঁর সহযোগীদের জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও বোমা হামলা শুরু হতে পারে। তবে এটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য, আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত কোনো চূড়ান্ত সামরিক সিদ্ধান্ত নয়।
নির্বাচনের আগে হামলা স্থগিত রাখলে ট্রাম্প আপাতত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও যুদ্ধবিরোধী মনোভাব নিয়ে রাজনৈতিক চাপ কমানোর সুযোগ পাবেন। কিন্তু নির্বাচনের পর নতুন করে হামলা শুরু হলে তেলের সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানির বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ পেলে যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ বাড়তে পারে। সামরিক অভিযানের অর্থায়ন এবং প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার সাংবিধানিক ও আইনি ক্ষমতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিএনএনের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের ব্যয় প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
ট্রাম্পের সামনে কূটনীতি নাকি নতুন সামরিক অভিযান?
ট্রাম্পের সামনে এখন কয়েকটি পরস্পরবিরোধী চাপ রয়েছে। একদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ অব্যাহত রেখে দেশটিকে আলোচনায় বসাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মার্কিন ভোটারদের ব্যয় বাড়ছে এবং রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সহজ নয়। দেশটির অর্থনীতি চাপে থাকলেও নেতৃত্ব এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেয়নি। ফলে শুধু অবরোধের মাধ্যমে দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আগের সামরিক হামলা যদি ইরানের অবস্থান পরিবর্তন করতে না পারে, তাহলে নির্বাচনের পর নতুন করে হামলা চালালে ফল কীভাবে আলাদা হবে? সামরিক শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সংঘাতের স্থায়ী অবসান কতটা সম্ভব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ট্রাম্পের নির্বাচনের আগের হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা তাই যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঘোষণা নয়। বরং এটি এমন একটি সাময়িক বিরতি, যার পেছনে কূটনৈতিক হিসাব, জ্বালানির বাজারের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাস্তবতা একসঙ্গে কাজ করছে। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর ওয়াশিংটন কোন পথে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে সংঘাত আরও বাড়বে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।












