রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় প্লেগ নিয়ে গবেষণার জন্য পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মীর মৃত্যুকে ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মৃত ওই কর্মীর নিউমোনিয়ার কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে বিরল ও প্রাণঘাতী সংক্রমণ নিউমোনিক প্লেগের আশঙ্কা, পরীক্ষাগারে পরীক্ষানল ভেঙে যাওয়ার খবর এবং সহকর্মীদের কোয়ারেন্টিনে রাখার ঘটনা পরিস্থিতিকে আলোচনায় এনেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, ঘটনার প্রকৃত চিত্র বুঝতে রাশিয়ার কাছ থেকে আরও তথ্য প্রয়োজন।
প্রাথমিকভাবে সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি কম বলে ধারণা করা হলেও, সংক্রমণের প্রকৃতি ও সম্ভাব্য বিস্তার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
গবেষণাগারের কর্মীর মৃত্যু, কী ঘটেছিল?
রাশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব সাইবেরিয়ার ইরকুতস্ক রিসার্চ অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী এক নারী মারা গেছেন। স্বাধীন আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম লিউদি বাইকালার প্রতিবেদনে তাঁর নাম দারিয়া শিপিলোভা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি ইরকুতস্কের কাছের শেলেখভ শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। তিন দিন পর, ২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। রাশিয়ার সংক্রামক রোগবিষয়ক কর্তৃপক্ষ রসপোত্রেবনাদজর জানিয়েছে, অজ্ঞাত কারণে হওয়া নিউমোনিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর কর্মস্থলের কোনো সম্পর্ক থাকার সন্দেহকে গুরুত্ব না দেওয়ার অবস্থান জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস জানিয়েছেন, ওই প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্মীরও অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে দ্বিতীয় ব্যক্তির অসুস্থতার কারণ কিংবা তাঁর প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে পরীক্ষাগারে একটি পরীক্ষানল ভেঙে যাওয়া এবং এর ফলে সংস্পর্শে আসার সম্ভাব্য ঘটনা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ডব্লিউএইচওর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাঁরা এখন পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যের বাইরে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাননি। ফলে পরীক্ষানল ভাঙার সঙ্গে ওই কর্মীর অসুস্থতা বা মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
কোয়ারেন্টিনে প্রায় ২০০ জন
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ২ অক্টোবর রাশিয়ার সরকার ইরকুতস্ক ইনস্টিটিউটের এক বাসিন্দার বিপজ্জনক সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় একটি বৈঠক করে। সংস্থাটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অসুস্থতার খবর পর্যবেক্ষণের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমেই তারা প্রথম ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পারে।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক এমন ঘটনার তথ্য নির্ধারিত সময়ে জানানো গুরুত্বপূর্ণ। ডব্লিউএইচওর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংস্থাটি মৃত্যুর বিষয়ে রাশিয়ার কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়ার পর মঙ্গলবার রাশিয়া জানায়, সম্প্রতি দেশটিতে প্লেগের কোনো ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
রাশিয়ার সরকার আরও জানিয়েছে, মৃত কর্মীর সংস্পর্শে আসা প্রায় ২০০ জনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে অথবা তাঁদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে এসব ব্যক্তির মধ্যে কেউ প্লেগে আক্রান্ত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চাইলেও ডব্লিউএইচও এখনো রুশ সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সব তথ্য পায়নি। তেদ্রোস বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় সংস্থাটি এখনো ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করতে কিংবা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করতে পারছে না। তাঁর মতে, পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন যাচাই এবং ঝুঁকি নির্ভুলভাবে বুঝতে সময়মতো, সম্পূর্ণ ও স্বচ্ছ তথ্য বিনিময় অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে ওই অঞ্চলের কয়েকটি হাসপাতালে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি মানুষকে প্লেগ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের লক্ষণ সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। তবে রসপোত্রেবনাদজর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সামগ্রিক মহামারি পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে।
নিউমোনিক প্লেগ কতটা বিপজ্জনক?
ইরকুতস্কের অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটটি ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় ৯৫ জন কর্মী কাজ করেন। প্লেগ নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি সাইবেরিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে এই রোগের জীবাণুর উপস্থিতি এবং বিস্তার বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। প্লেগের জন্য দায়ী ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামের ব্যাকটেরিয়া এখনো ওই অঞ্চলের বন্য প্রাণীদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে।
বিশ্বজুড়ে ২০০-এর বেশি প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এই জীবাণুতে আক্রান্ত হতে পারে। এর মধ্যে ইঁদুরজাতীয় প্রাণী উল্লেখযোগ্য। সাইবেরিয়ায় মারমট নামের এক ধরনের বড় ইঁদুরজাতীয় প্রাণী প্লেগের গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবে পরিচিত।
প্লেগের চারটি প্রধান ধরন রয়েছে—নিউমোনিক, বুবোনিক, সেপ্টিসেমিক ও ফ্যারিঞ্জিয়াল প্লেগ। কোন ধরনের প্লেগ হয়েছে, তার ওপর রোগের লক্ষণ, জটিলতা এবং সংক্রমণ ছড়ানোর ধরন নির্ভর করে।
নিউমোনিক প্লেগ ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়। এটি প্লেগের বিরল কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরনগুলোর একটি। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগটি দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, প্লেগের এই ধরনটি আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে।
বুবোনিক প্লেগ সাধারণত প্লেগের সবচেয়ে প্রচলিত ধরন। সংক্রমিত মাছির কামড় অথবা ত্বকের কাটা অংশ দিয়ে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে এটি হতে পারে। এতে লসিকাগ্রন্থি ফুলে যায় এবং তীব্র ব্যথা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা না হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংক্রমণ রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে সেপ্টিসেমিক প্লেগে রূপ নিতে পারে।
সেপ্টিসেমিক প্লেগে ব্যাকটেরিয়া রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে, ফ্যারিঞ্জিয়াল প্লেগ সাধারণত সংক্রমিত মাংস খাওয়ার পর গলায় সংক্রমণ ঘটায়।
একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কতজনকে সংক্রমিত করতে পারেন?
নিউমোনিক প্লেগের সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা নিয়ে গবেষণায় মৌলিক প্রজনন সংখ্যার একটি হিসাব পাওয়া যায়। এই সংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ৩। অর্থাৎ, অনুকূল পরিস্থিতিতে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে এক থেকে কিছু বেশি মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন। তবে এটি একটি গড় হিসাব, নির্দিষ্ট কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে ঠিক কতজন সংক্রমিত হবেন, তা এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় না।
আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচি থেকে নির্গত সংক্রমিত ক্ষুদ্র জলকণার মাধ্যমে নিউমোনিক প্লেগ ছড়াতে পারে। সংক্রমিত প্রাণীর নিঃসৃত জলকণার সংস্পর্শ থেকেও সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে।
পেন স্টেট হেলথের সেন্ট জোসেফ মেডিকেল সেন্টারের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ রুতুল দালালের মতে, সংক্রমণের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে তাঁদের স্বাভাবিক চলাফেরা, দৈনন্দিন কাজকর্ম কিংবা ভ্রমণ করা কঠিন হয়ে যায়। এ কারণে তাঁদের মাধ্যমে দূরে গিয়ে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে।
তারপরও রোগটির ঝুঁকি অবহেলা করার সুযোগ নেই। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কারণে সংক্রামক রোগ দ্রুত বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে বছরে প্রায় ২০০ জন যাত্রী যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তাঁদের প্রবেশের নির্ধারিত বিমানবন্দরগুলোতে রোগ শনাক্তকরণ ও জনস্বাস্থ্য মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষজ্ঞ দালালের মতে, সংক্রমিত কোনো যাত্রী যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে ততক্ষণে তাঁর উপসর্গ দেখা দেওয়ার কথা। তবে এসব বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে সংক্রমণের ঝুঁকি পুরোপুরি শূন্য।
ডব্লিউএইচওর প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাশিয়ার ওই কর্মীর অসুস্থতা নিউমোনিক প্লেগ হয়ে থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কম বলে মনে হয়। তবে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত না হওয়া এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে এই মূল্যায়নকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বিশ্বে এখনো প্লেগের সংক্রমণ ঘটে
প্লেগকে ইতিহাসের রোগ মনে হলেও এর জীবাণু এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১০টি দেশ প্রায় চার হাজার সন্দেহভাজন মানব প্লেগের ঘটনা এবং ৪২৩টি মৃত্যুর খবর দিয়েছে। সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা আর পরীক্ষায় নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা এক নয়।
মধ্য এশিয়ায় প্লেগের জীবাণু বহনকারী প্রাণী ও সংক্রমণের প্রাকৃতিক উৎস রয়েছে এমন অঞ্চলের সংখ্যা বেশি। সাধারণত সংক্রমিত ইঁদুর বা অন্যান্য প্রাণীর সংস্পর্শে আসার পর মানুষ আক্রান্ত হয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে বিশ্বের অধিকাংশ মানব প্লেগের ঘটনা আফ্রিকায় ঘটেছে বলে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে।
এই ব্যাকটেরিয়া ওশেনিয়া ছাড়া বিশ্বের অন্য সব মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে গবেষণা থেকে ধারণা করা হয়, অন্তত পাঁচ হাজার বছর ধরে প্লেগ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটিয়ে আসছে।
ইতিহাসের তিনটি ভয়াবহ প্লেগ মহামারি
ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়া ইতিহাসের তিনটি ভয়াবহ মহামারির জন্য দায়ী বলে বিবেচিত হয়।
প্রথমটি ছিল জাস্টিনিয়ানের প্লেগ, যা ৫৪১ থেকে ৭৫০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তার লাভ করে। বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ানের রোমান সাম্রাজ্য পুনরায় একত্র করার প্রচেষ্টা এই মহামারিতে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। কিছু ইতিহাসবিদের মতে, এটি সাম্রাজ্যের পতনেও ভূমিকা রেখেছিল। ধারণা করা হয়, আফ্রিকায় ইঁদুরের শরীরে থাকা সংক্রমিত মাছির মাধ্যমে রোগটির বিস্তার শুরু হয় এবং বাণিজ্যপথ ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহাসিকদের কিছু পুরোনো হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রায় ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তবে আধুনিক কিছু গবেষক মনে করেন, প্রকৃত মৃত্যুসংখ্যা আগের অনুমানের চেয়ে কমও হতে পারে।
দ্বিতীয় মহামারিটি ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত। ১৩৪৭ সালে শুরু হয়ে এর বিভিন্ন পর্যায় ১৭০০-এর দশক পর্যন্ত চলেছিল। মধ্য এশিয়া থেকে উৎপত্তি হয়ে বাণিজ্যপথ ধরে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে এই রোগ। ঐতিহাসিক অনুমান অনুযায়ী, ইউরোপের প্রায় ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ মারা যায়। ইউরোপে মৃত্যুর সংখ্যা আনুমানিক আড়াই কোটি থেকে পাঁচ কোটি এবং বিশ্বজুড়ে সাত কোটি ৫০ লাখ থেকে ২০ কোটি পর্যন্ত বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
তৃতীয় প্লেগ মহামারি শুরু হয় ১৮৯৪ সালে চীনে। ১৯০১ সাল পর্যন্ত এর বিস্তার বিশেষভাবে আলোচিত হয়। বাষ্পচালিত জাহাজ ও বাণিজ্যপথের মাধ্যমে রোগটি বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ভারত ও চীনে এর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। এ মহামারিতে এশিয়ায় অধিকাংশ মৃত্যুসহ প্রায় এক কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষের মৃত্যু হয় বলে ঐতিহাসিক হিসাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিউমোনিক প্লেগের মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের সর্বশেষ নথিভুক্ত ঘটনা ঘটে ১৯২৪ সালে, লস অ্যাঞ্জেলেসে। এরপরও দেশটিতে বিচ্ছিন্নভাবে প্লেগের ঘটনা ঘটেছে।
দ্রুত চিকিৎসায় বাঁচার সম্ভাবনা বাড়ে
নিউমোনিক প্লেগ বিপজ্জনক হলেও দ্রুত শনাক্ত করা গেলে এবং উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্লেগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন বা চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। সিপ্রোফ্লক্সাসিন, লেভোফ্লক্সাসিন, মক্সিফ্লক্সাসিন, জেন্টামাইসিন ও স্ট্রেপটোমাইসিন—এই পাঁচটি অ্যান্টিবায়োটিক প্লেগের চিকিৎসায় কার্যকর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে কোন ওষুধ ব্যবহার করা হবে, তা রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসা নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে।
প্লেগের টিকা উনিশ শতক থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু নিউমোনিক প্লেগের বিরুদ্ধে এসব টিকা কতটা সুরক্ষা দেয়, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই ডব্লিউএইচও সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মিত প্লেগের টিকা নেওয়ার সুপারিশ করে না। বরং জীবাণুর সংস্পর্শে আসার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি এবং নিয়মিত প্লেগের জীবাণু নিয়ে কাজ করা পরীক্ষাগারের কর্মীদের ক্ষেত্রে টিকা বিবেচনার কথা বলে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নিউমোনিক প্লেগে সর্বশেষ একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ওই ব্যক্তি অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা ছিলেন। অসুস্থ বিড়ালের সংস্পর্শে কাজ করার সময় তিনি সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচটি মানব প্লেগের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
রাশিয়ার ইরকুতস্কের ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, সম্ভাব্য সংক্রমণের উৎস শনাক্ত করা এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা। প্লেগের আশঙ্কা থাকলেই যে সংক্রমণ নিশ্চিত, তা নয়। একইভাবে, পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়েও দেওয়া যায় না। স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ ও দ্রুত তদন্তই এ পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ কমানোর প্রধান উপায়।












