অক্টোবরের রাতের আকাশে দেখা মেলে এক বিশেষ মহাজাগতিক দৃশ্য—ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টি। অন্য অনেক উল্কাবৃষ্টির মতো এটি দেখার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। সন্ধ্যার পর থেকেই আকাশে উল্কার ঝলক দেখা যেতে পারে। অনুকূল পরিস্থিতিতে ঘণ্টায় প্রায় ১০টি উল্কা চোখে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে উল্কার সংখ্যা সব সময় এক রকম থাকে না; কখনো তা কম হতে পারে, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে হঠাৎ বেড়েও যেতে পারে।
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, রাত ৯টায় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় অনুযায়ী ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ সক্রিয়তার সময় নির্ধারিত ছিল। বাংলাদেশ সময়ের হিসাবে তা ছিল ৯ অক্টোবর শুক্রবার সকাল ৭টা। ফলে বাংলাদেশে বসে এই উল্কাবৃষ্টির প্রধান সময়টি সরাসরি দেখার সুযোগ ছিল না। তাছাড়া ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টি উত্তর গোলার্ধে তুলনামূলক ভালো দেখা যায়। দক্ষিণ গোলার্ধ থেকেও কিছু উল্কা দেখা সম্ভব, তবে সে ক্ষেত্রে দিগন্তের কাছাকাছি আকাশে নজর রাখতে হয়।
চাঁদের ক্ষয়িষ্ণু অর্ধচন্দ্রাকৃতির দশা এবার উল্কা দেখার ক্ষেত্রে বড় বাধা হওয়ার কথা ছিল না। চাঁদের আলো তুলনামূলক কম থাকলে আকাশে উল্কার রেখা শনাক্ত করা সহজ হয়। ড্রাকোনিডের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর উল্কাগুলো অনেক সময় অন্যান্য উল্কাবৃষ্টির তুলনায় ধীরে আকাশ অতিক্রম করে। ফলে কোনো উল্কা দেখা গেলে তার আলোর রেখা এক থেকে দুই সেকেন্ড পর্যন্ত চোখে পড়তে পারে।
ধূমকেতুর ধ্বংসাবশেষ থেকেই উল্কাবৃষ্টির সৃষ্টি
ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টির নাম এসেছে ড্রাকো বা ড্রাগন নক্ষত্রমণ্ডল থেকে। রাতের আকাশে উল্কাগুলোকে এমনভাবে দেখা যায়, যেন সেগুলো এই নক্ষত্রমণ্ডলের দিক থেকেই ছুটে আসছে। ড্রাগনের মাথার অংশ হিসেবে পরিচিত এলতানিন ও রাসতাবান নামের দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র এই নক্ষত্রমণ্ডল শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
উল্কাবৃষ্টি তৈরি হয় যখন পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে থাকা ধূমকেতু বা গ্রহাণুর ফেলে যাওয়া ধূলিকণা ও পাথুরে কণার পথ অতিক্রম করে। এসব ক্ষুদ্র কণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে প্রচণ্ড গতিতে উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠে। রাতের আকাশে তখন আলোর রেখার মতো দেখা যায়, যাকে সাধারণভাবে ‘ছুটন্ত তারা’ বলা হয়। তবে এগুলো আসলে তারা নয়; বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করা ক্ষুদ্র মহাজাগতিক কণার আলোকচ্ছটা।
ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টির উৎস হলো ২১পি/জিয়াকোবিনি-জিনার নামের একটি ধূমকেতু। প্রতিবছর অক্টোবর মাসে পৃথিবী এই ধূমকেতুর কক্ষপথের কাছাকাছি অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে যায়। ফলে প্রতিবছরই এই সময়ে ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টি দেখা যায়। ধূমকেতুটির আবিষ্কারক মিশেল জিয়াকোবিনির নাম অনুসারে এই উল্কাবৃষ্টিকে ‘জিয়াকোবিনিড’ নামেও ডাকা হয়। তিনি ১৯০০ সালে ধূমকেতুটি আবিষ্কার করেন।
কখনো কখনো দেখা দিতে পারে উল্কাঝড়
ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টি সাধারণত খুব বেশি উল্কা তৈরি করে না। তবে এর বিশেষত্ব হলো, কোনো কোনো বছর হঠাৎ উল্কার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিকে বলা হয় উল্কাঝড়। তখন প্রতি ঘণ্টায় শত শত, এমনকি হাজার হাজার উল্কাও দেখা যেতে পারে।
এ ধরনের ঘটনা ঘটে যখন পৃথিবী ধূমকেতুর ফেলে যাওয়া তুলনামূলক ঘন ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে যায়। ধূমকেতুর কক্ষপথে এসব কণা সমানভাবে ছড়িয়ে না থেকে কোনো কোনো অংশে বেশি ঘনত্বে জমা থাকতে পারে। পৃথিবী সেই অংশ অতিক্রম করলে অল্প সময়ে আকাশে উল্কার সংখ্যা বেড়ে যায়।
২১পি/জিয়াকোবিনি-জিনার ধূমকেতু প্রায় ছয় বছর সাত মাসে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। ২০১৮ সালে ধূমকেতুটি পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থানে আসার সময় ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টির কার্যকলাপ বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। ২০২৫ সালেও ধূমকেতুটি পৃথিবীর কাছাকাছি এসেছিল। তবে ধূমকেতুর কাছাকাছি আসা মানেই যে উল্কাঝড় হবে, এমন নয়। এ ধরনের আকস্মিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। ২০২৬ সালেও উল্কার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ ছিল, তবে বড় ধরনের উল্কাঝড় নিশ্চিতভাবে ঘটবে—এমন পূর্বাভাস ছিল না।
কীভাবে উল্কাবৃষ্টি দেখবেন?
ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টি দেখতে দূরবীন বা টেলিস্কোপের প্রয়োজন নেই। খোলা আকাশের নিচে এমন জায়গা বেছে নেওয়া ভালো, যেখানে ভবন, গাছপালা বা অন্য কোনো বস্তু দৃষ্টিসীমা আটকে দেয় না। শহরের উজ্জ্বল আলো থেকে দূরে গেলে উল্কা দেখার সম্ভাবনা বাড়ে।
আরাম করে হেলান দেওয়া যায় এমন চেয়ারে বসে কিংবা চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের বিস্তৃত অংশের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন। চোখকে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় দেওয়া উপকারী। এ সময় মোবাইল ফোনের উজ্জ্বল পর্দা এড়িয়ে চললে ক্ষীণ আলোর উল্কাও শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ড্রাকোনিড উল্কাবৃষ্টি উত্তর গোলার্ধে দেখা গেলেও দেশের অবস্থান ও আকাশের পরিস্থিতির কারণে এখানে দৃশ্যটি তুলনামূলক দুর্বল হতে পারে। ২০২৬ সালের উল্কাবৃষ্টির সক্রিয় সময় ছিল ৬ থেকে ১০ অক্টোবর। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উল্কা দেখার সম্ভাবনা থাকলেও ঘণ্টায় ১০টি উল্কা দেখা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। মেঘ, আলোকদূষণ ও দিগন্তের অবস্থান দৃশ্যমানতাকে প্রভাবিত করে। তাই পরিষ্কার আকাশ এবং কম কৃত্রিম আলো রয়েছে এমন স্থান বেছে নেওয়া জরুরি।
বছর শেষ হওয়ার আগে আরও যেসব উল্কাবৃষ্টি দেখা যাবে
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উল্কাবৃষ্টি দেখার সুযোগ রয়েছে।
আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে এবং আকাশে কৃত্রিম আলোর প্রভাব কম হলে এসব উল্কাবৃষ্টি দেখার অভিজ্ঞতা আরও ভালো হতে পারে। তবে প্রতিটি উল্কাবৃষ্টির দৃশ্যমানতা নির্ভর করে তার সক্রিয়তার মাত্রা, পর্যবেক্ষণস্থল ও আবহাওয়ার ওপর।












