কেবল স্মার্টফোন উৎপাদন নয়, এবার আরও উন্নত সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রাংশ তৈরির দিকে এগোচ্ছে ভিয়েতনাম। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় থাই নুয়েন প্রদেশে উৎপাদন বাড়াতে প্রায় ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ইলেকট্রো-মেকানিক্স। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ায়ও আরও ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি। সব মিলিয়ে ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।
স্যামসাং ইলেকট্রো-মেকানিক্স মূলত স্যামসাং গোষ্ঠীর যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি তারা এফসি-বিজিএ বা ফ্লিপ-চিপ বল গ্রিড অ্যারে সাবস্ট্রেট তৈরির জন্য দুটি বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই উপাদান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সার্ভার, রোবট, স্মার্ট গাড়ি এবং উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং ব্যবস্থায় ব্যবহৃত চিপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দক্ষিণ কোরিয়ার সেজং কারখানায় এ খাতে ৪ দশমিক ২৭ ট্রিলিয়ন কোরিয়ান ওন বা প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এটি একটি নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য স্যামসাং ইলেকট্রো-মেকানিক্সের সবচেয়ে বড় একক বিনিয়োগ। অন্যদিকে ভিয়েতনামের থাই নুয়েনের কারখানায় বিনিয়োগ করা হবে ২ দশমিক ৫১ ট্রিলিয়ন ওন বা প্রায় ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।

ভিয়েতনামে এই যাত্রা অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালে থাই নুয়েনে এফসি-বিজিএ সাবস্ট্রেট পরীক্ষা করার পরিকল্পনা নেয় স্যামসাং। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী হওয়ায় এবার সেখানে বড় পরিসরে উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্যামসাং ২০০৮ সালে ভিয়েতনামে মোবাইল ফোন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে বড় পরিসরে কার্যক্রম শুরু করে। এরপর দেশটিতে স্মার্টফোনের পাশাপাশি ডিসপ্লে ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের উৎপাদন বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এফসি-বিজিএ সাবস্ট্রেট উৎপাদনে যাওয়ার মাধ্যমে ভিয়েতনাম এখন স্যামসাংয়ের সরবরাহ ব্যবস্থার আরও উচ্চমূল্যের একটি অংশে প্রবেশ করছে।
এ বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এআই শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ। এআই ব্যবস্থায় ব্যবহৃত চিপগুলোকে একই সঙ্গে দ্রুত গণনা এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে হয়। ফলে চিপের কর্মক্ষমতা বাড়াতে আরও উন্নত প্যাকেজিং ও সাবস্ট্রেট প্রযুক্তির প্রয়োজন হচ্ছে।
স্যামসাং জানিয়েছে, এআইভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টরের উন্নয়নের সঙ্গে এফসি-বিজিএ সাবস্ট্রেটও বড় আকারের, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং আরও বেশি সমন্বিত কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। এ কারণে এই ধরনের উপাদানের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

থাই নুয়েনের কারখানায় তৈরি হওয়ার কথা রয়েছে ‘আল্ট্রা-লার্জ এফসি-বিজিএ’ সাবস্ট্রেট। ভিয়েতনামের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া নথি অনুযায়ী, এসব উপাদান এআই সার্ভার ও উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিংয়ের পাশাপাশি রোবট, স্মার্ট গাড়ি এবং প্রতিরক্ষা খাতেও ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে ভিয়েতনামের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখনো মূলত চিপ প্যাকেজিং, পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। অত্যাধুনিক চিপের মূল উৎপাদন এখনো দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপানের মতো দেশ ও অঞ্চলে বেশি কেন্দ্রীভূত। তারপরও স্যামসাং, ইন্টেল ও অ্যামকর টেকনোলজির মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ভিয়েতনামকে ধীরে ধীরে সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থার আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
স্যামসাংয়ের পরিকল্পনায় দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মধ্যে কাজের একটি বিভাজনও স্পষ্ট। সেজং কারখানায় তুলনামূলকভাবে বেশি মূল্য সংযোজন ও জটিল উৎপাদন করা হবে। আর থাই নুয়েন থেকে বৈশ্বিক বাজারের জন্য বড় পরিমাণে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। এতে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বও গুরুত্বপূর্ণ। স্যামসাং জানিয়েছে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর গ্রাহকদের সঙ্গে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এসব বিনিয়োগ হচ্ছে। এসব অংশীদারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা ও অর্ডারের নিশ্চয়তা পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান এতে যুক্ত এবং তারা কত অর্থ দেবে, তা প্রকাশ করেনি স্যামসাং।

এদিকে এআই ডেটা সেন্টার খাতের প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছু উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নের কাঠামোও ক্রমেই জটিল হচ্ছে। তবে স্যামসাং মনে করছে, এআই-ভিত্তিক অবকাঠামোর সম্প্রসারণ আরও দুই থেকে তিন বছর অব্যাহত থাকতে পারে।
ভিয়েতনামে সেমিকন্ডাক্টর বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রবণতা শুধু স্যামসাংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রডকম ও জাপানের টোপ্পান হোল্ডিংসের যৌথ উদ্যোগে সিঙ্গাপুরে উচ্চমানের এফসি-বিজিএ সাবস্ট্রেট কারখানা চালু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার এলজিও জুলাইয়ে ভিয়েতনামের কার্যক্রমে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। সেখানে বল গ্রিড অ্যারে এবং সিস্টেম-ইন-প্যাকেজ মডিউল উৎপাদন বাড়ানো হবে।
সব মিলিয়ে এশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থায় ভিয়েতনামের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। সবচেয়ে জটিল ও উচ্চমূল্যের উৎপাদন এখনো দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপানে কেন্দ্রীভূত থাকলেও উন্নত প্যাকেজিং ও সাবস্ট্রেট উৎপাদনে ভিয়েতনাম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে। স্যামসাংয়ের প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ সেই পরিবর্তনেরই আরেকটি বড় ইঙ্গিত।












