যুক্তরাষ্ট্রে চুল প্রতিস্থাপনের চিকিৎসা করাতে খরচ হতো ১৩ হাজার ডলারেরও বেশি। এত টাকা খরচ করার সামর্থ্য না থাকায় বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন ৩৯ বছর বয়সী নিকোল এথরিজ। শেষ পর্যন্ত তুরস্কের ইস্তাম্বুলে গিয়ে চুল প্রতিস্থাপন করান তিনি। চিকিৎসার পর চুল ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি নিজের চেহারা নিয়ে আত্মবিশ্বাসও ফিরে পেয়েছেন এই মার্কিন নারী।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারী নিকোল অর্থ খাতে কাজ করেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় তিনি। আগামী বছর বিয়ের পরিকল্পনা করছেন নিকোল। বিয়ের আগে নিজের চেহারা নিয়ে স্বস্তি ফিরে পাওয়ার বিষয়টি তাঁর কাছে বিশেষ আনন্দের।
সন্তান জন্মের পর চুল পড়া শুরু
নিকোলের চুল আগে থেকেই কিছুটা পাতলা ছিল। তবে ২০০৭ সালে মেয়ের জন্মের পর তিনি লক্ষ করেন, তাঁর চুল আরও বেশি পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে মাথার সামনের অংশে চুল কমে যাওয়ায় সমস্যাটি সহজেই চোখে পড়ত।

চুলের এই পরিবর্তন তাঁর আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। চুলের ঘাটতি ঢাকতে তিনি পরচুলা ব্যবহার শুরু করেন। চুল কাটাতে বা সাজাতে সেলুনে যেতেও অস্বস্তি বোধ করতেন, কারণ সেখানে চুলের সমস্যাটি আড়াল করা কঠিন ছিল।
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর তাঁর সমস্যাটিকে ট্র্যাকশন অ্যালোপেশিয়া হিসেবে শনাক্ত করা হয়। চুলে দীর্ঘদিন ধরে টান পড়ে—এমন আঁটসাঁট চুলের সাজ বা অন্য কোনো কারণে এই ধরনের চুল পড়তে পারে।
পরচুলার পেছনেও ছিল বড় খরচ
চুলের স্বাভাবিক রেখার সঙ্গে মিল রেখে তৈরি পরচুলা ব্যবহার করতেন নিকোল। প্রতিটির দাম ছিল প্রায় ৩০০ থেকে ৭০০ ডলার। কিন্তু এগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যেত না। কোনো কোনো বছরে তাঁকে নয়টি পর্যন্ত পরচুলা কিনতে হয়েছে।
খরচ কমানোর পাশাপাশি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অন্য নারীদের সাহায্য করতে তিনি নিজেই পরচুলা তৈরি শুরু করেন। পরে সেগুলো অন্য নারীদের কাছেও বিক্রি করতেন, যাঁরা একই ধরনের সমস্যায় ভুগছিলেন।
তবে নিজের তৈরি পরচুলা ব্যবহার করেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি তিনি। তাঁর মনে হতো, পরচুলা দিয়ে চেহারার পরিবর্তন আনা সম্ভব হলেও নিজের স্বাভাবিক চুল ফিরে পাওয়ার অনুভূতি আলাদা।
চুলের বৃদ্ধি বাড়াতে বিভিন্ন ক্রিম, মলম ও অন্যান্য পদ্ধতিও চেষ্টা করেন নিকোল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদিত একটি ওভার-দ্য-কাউন্টার চুলের বৃদ্ধি-সহায়ক পণ্যও ছিল। শুরুতে খুব বেশি আশা না করলেও সেটি ব্যবহারের পর তাঁর কিছু চুল ফিরে আসে। কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের বদলে তুরস্ক কেন
একপর্যায়ে চুল প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন নিকোল। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, এ জন্য ১৩ হাজার ডলারেরও বেশি খরচ হতে পারে। তাঁর পক্ষে এত টাকা ব্যয় করা সম্ভব ছিল না।

বিদেশে তুলনামূলক কম খরচে এই চিকিৎসা করানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেন তিনি। প্রথমে মেক্সিকোর কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু নিজের মতো কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের চিকিৎসা নেওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত বিবরণ না পাওয়ায় সেখানে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ হারান।
পরে তুরস্কের প্রতি আগ্রহী হন নিকোল। ইস্তাম্বুলের একটি ক্লিনিকের বিষয়ে জানতে পারেন, যেখানে তাঁর মতো দেখতে অনেক রোগী চুল প্রতিস্থাপন করিয়েছেন বলে তিনি দেখতে পান।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবা সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান ডক্টরসের (Doctours) সহায়তায় ক্লিনিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি হোটেলে থাকার ব্যবস্থাও করে দেয়।
চুল প্রতিস্থাপনের জন্য তাঁকে যে ২ হাজার ৬০০ ডলার খরচের হিসাব দেওয়া হয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবক হিসেবে কাজ করার সুবাদে তার অর্ধেক পরিশোধ করেন নিকোল। বিমানভাড়া বাবদ অতিরিক্ত ১ হাজার ২৫০ ডলার ব্যয় হয় তাঁর।
২০২৫ সালের আগস্টে চিকিৎসার জন্য ইস্তাম্বুলে যান তিনি। যাওয়ার আগে বন্ধুদের কাছ থেকে ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কবার্তা শুনে উদ্বিগ্নও হয়েছিলেন। তবে দীর্ঘদিনের পরচুলা ও মাথা ঢাকার কাপড়ের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা তাঁকে সিদ্ধান্তে অটল রাখে।
কীভাবে হলো চুল প্রতিস্থাপন
চিকিৎসার আগে নিকোল মাথার চুল পুরোপুরি কামিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর কাছে এটি বাধ্যতামূলক ছিল না; নিজের পছন্দেই তিনি এমনটি করেন।
চিকিৎসার সময় মাথার ত্বক অবশ করার জন্য দেওয়া ইনজেকশনগুলোই তাঁর কাছে সবচেয়ে ব্যথাদায়ক মনে হয়েছিল। পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি সচেতন ছিলেন। শুয়ে থাকা অবস্থায় কখনো গান শুনেছেন, কখনো নিজের ভাবনায় সময় কাটিয়েছেন।

চিকিৎসক দল তাঁর মাথার পেছনের অংশ থেকে চুলের ফলিকল বা চুলের গোড়া সংগ্রহ করে মাথার সামনের সমস্যাযুক্ত স্থানে প্রতিস্থাপন করেন।
পরদিন তাঁকে আবার ক্লিনিকে যেতে হয়। সেখানে বিশেষ পদ্ধতিতে চুল ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে নতুন চুলের যত্ন নিতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে ইস্তাম্বুলে চার দিন অবস্থান করেন নিকোল।
ছয় মাসে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন
চিকিৎসার প্রায় চার মাস পর তাঁর নতুন চুল গজাতে শুরু করে। তবে তখনই খুব বড় পরিবর্তন চোখে পড়েনি। ছয় মাসের মাথায় চুলের ঘনত্ব ও চেহারায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখতে পান তিনি।
প্রায় দুই দশক পর পরচুলা ছাড়াই বাইরে বের হওয়ার সাহস পান নিকোল। নিজের চেহারা নিয়ে স্বস্তি ফিরে আসার অভিজ্ঞতাটি তাঁর কাছে ছিল বিশেষ আনন্দের। বর্তমানে তাঁর চুল ছোট, পিক্সি ধরনের ছাঁটে রয়েছে, যা তাঁর পছন্দ।
আগামী বছর বিয়ের সময় চুল আরও কিছুটা বড় হয়ে সুন্দর একটি বব কাটের আকার নিতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। তবে চুল ঠিক কতটা লম্বা হবে, সেটি এখন আর তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
নিকোলের ভাষায়, নিজের চেহারা নিয়ে তিনি এখন অনেক বেশি খুশি। দীর্ঘদিন ধরে চুল পড়া ও পরচুলার ওপর নির্ভরতার কারণে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন বলেই তাঁর মনে হচ্ছে।
তবে নিকোলের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সবার জন্য একই ফলের নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। চুল প্রতিস্থাপনের খরচ, চিকিৎসার উপযোগিতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। বিদেশে চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চিকিৎসকের যোগ্যতা, ক্লিনিকের মান, পরবর্তী পরিচর্যা এবং জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ যাচাই করা জরুরি।












