শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য সংগ্রহ করা নয়; বরং সেই তথ্য বুঝতে শেখা, যুক্তি দিয়ে বিচার করা এবং নিজের চিন্তাকে ভাষায় প্রকাশ করার সক্ষমতা অর্জন করা। অথচ ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার শিক্ষার এই মৌলিক লক্ষ্যকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। শিক্ষার্থীরা যখন দীর্ঘ লেখা পড়ার পরিবর্তে পর্দায় ছোট ছোট তথ্য দেখে এবং নিজের ভাষায় লেখার বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করে, তখন তাদের শেখার প্রকৃত সক্ষমতা কতটা বিকশিত হচ্ছে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
জাপানে গত জুনে সংসদ স্কুলশিক্ষা আইন সংশোধন করে ডিজিটাল পাঠ্যবইকে মুদ্রিত বইয়ের সমান আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে বিদ্যালয়ে ডিজিটাল বইয়ের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে আলোচনা যতটা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা, স্মৃতিশক্তি ও স্বাধীন চিন্তার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ততটা সতর্কতা দেখা যাচ্ছে না।
এই অবহেলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা বিকাশে গুরুতর বাধা তৈরি করতে পারে। প্রযুক্তি শিক্ষাকে সহজ করছে—এমন ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে প্রশ্ন করতে হবে, সহজে তথ্য পাওয়ার সুযোগ কি সত্যিই গভীরভাবে শেখার ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, নাকি শিক্ষার্থীদের নিজের প্রচেষ্টায় জ্ঞান অর্জনের অভ্যাস দুর্বল করছে?
পড়া ও লেখার অভ্যাস হারানোর ঝুঁকি
২০২৫ সালে অ্যাপ্লায়েড নিউরোসায়েন্স কনসোর্টিয়ামের সহযোগিতায় আমি জাপানের ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ১ হাজার ৬২ জন শিক্ষার্থীর ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করি। সেখানে বই, সংবাদপত্র, সাময়িকী, পাঠ্যবই, কমিকস ও ইন্টারনেটে প্রকাশিত প্রবন্ধ পড়ার অভ্যাস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের ২০ শতাংশ জানান, দৈনন্দিন জীবনে তাঁরা এসবের কিছুই সাধারণত পড়েন না। প্রায় ১০ শতাংশের বক্তৃতা বা ক্লাসে নোট নেওয়ার অভ্যাসও ছিল না।

উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ-বোঝার পরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থীর পড়া ও লেখার অভ্যাস ছিল না, তাদের ফল ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তারা পরীক্ষার বিষয়বস্তু প্রায় বুঝতেই পারেনি।
এ ফলাফলকে শুধু শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহের সমস্যা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘ লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়া, হাতে নোট নেওয়া এবং যুক্তির ধারাবাহিকতা অনুসরণ করার অভ্যাসের সঙ্গে ভাষা বোঝার দক্ষতার সম্পর্ক রয়েছে। কাগজে ছাপা দীর্ঘ লেখা পড়ার পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট বার্তা, দ্রুত পরিবর্তনশীল ছবি ও ভিডিওতে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে কোনো বক্তব্যের সামগ্রিক অর্থ এবং তার পেছনের যুক্তি উপলব্ধি করা কঠিন হতে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে তথ্যের প্রাচুর্যকে প্রায়ই জ্ঞানের বিস্তার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তথ্যের পরিমাণ বাড়লেই বোঝার ক্ষমতা বাড়ে না। বরং তথ্যের দ্রুত প্রবাহের মধ্যে থেমে চিন্তা করার সুযোগ কমে গেলে মানুষের বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ঝুঁকি শুধু শিক্ষার্থীদের নয়; প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
পাঠ্যবইয়ের কাজ কি শুধু তথ্য পৌঁছে দেওয়া?
পাঠ্যবইয়ের বিশেষত্ব হলো, এটি শিক্ষার্থীকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ধারাবাহিকভাবে শেখার সুযোগ দেয়। একটি বই বারবার পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থী আগের জ্ঞানের সঙ্গে নতুন তথ্যের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পাঠ্যবইয়ে কিউআর কোডের ব্যবহার বেড়েছে। এসব কোড স্ক্যান করে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, ভিডিও কিংবা অতিরিক্ত তথ্য দেখতে পারে।
অতিরিক্ত তথ্য পাওয়ার সুবিধা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি অধ্যায় থেকে কী শেখা প্রয়োজন, কতটা গভীরে যাওয়া দরকার এবং কখন পরবর্তী বিষয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত—সেই সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। একটি নির্ধারিত পাঠের বদলে শিক্ষার্থী অসংখ্য অনলাইন উপাদানের মধ্যে ঘুরতে থাকে। এতে শেখার লক্ষ্য ও পরিধি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়।

ডিজিটাল পাঠ্যবইয়ের পক্ষে একটি প্রচলিত যুক্তি হলো, এতে অক্ষরের আকার সহজে পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু পড়ার অভিজ্ঞতা শুধু অক্ষরের আকারের ওপর নির্ভর করে না। মুদ্রিত বইয়ের পৃষ্ঠায় কোনো অনুচ্ছেদ কোথায় ছিল, একটি ধারণা অন্যটির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত ছিল কিংবা আলোচনার কোন পর্যায়ে একটি তথ্য এসেছে—এসবের সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্ক রয়েছে। পৃষ্ঠার অবস্থান ও বইয়ের সামগ্রিক বিন্যাস শিক্ষার্থীকে বিষয়বস্তুর কাঠামো মনে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ডিজিটাল পর্দায় এই স্থানিক ধারণা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে। ফলে বিচ্ছিন্ন তথ্য মনে থাকলেও পুরো আলোচনার বিন্যাস মনে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মুদ্রিত সংবাদপত্র বা বই খুললে চোখে এমন লেখা পড়তে পারে, যা খুঁজে দেখার কোনো পরিকল্পনা আগে ছিল না। মস্তিষ্ক একই সময়ে একাধিক দৃশ্যমান উপাদান পর্যবেক্ষণ করে আগ্রহের বিষয় শনাক্ত করতে পারে। এই সমান্তরাল অনুসন্ধান প্রক্রিয়া নতুন বিষয় আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি করে। ডিজিটাল মাধ্যমে সাধারণত নির্দিষ্ট শব্দ দিয়ে অনুসন্ধান বা নির্ধারিত লিংক অনুসরণ করতে হয়। ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ কমে যেতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি চিন্তার বিকল্প হতে পারে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর। বর্তমান ব্যবস্থাগুলো বিপুল পরিমাণ বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে নতুন উত্তর তৈরি করে। কিন্তু তাদের উৎপাদিত লেখা সব সময় স্বাধীন বিচার, মৌলিক উপলব্ধি কিংবা মানুষের মতো অভিজ্ঞতার ফল নয়। ব্যবহারকারীকে সন্তুষ্ট রাখার প্রবণতা থেকে কোনো কোনো ব্যবস্থা তার ধারণাকে প্রশ্ন করার বদলে সমর্থনও করতে পারে। এতে ভুল ধারণা আরও দৃঢ় হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরামর্শের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাও প্রকাশিত হয়েছে। তাই সমস্যাটিকে শুধু প্রযুক্তির সঙ্গে ভালোভাবে কাজ শেখার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা যায় না। পারমাণবিক শক্তি কিংবা জিন সম্পাদনার মতো শক্তিশালী প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও যেমন সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কঠোর সীমা নির্ধারণ করা জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের আইন অনুষদ এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে। সেখানে মূল্যায়নযোগ্য অধিকাংশ গবেষণাপত্র ও পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু লেখা তৈরি নয়, গবেষণার বিষয় নির্ধারণ, প্রবন্ধের কাঠামো তৈরি, আইনি বিধানের সারসংক্ষেপ কিংবা অন্য ভাষায় লেখা প্রবন্ধ ইংরেজিতে অনুবাদ ও ব্যাকরণ সংশোধনের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এর পেছনে যুক্তি হলো, আইনজীবী হতে হলে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, যুক্তি নির্মাণ এবং নিজের বক্তব্য যথাযথভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। একই প্রয়োজন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অন্যান্য শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে। জাপানের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাতে লিখে প্রতিবেদন জমা দেওয়া এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্র ছাড়া সরাসরি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ দেখা গেলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিস্তৃত নীতিনির্ধারণ এখনো শুরু হয়নি।
দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে সহজ সমাধান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে লেখা তৈরি করালে একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। পাঠক বা মূল্যায়নকারী যে লেখাকে শিক্ষার্থীর নিজস্ব কাজ বলে মনে করছেন, সেটি হয়তো তার নিজের চিন্তা ও ভাষাগত সক্ষমতার প্রকৃত প্রতিফলন নয়। পরিস্থিতিভেদে এটি একাডেমিক অসততা বা অন্যের কাজ নিজের নামে চালানোর সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
কেউ কেউ যুক্তি দেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু ধারণা সংগ্রহ কিংবা বাক্য সংশোধনের কাজে ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই সীমিত অনুমতিও নির্ভরতার সমস্যা পুরোপুরি দূর করে না। প্রতিবার কঠিন বাক্য নিজে লেখার পরিবর্তে যন্ত্রের সাহায্য নিলে ভাষা ব্যবহারের অনুশীলন কমে যায়। যুক্তি সাজানো, ভুল শনাক্ত করা এবং অস্পষ্ট বক্তব্যকে পরিষ্কার করার যে মানসিক শ্রম দক্ষতা তৈরি করে, তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে দক্ষ ও অদক্ষ মানুষের মধ্যে আয় ও সক্ষমতার ব্যবধান বাড়বে—এমন আশঙ্কা প্রায়ই আলোচিত হয়। কিন্তু আরেকটি বিভাজনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। একদিকে থাকবে তারা, যারা প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে নিজেদের চিন্তা ও ভাষার দক্ষতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। অন্যদিকে থাকবে তারা, যারা নিজে পড়ে, লেখে, ভুল করে এবং সমস্যার সমাধান খুঁজে স্বাধীনভাবে সক্ষমতা গড়ে তুলবে।
শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্বিতীয় ধরনের সক্ষমতা বিকাশ করা। প্রযুক্তির ব্যবহার তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে সহায়তা করে; যখন তা এসব দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয় অনুশীলনকে প্রতিস্থাপন করে, তখন সেটিকে অগ্রগতি বলা যায় না।
তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল পাঠ্যবই ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে শুধু সুবিধা-অসুবিধার ভারসাম্য খোঁজা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ক, ভাষা ও চিন্তার বিকাশের জন্য কোন অভ্যাসগুলো অপরিহার্য, তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। সেই বিবেচনায় শ্রেণিকক্ষে মুদ্রিত বইকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং শিক্ষামূলক কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিষিদ্ধ করার পক্ষে শক্ত যুক্তি রয়েছে। কারণ শিক্ষার চূড়ান্ত সাফল্য কত দ্রুত উত্তর পাওয়া গেল, তা দিয়ে নয়; বরং শিক্ষার্থী নিজে কতটা বুঝতে, ভাবতে এবং প্রকাশ করতে শিখল, তা দিয়েই নির্ধারিত হওয়া উচিত।












