রাশিয়া ছেড়ে নির্বাসনে থাকা সাংবাদিকদের জীবন, সংগ্রাম ও সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়ার লড়াই নিয়ে নির্মিত হয়েছে প্রায় ছয় ঘণ্টার তথ্যচিত্র ‘মাই আনডিজায়ারেবল ফ্রেন্ডস: পার্ট টু—এক্সাইল’। নির্মাতা জুলিয়া লোকতেভের এই চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া রুশ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা।
চলতি সপ্তাহান্তে নির্বাচিত কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে তথ্যচিত্রটি মুক্তি পাওয়ার কথা। এর মধ্য দিয়ে লোকতেভের পাঁচ বছরব্যাপী একটি চলচ্চিত্র প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি ঘটছে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের প্রথম অংশে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনামলে ক্রমবর্ধমান সরকারি চাপের মুখে থাকা স্বাধীন সাংবাদিকদের জীবন তুলে ধরা হয়েছিল।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনেক সাংবাদিক দেশ ছেড়ে চলে যান। এরপরও লোকতেভ তাঁদের জীবন ও নির্বাসনে থেকে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করতে থাকেন।
নির্মাতার মতে, তথ্যচিত্রটির মূল বিষয় শুধু দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নয়; বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকা, আশাবাদ ধরে রাখা এবং সাংবাদিকতার কাজ চালিয়ে যাওয়া। জনমনে কোনো ঘটনা নিয়ে আগ্রহ কমে গেলেও সংশ্লিষ্ট সংকট যে শেষ হয়ে যায় না, সেই বাস্তবতাও দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্ম নেওয়া লোকতেভ মাত্র নয় বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তথ্যচিত্রটি নির্মাণের সময় তিনি আইফোন ব্যবহার করে তাঁর চলচ্চিত্রের চরিত্রদের দৈনন্দিন জীবন ধারণ করেছেন। তাঁর আগের তথ্যচিত্র ‘মাই আনডিজায়ারেবল ফ্রেন্ডস: পার্ট ওয়ান—লাস্ট এয়ার ইন মস্কো’ অস্কারের মনোনয়নের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল।
রাশিয়ায় স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপও এই চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। রুশ কর্তৃপক্ষ কয়েক ডজন সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিককে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ধরনের পরিচয়ের সঙ্গে বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত বিধিনিষেধও যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের কারাবন্দি করার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে অনেক স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় রাশিয়ার বাইরে স্থানান্তরিত হয়েছে।
তথ্যচিত্রের অন্যতম চরিত্র সাবেক সাংবাদিক পিটার রুজাভিন। তিনি একপর্যায়ে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তাঁর উপলব্ধি ছিল, শুধু সাংবাদিকতার মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়। তাঁর এই সিদ্ধান্ত নির্বাসিত সাংবাদিকদের সামনে থাকা কঠিন বাস্তবতা এবং ব্যক্তিগত পছন্দের জটিলতাকে তুলে ধরে।
লোকতেভ ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের তৃতীয় পর্ব নির্মাণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। তবে সেটি নির্ভর করবে রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর।
নির্মাতার বক্তব্য অনুযায়ী, এই তথ্যচিত্রের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দর্শকদের মনে করিয়ে দেওয়া—বিশ্বের মনোযোগ অন্য কোনো ঘটনা বা সংকটের দিকে সরে গেলেও আগের সমস্যাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় না। নির্বাসনে থাকা সাংবাদিকদের জীবন ও কাজের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি সেই দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতাই তুলে ধরেছে।












