রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে টমেটোর দাম কেজিতে বেড়ে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায় উঠেছে। ডিমের দামও ডজনে বেড়েছে ৫ টাকা। মাছ-মাংসের চড়া দামের সঙ্গে সবজির বাড়তি খরচ মিলিয়ে সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। অনেকের কাছে এখন খাবারের পুষ্টিমান নিশ্চিত করার চেয়ে কোনোমতে খেয়ে বেঁচে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীর মেরাদিয়া বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাজারে আসা ক্রেতাদের অভিযোগ, অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কয়েক দিন আগেও যে টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে পাওয়া যেত, সেটিই এখন কিনতে হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। অন্যদিকে পটোলের দাম কিছুটা কমেছে। কেজিপ্রতি ৪০ টাকা কমে এটি এখন প্রায় ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে ডিমের দামও বেড়েছে। প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকায়, যা আগের তুলনায় ৫ টাকা বেশি। মাছের দামেও স্বস্তি নেই। ফলে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় মাছ, ডিম ও বিভিন্ন ধরনের সবজি রাখতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখে পড়ছেন ক্রেতারা।
বাজার করতে আসা নাসরিন বেগম বলেন, কয়েক দিন আগেও টমেটো ১০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। হঠাৎ করে সেই টমেটোর দাম কীভাবে ২৫০ টাকা হয়ে গেল, তা বুঝতে পারছেন না তিনি। অন্যান্য সবজির দামও কমেনি; বরং অনেক পণ্যের দাম বাড়তির দিকে। ডিম কিনতেও এখন বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, মাছ-মাংস তো গরিব মানুষের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
নাসরিন বেগম বলেন, “আমরা এখন পুষ্টির দিক দেখি না। খেয়ে বেঁচে থাকতে পারলেই হলো।” তাঁর এই বক্তব্যে বাজারের বাড়তি দামের কারণে সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় তৈরি হওয়া চাপের চিত্র ফুটে ওঠে।
কোন সবজির দাম কত
মেরাদিয়া বাজারে প্রতি কেজি ঢ্যাঁড়স ৭০ টাকা, ধুন্দল ৭০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, পটোল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ ২৪০ টাকা, পেঁয়াজ ৬০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গোল বেগুনের দাম কেজিতে ১৬০ টাকা।
এ ছাড়া টমেটো ২৪০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, ঝিঙে ৭০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, লাউ ৬০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৫০ টাকা এবং কাঁচকলা প্রতি হালি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শিমের দাম কেজিতে ১২০ থেকে ১৬০ টাকা। রসুনের দাম মান ও ধরনভেদে ১০০ থেকে ২০০ টাকা এবং কাঁকরোল ৭০ টাকা কেজি।
মুরগির বাজারেও দাম তুলনামূলক বেশি। পোলট্রি মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ টাকা এবং কক মুরগি ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের মধ্যে রুইয়ের দাম প্রতি কেজি ৩৬০ থেকে ৪২০ টাকা। তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকায়। আর পাঙাশের দাম কেজিপ্রতি ২৫০ থেকে ৩৩০ টাকা।
সরবরাহ কমলে বাড়ে সবজির দাম
সবজি বিক্রেতা সুমন জানান, শুক্রবারের তুলনায় রোববার বাজারে কিছু সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা কমেছে। তবে টমেটোর সরবরাহ কম থাকায় এর দাম বেশি। তাঁর দাবি, শিমের দাম আগে কেজিতে ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, যা এখন ১৬০ টাকায় নেমেছে। বেগুনের দামও কেজিতে ১০ টাকা কমেছে।
সুমন বলেন, কাঁচা সবজির দাম কখন বাড়ে আর কখন কমে, তা বোঝা কঠিন। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে দাম কমে যায়, আর সরবরাহ কমে গেলে দাম বেড়ে যায়। পাইকারি বাজারে বেশি দামে কিনতে হলে খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।
পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকেও দাম না কমার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এই বিক্রেতা। তাঁর মতে, সরবরাহ ও পরিবহন খরচের ওপর বাজারদর অনেকটাই নির্ভর করে। তবে এসব কারণের মধ্যেও ক্রেতাদের জন্য পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
পরিবহন খরচে বাড়ছে মাছের দাম
মাছ বিক্রেতা জসিমও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে মাছের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, আগে পরিবহন খরচ তুলনামূলক কম থাকায় মাছও কিছুটা কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হতো। এখন মাছ ঢাকায় আনতে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আগে রাজশাহী থেকে এক ট্রাক তাজা রুই মাছ ঢাকায় আনতে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগত। এখন ১৮ হাজার টাকার কমে কেউ ট্রাক নিয়ে আসতে চান না। পরিবহন ব্যয় এভাবে বেড়ে গেলে মাছের দামও বাড়ে বলে তাঁর দাবি।
মাছ-মাংস কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে
বাজার করতে আসা মানিক মিয়া বলেন, তাঁরা দরিদ্র মানুষ। বেশি দামের কারণে প্রতিদিন মাছ কেনা সম্ভব হয় না। ডিমের দামও বাড়ছে। গরুর মাংস কেনার কথা ভাবাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, গরুর মাংসের দাম কেজিতে ৮২০ টাকা। এই দামে তাঁদের পক্ষে মাংস কেনা সম্ভব নয়। মুরগির দামও কেজিতে প্রায় ২০০ টাকা। ফলে সপ্তাহে এক দিনও মুরগি কেনা সম্ভব হয় না বলে জানান তিনি।
আরেক ক্রেতা আকবর হোসেন বলেন, আগে তাঁরা প্রতিদিন মাছ-মাংস খেতেন। এখন বাজার করার আগে অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হয়। নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতিতে সবার জন্যই সামনে আরও কঠিন সময় আসতে পারে।
আকবর হোসেন বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁর প্রত্যাশা, নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বাজারের এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন সীমিত আয়ের পরিবারগুলো। খাবারের পেছনে ব্যয় বাড়লেও সেই অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য বাড়ছে না। ফলে পরিবারের প্রয়োজনীয় খাবার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনেককে পুষ্টির চেয়ে দাম ও সামর্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা না ফিরলে সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ওপর এই চাপ আরও বাড়তে পারে।












