ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে ১১ অক্টোবরও উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। আগের দিন ব্যাপক ধরপাকড়ের পর রোববারও বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। এদিন আদালতের নির্দেশে মুক্তি পান ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং সংগঠনটির আরও দুই জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। মুক্তির পর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় সংগঠনটি।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আটক নেতাদের মুক্তি, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
ককরোচ জনতা পার্টি—সংক্ষেপে সিজেপি—একটি যুবভিত্তিক আন্দোলন, যা বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক ইস্যুতে প্রতিবাদ করে আসছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে ১০ অক্টোবর দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তাঁদের উড়োজাহাজ থেকেই আটক করা হয়। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল রাজধানীর যন্তর মন্তরে নির্বাচন কমিশনবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া।
১১ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে তিন নেতা মুক্তি পান। সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এক বছর শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার শর্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে এই শর্তের সুনির্দিষ্ট অর্থ কী এবং তা ভবিষ্যতে তাঁদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলবে, তা স্পষ্ট নয়।
মুক্তির পর অভিজিৎ দীপকে বলেন, তাঁরা আন্দোলন বন্ধ করবেন না। তাঁর বক্তব্য, বিক্ষোভ না করার কোনো অঙ্গীকারনামায় তিনি সই করেননি। সংগঠনটিও দিল্লিতে অবস্থানরত সমর্থকদের সেখানে থাকার আহ্বান জানায় এবং পরবর্তী কর্মসূচির ঘোষণা শিগগিরই দেওয়া হবে বলে জানায়।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধ
ভারতের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিষয়টি ঘিরেই সাম্প্রতিক প্রতিবাদ জোরালো হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং এর ফলে বিরোধী দলগুলোর সমর্থকসহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তি, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ভোটার এবং ৩ কোটি এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে কমিশনের তথ্য। এই সংখ্যাগুলো নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য; নাম বাদ দেওয়ার সব ঘটনা অনিয়মের ফল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি এগুলো একা দেয় না।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক এবং কোনো রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। কমিশনের দাবি, ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটারেরা পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারেন। বিজেপিও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, অযোগ্য ও দ্বৈত নাম বাদ দেওয়ার জন্য ভোটার তালিকা সংশোধন প্রয়োজন।
দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তা, বিক্ষোভকারীদের আটক
১০ অক্টোবরের কর্মসূচি ঠেকাতে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে প্রায় ৪১ হাজার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সেদিন প্রায় সাত হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছিল। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের বক্তব্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার ২ হাজার ৪০০ জনকে আটক করা হয় এবং তাঁদের অধিকাংশকেই রাতের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আটক ব্যক্তির সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে; তাই সংখ্যাগুলোকে একই হিসাব হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লির একাধিক এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। মেট্রোর কয়েকটি স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং কিছু ট্রেন চলাচলও বাতিল করা হয়। পরে মেট্রো স্টেশন খুলে দেওয়া হয়, ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার ঘোষণা আসে এবং মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও পুনরায় চালু করা হয়।
১১ অক্টোবরও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়। পুলিশ কয়েকটি জমায়েত ছত্রভঙ্গ করে এবং কয়েকজনকে আটক করে। দিল্লির বাইরে মুম্বাই, কলকাতা, পানাজি ও পুনেতেও প্রতিবাদ কর্মসূচির খবর পাওয়া যায়।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক
সিজেপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, আটক অবস্থায় তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। অভিজিৎ দীপকে জানান, তাঁর দাদির মৃত্যুর খবর তাঁকে জানানো হলেও আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন ব্যবহারের অনুরোধ পূরণ করা হয়নি। আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগও চেয়েছিলেন বলে তাঁর দাবি।
দিল্লি পুলিশ একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দীপকেকে দাদির মৃত্যুর খবর জানানোর পর বাড়ি ফেরার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে দেখা যায় বলে পুলিশ দাবি করে। দীপকে পাল্টা অভিযোগ করেন, ভিডিওতে ফোন ব্যবহার ও আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার অনুমতি চাওয়ার অংশটি দেখানো হয়নি। ফলে ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বিরোধ রয়েছে।
দীপকের বাবা ভগবান দীপকে অভিযোগ করেন, পুলিশ সময়মতো ছেলের মুক্তির ব্যবস্থা করলে তিনি দাদির শেষকৃত্যে অংশ নিতে পারতেন। এটি পরিবারের অভিযোগ; পুলিশি সিদ্ধান্তের পেছনের পূর্ণ পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং আরও দাবি করেন, সংগঠনটির জাতীয় মুখপাত্র সুধীর সাংওয়ান এবং যুগ্ম সম্পাদক বালাকৃষ্ণন শুক্লাকে ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় দিল্লির কনট প্লেস এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে, তা পুলিশকে জানাতে বলেন তিনি। এই তথ্যটি সিজেপির পক্ষ থেকে করা দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
রাজ্যসভার সদস্য জন ব্রিটাসও অভিযোগ করেন, পুলিশি হেফাজতে তাঁকে ধাক্কাধাক্কি ও মারধর করা হয়েছে এবং পরে রাস্তার পাশে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের ওপর পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগ তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই এসব অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ও বিরোধীদের অবস্থান
বিক্ষোভ ও আটক নিয়ে ১১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ শুনানি হয়। আদালতে সরকার আশ্বাস দেয়, দায়িত্ব পালনের সময় আইনজীবী ও সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেওয়া হবে না। এর আগে বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আটক করার ঘটনাও সামনে আসে।
এদিকে, বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র নেতারা ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত শুনানির দাবিতে পরবর্তী দিন সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করার পরিকল্পনা জানান। তবে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তাঁদের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ গ্রহণ করেননি বলে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে। আদালতের বক্তব্য ছিল, বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আবেদন জানানো উচিত।
দিল্লির বাইরে গোয়ার পানাজিতে আটক সিজেপির ছয় কর্মীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয় বোম্বে হাইকোর্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মুম্বাইয়েও বিক্ষোভকারীদের আটকের প্রতিবাদে কর্মসূচি হয়। সেখানে মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার নেতা অমিত ঠাকরে ও শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) নেতা আদিত্য ঠাকরে প্রতিবাদে অংশ নেন বলে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসওয়ান সিজেপির বিক্ষোভকে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা বলে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, কংগ্রেসের সাংসদ জেবি মাথার দিল্লিতে আরও বড় প্রতিবাদ কর্মসূচির ইঙ্গিত দেন।
বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের আচরণ নিয়েও রাজনৈতিক নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন। তবে সরকারপক্ষের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। এই পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
সিজেপি জানিয়েছে, তারা নতুন কর্মসূচি ঘোষণার আগে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করবে এবং যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট তারিখ চাইবে। সংগঠনটির দাবি, নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। অন্যদিকে, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সংশোধন প্রক্রিয়া বৈধ ভোটারদের তালিকা হালনাগাদ করার জন্যই নেওয়া হয়েছে।












