যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভ্রাতৃসংঘ ও নারীসংঘের নামে পরিচালিত সামাজিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধুত্ব, নেটওয়ার্কিং ও ক্যাম্পাসজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু যৌন নিপীড়ন, বর্ণবৈষম্য, অপমানজনক দীক্ষা-প্রথা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ বারবার সামনে আসায় এসব সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে। সমস্যা কি কয়েকটি সংগঠনের বিচ্ছিন্ন আচরণে, নাকি পুরো ব্যবস্থাটির কাঠামোর মধ্যেই এমন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা সংস্কারের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়?
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভ্রাতৃসংঘের বাড়িতে সংঘটিত যৌন নিপীড়নের ঘটনা সেই প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে। ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে এর পেছনে থাকা বৃহত্তর সামাজিক কাঠামো আড়ালে থেকে যেতে পারে। ক্যাম্পাসে যৌন সহিংসতার সঙ্গে ভ্রাতৃসংঘের সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত গবেষণার পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ পুরুষ শিক্ষার্থীদের তুলনায় ভ্রাতৃসংঘের সদস্যদের যৌন নিপীড়ন করার সম্ভাবনা তিন গুণ। নারীসংঘের সদস্যদের ক্ষেত্রে অন্য নারী শিক্ষার্থীদের তুলনায় যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঝুঁকি ৭৪ শতাংশ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের চার সাবেক শিক্ষার্থী—অ্যাবি শার্কিস, পার্থভ ইশ্বর, বেলা পারাক্কা ও অলিভিয়া ও’কনর—ভ্রাতৃসংঘ ও নারীসংঘ বিলুপ্ত করার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা দেখায়, সমস্যার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা যতটা কঠিন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের বিরুদ্ধে পরিবর্তন আনা তার চেয়েও কঠিন।

ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের শুরু
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বাড়িতে বসেই বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু করেছিলেন তাঁরা। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ পেতে থাকে। এসব বর্ণনায় উঠে আসে বর্ণবৈষম্য, যৌন নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর দীক্ষা-প্রথার অভিযোগ। ঘটনাগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃসংঘ ও নারীসংঘের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়।
২০২১ সালে ক্যাম্পাসে ফিরে তাঁরা দেখেন, যেসব সহপাঠী অনলাইনে এসব সংগঠনের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ আবার সদস্য হওয়ার জন্য সারিবদ্ধ হচ্ছেন। তাঁদের কাছে বিষয়টি ছিল দ্বৈত মানদণ্ডের উদাহরণ। অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে একই মাত্রার যৌন নিপীড়নের ঝুঁকির তথ্য থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় কি সেই সংগঠনকে স্বাভাবিকভাবে প্রচার ও সদস্য সংগ্রহের সুযোগ দিত?
চার শিক্ষার্থী প্রথমে একটি ক্লাব গঠনের চেষ্টা করেন, যার লক্ষ্য ছিল ক্যাম্পাসে ভ্রাতৃসংঘ ও নারীসংঘ বিলুপ্ত করা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তাদের জানানো হয়, বিলুপ্তির বদলে সংস্কারের লক্ষ্য গ্রহণ করলেই কেবল আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব। আন্দোলনকারীরা সেই শর্ত মানেননি।
শিক্ষার্থীদের দ্বিধা এবং বিকল্পের প্রয়োজন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিসংখ্যান ও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাঁরা সমর্থন পেয়েছেন, আবার বিদ্রূপ ও বিরোধিতারও মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ তাঁদের অভিযোগকে অতিরঞ্জিত বলেছেন, কেউ মনে করেছেন, ভ্রাতৃসংঘের সমস্যা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি, আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়।
তবে আন্দোলনের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। অনেক শিক্ষার্থী এসব সংগঠনের আচরণে অস্বস্তি বোধ করলেও সামাজিক সম্পর্ক ও একটি গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে সেখানে যোগ দিতে চাইতেন। অর্থাৎ, কেবল সংগঠন নিষিদ্ধ করার দাবি তুললেই হবে না; শিক্ষার্থীদের সামাজিক সংযোগ, বন্ধুত্ব ও সহায়তার প্রয়োজনও পূরণ করতে হবে।
২০২২ সালের বসন্তে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে গণভোটে দুটি প্রশ্ন তোলা হয়। ভোট দেওয়া শিক্ষার্থীদের ৪৬ শতাংশ ক্যাম্পাসে ভ্রাতৃসংঘ ও নারীসংঘের উপস্থিতির বিরোধিতা করেন, আর ৪১ শতাংশ এর পক্ষে মত দেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য এসব সংগঠনের বিকল্প চেয়েছিলেন।
ফলাফল দেখায়, বিলুপ্তির পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও বিকল্প সামাজিক কাঠামোর চাহিদা ছিল স্পষ্ট। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের দাবিতে কোনো পরিবর্তন আনেনি।

সংস্কারের সীমা কোথায়?
প্রশ্ন উঠতে পারে, কোনো সংগঠনের সদস্যদের অপরাধের দায় পুরো সংগঠনের ওপর চাপানো কতটা যুক্তিসংগত। সমালোচকদের একটি যুক্তি হলো, সংগঠন বিলুপ্ত করলেই মানুষের আচরণ বদলে যাবে না; একই ব্যক্তিরা অন্য নামে নতুন গোষ্ঠী তৈরি করতে পারেন। এই আপত্তি উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বিদ্যমান সংগঠনগুলোর কাঠামো, ক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন নেই।
বিলুপ্তির পক্ষে আরেকটি যুক্তি অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঘিরে। একটি জরিপে দেখা গেছে, ভ্রাতৃসংঘ বা নারীসংঘের সাবেক সদস্যদের ৫৪ শতাংশ তাঁদের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুদান দিয়েছেন। অন্যদিকে, এসব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না—এমন সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুদান দেওয়ার হার ছিল ১০ শতাংশ। এই ব্যবধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে একটি সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত তৈরি করে: যেসব সংগঠন থেকে আর্থিক সহায়তা আসে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা আগ্রহী হবে?
এটি প্রমাণ করে না যে অনুদানের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অভিযোগ উপেক্ষা করে। তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি করে।

অন্য পথ কি সম্ভব?
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রাতৃসংঘের ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই এ ধরনের সংগঠনকে জায়গা দেয়নি। রাইস, নটর ডেম, কোলবি, আলফ্রেড ও আমহার্স্টের মতো প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা দেখায়, ক্যাম্পাসজীবনকে সংগঠিত করার জন্য ভ্রাতৃসংঘনির্ভর মডেল অপরিহার্য নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের একত্র হওয়ার সুযোগ দেওয়া নয়; সেই পরিবেশ নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জবাবদিহিমূলক রাখাও। বিকল্প সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া দল, শিল্পচর্চার গোষ্ঠী ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগকে কার্যকরভাবে সহায়তা করা গেলে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয় কমতে পারে। তাতে শিক্ষার্থীদের জন্য ভ্রাতৃসংঘে যোগ দেওয়া একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হয়ে থাকবে না।
সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু বছরের পর বছর অভিযোগ ও বিতর্কের পরও যদি একই ধরনের ঘটনা ফিরে আসে, তাহলে সংস্কারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক। বিলুপ্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে: নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু প্রচলিত ব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষা নয়, তার বিকল্প নির্মাণের দায়িত্বও নিতে হবে। ভালো ক্যাম্পাসজীবনের জন্য ক্ষতিকর কাঠামোকে অপরিহার্য ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।












