ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটের ভেতরে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ডিপ্লোমা মিডওয়াইফ নার্স বিথী আক্তারের ক্ষেত্রে। অস্ত্রোপচারের প্রায় পাঁচ মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এরই মধ্যে মৃত্যুর আগে বিথীর স্বামী রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ৫৫ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে আপসের একটি নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাটি ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া নথিটি ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তৈরি। এতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৫৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা আর্থিক দাবি না করার শর্তের কথাও বলা হয়েছে। নথিতে বিথীর স্বামী রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর দেখা গেলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে। তবে নথিটির সত্যতা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যোতিনবর্দিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বিথী আক্তারের বয়স ছিল ২৫ বছর। তিনি ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর স্বামী রাকিবুল ইসলাম।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন বিথী। অস্ত্রোপচারটি করেন চিকিৎসক তামান্না ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দ। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসায় অবহেলার কারণে বিথীর পেটের ভেতরে গজ রেখেই সেলাই করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও বিভিন্ন জটিলতায় ভুগতে থাকেন তিনি।
পরিবারের অভিযোগ, প্রথম অস্ত্রোপচারের পর বিথীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে প্রায় দুই মাস পর, ১৫ জুলাই, তাঁর দ্বিতীয়বার বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে কয়েক দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কিন্তু চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৪ অক্টোবর বিথীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ অক্টোবর সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর অস্ত্রোপচারে অবহেলার অভিযোগ এবং আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে আপসের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
আর্থিক চাপে আপসে রাজি হওয়ার কথা স্বামীর
আপসের নথি নিয়ে বিথীর স্বামী রাকিবুল ইসলাম জানান, ওই সময় তাঁর হাতে মাত্র ২০ হাজার টাকা ছিল। হাসপাতালের বকেয়া বিলসহ বিভিন্ন আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে তিনি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন। পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং নিজেদের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
রাকিবুলের ভাষ্য, স্ত্রীর জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তিনি আপসে রাজি হয়েছিলেন। বিথী মারা যাবেন, এমনটা তিনি জানতেন না বলেও জানান। এখন সবাই তাঁকে দোষারোপ করায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, আইনি জটিলতা এড়িয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চান। তাঁর বক্তব্যে আর্থিক সংকটের মধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে অসহায়ত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নথিতে ৫৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার উল্লেখ থাকলেও রাকিবুলের বক্তব্যে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা এসেছে। এই দুই অঙ্কের পার্থক্যের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত পরিমাণ এবং আপসের শর্তগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু জানিয়েছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টাকা দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে এ-সংক্রান্ত একটি নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি শুনেছেন।
তিনি জানান, বিথীর চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
বিথীর চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান স্বপন কুমার বিশ্বাসকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিথীর মৃত্যুর ঘটনায় অস্ত্রোপচারে অবহেলার অভিযোগ, আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে আপসের নথি এবং স্বামীর বক্তব্য—সব মিলিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছিল কি না, আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত বিবরণ কী এবং আপসের শর্তের আইনগত প্রভাব কতটুকু—এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই জরুরি। তদন্তের ফল প্রকাশিত হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।












