যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ইলন মাস্কের নেতৃত্বে গঠিত সরকারি দক্ষতা বিভাগ—ডোজের (ডিওজিই) সাবেক সদস্যদের অনেকে এখন বেসরকারি খাতে ব্যবসা গড়ে তুলছেন, বিনিয়োগ পাচ্ছেন এবং সরকারি চুক্তি পাওয়ার দৌড়ে নামছেন। তাঁদের সরকারি অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে অন্তত ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। তবে স্বল্প সময় সরকারি দায়িত্ব পালনের পর বিপুল বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার ঘটনাটি সরকারি নৈতিকতা, স্বার্থের সংঘাত এবং জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
১২ অক্টোবর প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডোজের সঙ্গে যুক্ত প্রায় দুই ডজন সাবেক কর্মী সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান নির্বাহী বা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হয়েছেন। কেউ কেউ সরকারি চুক্তি বা অনুমোদন পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকা স্টার্টআপে বড় অঙ্কের বিনিয়োগও করেছেন। সরকারি চুক্তি পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত মার্কিন অনলাইন পোর্টাল স্যাম ডট গভ-এ অন্তত ছয়জন সাবেক ডোজে-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিবন্ধনের তথ্যও পেয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
সরকারি অভিজ্ঞতা বেসরকারি ব্যবসার পুঁজি
ডোজে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় ও প্রশাসনিক কাঠামো সংকুচিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সরকারি ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সংস্থাটির সাফল্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর সাবেক সদস্যদের অভিজ্ঞতা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডোজের সাবেক সদস্যদের প্রতিষ্ঠিত বা তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ থাকা কোম্পানিগুলো অন্তত ৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান মাত্র কয়েক মাস আগে যাত্রা শুরু করলেও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ পেয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নও পৌঁছেছে শত কোটি ডলারের ঘরে।
রিভলভিং ডোর প্রজেক্টের নির্বাহী পরিচালক জেফ হাউসারের মতে, সাবেক ডোজে সদস্যদের কাছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে—সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ। তাঁর বক্তব্য, সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে সীমিত সময়ের অভিজ্ঞতাও তাঁদের বেসরকারি খাতে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ
সাবেক ডোজে সদস্যদের উদ্যোগগুলোর মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের ব্যবসা উল্লেখযোগ্য।
এর মধ্যে ক্যাথেড্রাল নামের একটি এআইভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৪০ কোটি ডলার মূল্যায়ন পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা গ্যাভিন ক্লিগার ও লুক ফ্যারিটর। কোম্পানিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং পেন্টাগনসহ সরকারি সংস্থার কাছে সেবা বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্লিগার ২০২৫ সালে পেন্টাগনে যোগ দেন এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মে মাসের মধ্যে তিনি ক্যাথেড্রালের জন্য বিনিয়োগ সংগ্রহ শুরু করেন।
আরেকটি প্রতিষ্ঠান স্পেশাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে পরিবর্তন আনার লক্ষ্য জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতারা বলেছেন, ডোজেতে কাজের অভিজ্ঞতাকে বেসরকারি খাতে কাজে লাগাতেই তাঁরা উদ্যোগটি নিয়েছেন।
সরকারি অনুমোদননির্ভর ব্যবসায়ও সাবেক কর্মকর্তারা
কিছু সাবেক ডোজে সদস্য এমন প্রতিষ্ঠানেও যুক্ত হয়েছেন, যাদের ব্যবসা সরকারি অনুমোদন বা চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। সাবেক ডোজে সদস্য এলি মিশোরি জুন মাসে স্পোর্টস প্রেডিকশন মার্কেট প্রতিষ্ঠান নভিগের নিয়ন্ত্রক ও আইনি বিষয়ক প্রধান হিসেবে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটি আগস্টে জানায়, পণ্য বা সেবার অনুমোদনসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি ফিউচার্স ট্রেডিং কমিশনের কাছ থেকে দ্রুত অনুমোদন পেয়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক ডোজে সদস্য টাইলার হাসেন একটি পরিচ্ছন্নতাসামগ্রী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হওয়ার পর সেটিকে ডেটা সেন্টার নির্মাণের অবকাঠামো ও অনুমোদনসংক্রান্ত ব্যবসায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। প্রতিষ্ঠানটি পরে জোন ফ্রন্টিয়ার নামে নতুন পরিচয় নিয়ে ১০ কোটি ডলারের পাবলিক অফারের ঘোষণা দেয়।
স্বার্থের সংঘাত ও নৈতিকতা নিয়ে উদ্বেগ
সরকারি দায়িত্ব পালনের পর বেসরকারি খাতে লাভজনক পদে যোগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ঘটনা নয়। তবে ডোজের অনেক সদস্য অল্প কয়েক মাসের জন্য বিশেষ সরকারি কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের সরকারি অভিজ্ঞতার তুলনায় দ্রুত বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জনের বিষয়টি আগের অনেক উদাহরণকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে সাবেক সরকারি নৈতিকতা কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সরকারি দপ্তরে কাজের সময় পাওয়া তথ্য, যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বেসরকারি ব্যবসায়িক সুবিধায় পরিণত হলে জনস্বার্থের সঙ্গে ব্যক্তিগত লাভের সংঘাত তৈরি হতে পারে। ডোজে-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারি চুক্তি বা অনুমোদনের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে পারে।
কিছু বিনিয়োগকারীও আশঙ্কা করছেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত বা নৈতিকতা-সংক্রান্ত প্রশ্ন বাড়তে পারে। সরকারি নৈতিকতা বিধি দীর্ঘদিনের কর্মীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি হওয়ায় স্বল্পমেয়াদি সরকারি দায়িত্বের পর এমন ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জনের পরিস্থিতি সামলাতে আইন ও বিধি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে হাউসার মনে করেন।












