ইউরোপে দক্ষ কর্মী পাঠানোর পথ বড় করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসেছে বাংলাদেশ। সোমবার ঢাকায় সফররত ইইউর স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসন বিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই পক্ষ অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচার ঠেকাতে একসঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপের শ্রমবাজারে দক্ষ বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগ বাড়ানোর কথাও উঠেছে।
বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সরকার নিয়মিত ও বৈধ অভিবাসনে অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি জানান, এরই মধ্যে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ বাংলাদেশ-ইইউ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপের আওতায় আরও সহযোগিতা চান। ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ ইইউর একটি উদ্যোগ। এর লক্ষ্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে মিলে প্রশিক্ষণ ও বৈধ অভিবাসনের পথ তৈরি করা। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, বস্ত্র, জাহাজ নির্মাণ, কৃষি ও আতিথেয়তা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরির অনুরোধ জানান। ইউরোপের মান অনুযায়ী দক্ষতা যাচাই, সনদ, ভাষা প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল নিয়োগ ব্যবস্থায়ও সহায়তা চাওয়া হয়। বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে সহযোগিতার কথাও তোলা হয়।
কমিশনার ব্রুনার বলেন, অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচার ঠেকানোর উদ্যোগে ইইউ সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তাঁর হিসাবে এখন প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি ইইউর বিভিন্ন দেশে বৈধভাবে বসবাস করছেন। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশকে একটি “নিরাপদ দেশ” হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশের পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে আশ্রয় আবেদনের বিষয়টিও তিনি যুক্ত করেন। ইউরোপে থাকা প্রবাসীদের কাছে এই মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরাপদ দেশের তালিকায় থাকলে সেই দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন সাধারণত আরও কঠোরভাবে যাচাই হয়।
সফরে ব্রুনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করেন। প্রতিটি বৈঠকেই বৈধ পথ বাড়ানো আর অবৈধ পথ বন্ধ করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে মানবপাচার রোধ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও কথা হয়। ইউরোপে দক্ষ কর্মী পাঠানো বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা। এতদিন প্রবাসী আয়ের বড় অংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার থেকে। সম্প্রতি রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভিন্ন বাজারে কর্মী পাঠাতে পারলে একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। তবে ইউরোপের বাজারে ঢুকতে ভাষা জানা আর স্বীকৃত সনদ থাকা বড় শর্ত।
কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট। অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়া জীবন ও সঞ্চয় দুটোকেই ঝুঁকিতে ফেলে। অন্যদিকে বৈধ পথ খোলার আলোচনা ধীরে হলেও এগোচ্ছে। হাতে-কলমে দক্ষতা, ভাষা জ্ঞান আর স্বীকৃত সনদ থাকলে ইউরোপে দক্ষ কর্মী হিসেবে যাওয়ার সুযোগ বাড়বে। বিদেশে যাওয়ার আগে সরকারি নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি। রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বৈধ কি না, তাও যাচাই করে নেওয়া দরকার। চাকরির প্রস্তাব পেলে তা সরকারি সূত্রে মিলিয়ে নেওয়াই নিরাপদ। ইউরোপের কোনো দেশে যেতে চাইলে সেখানকার ভাষা আগে থেকে শেখা শুরু করলে বাড়তি সুবিধা মেলে। এখন দেখার বিষয়, দুই পক্ষ এই আলোচনাকে কত দ্রুত বাস্তব নিয়োগে রূপ দিতে পারে।












