বিজ্ঞান ও সমাজের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সমাজের কল্যাণে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পথ তৈরি করে বিজ্ঞান। বিনিময়ে সমাজ ও সরকার গবেষণায় অর্থায়ন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেয়। কয়েক শতাব্দী ধরে এই পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতেই বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা এগিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিজ্ঞান ও সমাজের এই সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একদিকে সরকার গবেষণায় বিনিয়োগের পরিমাপযোগ্য ফলাফল দেখতে চাইছে, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও কমছে। এমন পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানকে আর শুধু সমাজের কল্যাণে পরিচালিত কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণার বিষয় নির্ধারণ থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ব্যবহার পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মৌলিক গবেষণা থেকে শুরু করে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন—বিজ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার হয়। এসব বিনিয়োগের সুফল কখন আসবে, তা সব সময় আগে থেকে বলা যায় না। অতীতে কৌতূহল থেকে পরিচালিত অনেক গবেষণা এমন সব আবিষ্কারের পথ খুলে দিয়েছে, যা পরে মানুষের জীবন ও সমাজকে বদলে দিয়েছে। তাই কোনো গবেষণার তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক লাভ দেখা যাচ্ছে না বলে সেটিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা ঠিক নয়।
গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণে সরকারের ভূমিকা
বিজ্ঞানের বড় পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সরকার গবেষণায় অর্থ বরাদ্দের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে। সীমিত সরকারি সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের জবাবদিহি থাকাও স্বাভাবিক। তবে গবেষণার অর্থায়ন যখন স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য কিংবা তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক লাভের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন গুরুত্বপূর্ণ অনেক গবেষণা অবহেলার শিকার হতে পারে।
বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান, মানবিক বিদ্যা, জলবায়ু গবেষণা এবং মৌলিক বিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রগুলোতে গবেষণার সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পরিমাপ করা কঠিন। এসব গবেষণার ফলাফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। কিন্তু তাই বলে সেগুলোর সামাজিক গুরুত্ব কম নয়। অনেক সময় আজকের মৌলিক গবেষণাই ভবিষ্যতের বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করে।
বিজ্ঞান অবশ্যই মানুষের প্রয়োজন পূরণে ভূমিকা রাখবে। তবে সে জন্য গবেষণার স্বাধীনতা খর্ব করা যাবে না। গবেষকদের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার, নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের এবং তাৎক্ষণিকভাবে লাভজনক নয়—এমন বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকতে হবে। সরকার গবেষণার বিস্তৃত লক্ষ্য ও প্রত্যাশা নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় গবেষণার প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়।
একই সঙ্গে বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বরং গবেষকদের উচিত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নাগরিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বিজ্ঞান সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ ও সমর্থনও বাড়তে পারে।
স্থানীয় জ্ঞানও বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ
গবেষণায় নাগরিকদের অংশগ্রহণের অর্থ বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া নয়। রোগ কীভাবে ছড়ায়, তা একজন মহামারিবিদ সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক ভালো বুঝতে পারেন। একইভাবে বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন ও জলবায়ুর জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে একজন জলবায়ুবিজ্ঞানীর বিশেষ জ্ঞান রয়েছে।
তবে জ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। একজন কৃষক মাটির পরিবর্তন, ফসলের সহনশীলতা কিংবা আবহাওয়ার সঙ্গে কৃষিকাজের সম্পর্ক সম্পর্কে এমন বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন, যা পরীক্ষাগারে কাজ করা কোনো গবেষকের কাছে সহজলভ্য নয়। বনাঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর কাছে থাকতে পারে ঔষধি উদ্ভিদ, বন ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান।
বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও স্থানীয় অভিজ্ঞতা এক নয়, কিন্তু সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে তারা পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে। এই দুই ধরনের জ্ঞানকে একত্র করাই গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের মতো জীববৈচিত্র্যপূর্ণ ও সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় দেশে এ ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন আরও বেশি। দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চল এবং বিচিত্র বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি দিক এককভাবে পেশাদার গবেষকদের পক্ষে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। বিভিন্ন এলাকার নাগরিকেরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এমন তথ্য দিতে পারেন, যা প্রচলিত গবেষণাপদ্ধতিতে সংগ্রহ করা সহজ নয়।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো স্কুলশিক্ষার্থী প্রজাপতি বা পাখির চলাচল পর্যবেক্ষণ করে তথ্য নথিবদ্ধ করতে পারে। আবার কোনো পাখিপ্রেমী পরিযায়ী পাখির আগমন ও গতিবিধির তথ্য সংগ্রহ করে জীববৈচিত্র্য গবেষণায় অবদান রাখতে পারেন। এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক গবেষণাকে নাগরিক বিজ্ঞান বলা হয়। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলের সুবিধাভোগী থাকেন না, বরং জ্ঞান তৈরির প্রক্রিয়াতেও অংশ নেন।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে
ভারতে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রকৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পবিত্র বনভূমি সংরক্ষণ, সামষ্টিক বন ব্যবস্থাপনা, উদ্ভিদের বংশগত বৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ঐতিহ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা তার উদাহরণ। এসব চর্চা দেখায়, স্থানীয় মানুষেরা নিজেদের পরিবেশ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং বহু ক্ষেত্রে তা সংরক্ষণেও কার্যকর পদ্ধতি গড়ে তুলেছেন।
গবেষণায় পর্যবেক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। স্থানীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে একই পরিবেশে বসবাস করার কারণে ঋতু পরিবর্তন, উদ্ভিদ ও প্রাণীর আচরণ কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের পরিবর্তন সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দিতে পারে।
তাই গবেষকদের শুধু কোনো গ্রামে গিয়ে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংগ্রহ করে তা নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। কোন বিষয়ে গবেষণা হবে, কোন প্রজাতি শনাক্ত করা দরকার, সংগৃহীত তথ্যের অর্থ কী এবং সেই জ্ঞান কীভাবে নথিবদ্ধ ও ব্যবহার করা হবে—এসব সিদ্ধান্তে স্থানীয় জ্ঞানধারীদের অংশগ্রহণ থাকা উচিত।
এতে গবেষণার মান বাড়তে পারে, পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জ্ঞান ও অধিকারকে সম্মান করার সুযোগ তৈরি হয়।
নাগরিকদের অংশগ্রহণে বাড়তে পারে আস্থা
গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণে নাগরিকদের যুক্ত করার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘হরাইজন ২০২০’ কর্মসূচি। এ উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণের আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে পরিচালিত আলোচনায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও নাগরিকেরা শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা, শিক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতির মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
ভারতেও এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির সংকট, শহরের বায়ুদূষণ, কৃষির সহনশীলতা, উপকূলীয় ভাঙন, জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, পুষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো বিষয়ে বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাঠামোবদ্ধ আলোচনা আয়োজন করা যেতে পারে। এতে গবেষণার বিষয়গুলো মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত হবে।
নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আরেকটি বড় কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট। অনেক সময় বিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয়কে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি অভিজাত গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আবেগনির্ভর বক্তব্য অনেক সময় যাচাই করা বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি বৈজ্ঞানিক তথ্য জানানো অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সমস্যার সমাধান শুধু তথ্য প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ যদি মনে করে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা তৈরি করা কঠিন হতে পারে।
মানুষ সাধারণত এমন কোনো প্রক্রিয়াকে বেশি সমর্থন করে, যেখানে তারা মনে করে তাদের কথা শোনা হয়েছে। সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত না হলেও যুক্তি স্বচ্ছ হলে এবং তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হলে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করার সম্ভাবনা বাড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তন, টিকাদান, জিনগত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জৈবপ্রযুক্তির মতো বিতর্কিত বিষয়ে এ ধরনের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান প্রত্যেক নাগরিককে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত করানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবে প্রশ্ন তোলা, আলোচনায় অংশ নেওয়া, যুক্তি যাচাই করা এবং সিদ্ধান্তের ভিত্তি বোঝার ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে।
গবেষকদেরও শিখতে হবে মানুষের কথা শুনতে
বর্তমানে অনেক গবেষককে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা কিংবা গবেষণায় তাদের কার্যকরভাবে যুক্ত করার বিষয়ে সব সময় যথেষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
গবেষকদের প্রশিক্ষণে জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণাপত্র প্রকাশ ও উদ্ধৃতির সংখ্যার বাইরেও সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং নাগরিকদের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া দরকার।
গবেষণায় অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোও এমন উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে পারে, যেখানে গবেষকেরা ব্যাখ্যা করবেন—কীভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ, তথ্য সংগ্রহ, ফলাফল ব্যাখ্যা এবং গবেষণার ফলাফল ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে অংশ নেবে।
তবে প্রতিটি গবেষণায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজন নেই। পরীক্ষাগারের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ জরুরি নয়। উদ্দেশ্য হলো, যেসব গবেষণার সামাজিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য, সেগুলোতে নাগরিকদের সম্পৃক্ততাকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা। কোনো ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ উপযুক্ত না হলে তার কারণও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
নতুন প্রযুক্তি দ্রুত চালু করা হবে, নাকি সতর্কতার সঙ্গে এগোনো হবে—এ সিদ্ধান্তে জনস্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কতটা ছাড় দেওয়া গ্রহণযোগ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল ও ঝুঁকি কীভাবে ভাগ হবে কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ব্যয় কে কতটা বহন করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এখানে সামাজিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থের বিষয়ও জড়িত। তাই এসব সিদ্ধান্তে নাগরিকদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞান ও সমাজের সম্পর্ক নতুন করে গড়তে হবে
এই পরিবর্তনের জন্য বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও নম্রতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। গবেষকদের শুধু নিজেদের সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করলেই চলবে না; তাঁদের মানুষের কথা শুনতে হবে, অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে এবং গবেষণার অনিশ্চয়তা স্বীকার করতে হবে। নিজেদের সুপারিশের পেছনে কী ধরনের মূল্যবোধ কাজ করছে, সেটিও বুঝতে হবে।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষেরও উপলব্ধি করা জরুরি যে, জটিল সামাজিক সমস্যার সব উত্তর বিজ্ঞান সব সময় সহজভাবে দিতে পারে না। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কোনো সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ফলাফল বুঝতে সাহায্য করে, কিন্তু সেই ফলাফলের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কিংবা ন্যায়সংগত বণ্টন নির্ধারণে আলোচনা ও সম্মিলিত বিবেচনার প্রয়োজন হয়।
বিজ্ঞানের অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে সরকারকে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও অর্থায়ন দিতে হবে, কিন্তু গবেষকদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি বিজ্ঞানীদেরও সমাজের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে নাগরিকদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিজ্ঞানকে মানুষের জন্য আরও কার্যকর করে তুলতে হলে নাগরিকদের শুধু গবেষণার ফল ভোগকারী বা করদাতা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁদের গবেষণার অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিজ্ঞান ও সমাজের মধ্যে আস্থা, সহযোগিতা এবং যৌথ দায়িত্ববোধ গড়ে উঠলেই গবেষণার সুফল আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।












