মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উঁচুতে রাখতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কৌশল বদলাচ্ছে ইরান। তেহরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হামলার ধরন ও গতি বাড়ানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির বাইরেও অভিযান বিস্তারের পরিকল্পনা করছে দেশটি।
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে চলাচল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে প্রণালিটি ঘিরে উত্তেজনা বেড়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
ইরানের হুমকি ও হামলায় জলপথটিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও।
হামলার ধরন ও গতি বদলাচ্ছে তেহরান
ইরানের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রায় ১০ দিন আগে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছে বলে বিবেচিত জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে নতুন ধরনের আক্রমণ শুরু হয়েছে। এর ফলে হামলার সংখ্যা বেড়েছে। তবে নতুন কৌশলের বিস্তারিত তাঁরা প্রকাশ করেননি।
এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমানোর প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করাই এই কৌশলের অন্যতম উদ্দেশ্য। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পর্যায়ে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে এবং দেশটির শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তেলের দাম কমানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। তাঁর ভাষায়, এটি দাবার চালের মতো একটি প্রতিযোগিতা।
লক্ষ্য শনাক্তে ছোট নৌকা ব্যবহার
এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরানের কৌশলে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের রাডার সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস হওয়ার পর দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করতে ছোট নৌকায় নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক ব্যবহার করছে।
ওই কর্মকর্তার দাবি, গত সপ্তাহে একটি ঐতিহ্যবাহী পালতোলা নৌকা থেকে ইরানি পর্যবেক্ষকেরা মার্কিন বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুর তথ্য বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে পাঠাচ্ছিলেন। মার্কিন বাহিনী নৌযানটির আরোহীদের সেটি ত্যাগ করতে বলে এবং পরে নৌযানটি ধ্বংস করে। এতে কেউ হতাহত হননি বলে তিনি জানান।
তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিজেদের অবশিষ্ট দ্রুতগতির নৌযান ঝুঁকিতে ফেলতে অনিচ্ছুক ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বৃদ্ধিও পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না।
হরমুজের বাইরেও হামলার আশঙ্কা
ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির বাইরের জলসীমায়ও অভিযান বিস্তৃত করা হবে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণেও কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলসংলগ্ন এলাকায় জাহাজে হামলার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ এলাকায় ট্যাংকারসহ বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে অন্তত পাঁচটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ড্রোন হামলার ঘটনাও রয়েছে। যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনী-সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর সাম্প্রতিক হামলার হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থার তথ্যেও হামলার গতি বৃদ্ধির ইঙ্গিত রয়েছে। এক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের মতে, হামলার এই বৃদ্ধি পরিকল্পিত বলেই মনে হচ্ছে।
মার্কিন নির্বাচনে যুদ্ধের প্রভাব
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং এতে মাসে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের ব্যয় মার্কিন নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছেন। তবে নির্বাচনের আগে নতুন করে হামলা চালাবেন না বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ জোরদার এবং নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
ইরানের দুই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তাদের বিধিনিষেধ অমান্যকারী কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলতে দেওয়া হবে না—এমন পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে তেহরান। তাঁদের একজন বলেছেন, সম্পূর্ণ অবরোধের পরিস্থিতি শিগগিরই তৈরি হতে পারে।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্রের সর্বশেষ প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ঝুঁকিকে ‘গুরুতর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হামলা, নজরদারি এবং ড্রোনের উপস্থিতি অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠছে।












