ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পানির উৎসে ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ হিসেবে পরিচিত পার-অ্যান্ড পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল পদার্থের (পিএফএএস) উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। শিল্পকারখানার বিভিন্ন পণ্য, বস্ত্র ও সুরক্ষামূলক আবরণ তৈরিতে ব্যবহৃত এসব কৃত্রিম রাসায়নিক পরিবেশে সহজে ভাঙে না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পানি ও পরিবেশে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্বেগের বিষয়, ভারতে এখনো পানীয় জল থেকে এসব রাসায়নিক অপসারণে কার্যকর প্রচলিত শোধনব্যবস্থার বাণিজ্যিক সমাধান সহজলভ্য নয়। একই সঙ্গে দেশজুড়ে দূষণের প্রকৃত মাত্রাও স্পষ্ট নয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গবেষণায় দেশটির একাধিক অঞ্চলের পানিতে পিএফএএস পাওয়া গেলেও গবেষণাপদ্ধতি ও পরীক্ষার মানদণ্ডে পার্থক্যের কারণে জাতীয় পর্যায়ে দূষণের পূর্ণ চিত্র নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
চেন্নাইয়ের পানিশোধনাগার নিয়ে উদ্বেগ
২০২৫ সালে ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গে পিএফএএস দূষণ পর্যবেক্ষণ এবং এ-সংক্রান্ত বিধিব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। গবেষকদের মতে, দূষণ নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে, কিন্তু দেশজুড়ে এর বিস্তার নির্ভরযোগ্যভাবে নিরূপণের জন্য আরও সমন্বিত তথ্য প্রয়োজন।
চেন্নাইয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ২০২২ ও ২০২৩ সালে সংগ্রহ করা ১৪টি পানির নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। নমুনাগুলোর মধ্যে ছিল ভূগর্ভস্থ পানি, ভূপৃষ্ঠের পানি এবং একটি পানিশোধনাগারের বিভিন্ন পর্যায়ের পানি। গবেষকেরা দেখতে পান, আবর্জনার ভাগাড়ের আশপাশের আবাসিক এলাকার কূপের পানিতে পিএফএএসের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পানিশোধনাগারে শোধনের পর আট ধরনের লক্ষ্যনির্ধারিত পিএফএএসের ঘনত্ব কাঁচা পানির তুলনায় ৫ থেকে ১০৩ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। গবেষকদের ধারণা, শোধনপ্রক্রিয়ার সময় আগে শনাক্ত না হওয়া কিছু রাসায়নিক পূর্বসূরি আরও স্থিতিশীল পিএফএএসে রূপান্তরিত হয়ে থাকতে পারে। তবে ওই পূর্বসূরিগুলোর পরিমাণ গবেষণায় নির্ধারণ করা হয়নি।
গবেষকেরা বলছেন, নির্দিষ্ট কয়েকটি রাসায়নিকের তালিকা ধরে পরীক্ষা চালালে পানিতে থাকা অন্য ধরনের পিএফএএস শনাক্ত না-ও হতে পারে। তাই পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো জরুরি।
বিশাখাপত্তনমে মিলেছে ৩৮ ধরনের রাসায়নিক
২০২৬ সালের ১৬ জুলাই প্রকাশিত আরেক গবেষণায় বিশাখাপত্তনমের আশপাশের সমুদ্রের পানি ও পয়োনিষ্কাশনের নমুনায় ৭৭ ধরনের পিএফএএস পরীক্ষা করা হয়। এতে ৩৮ ধরনের রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। পয়োনিষ্কাশনের নমুনায় এসব রাসায়নিকের ঘনত্বের মাত্রা কম থেকে অনেক বেশি পর্যন্ত ছিল।
গবেষকদের মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে পিএফএএসের মধ্যম ঘনত্বের প্রায় ৪১ শতাংশের জন্য পয়োনিষ্কাশন দায়ী হতে পারে। তবে পৌর বর্জ্যপানি ও শিল্পকারখানার বর্জ্য থেকে আসা দূষণ আলাদা করে শনাক্ত করতে নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ প্রয়োজন।
উচ্চ-রেজল্যুশন ভর-বর্ণালিবীক্ষণসহ উন্নত পরীক্ষাপদ্ধতি দিয়ে নির্ধারিত তালিকার বাইরের রাসায়নিকও শনাক্ত করা সম্ভব। তবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার সময় বাইরের উৎস থেকে পিএফএএস মিশে যাওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
পানিতে পিএফএএস পাওয়া গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। ঝুঁকি নির্ভর করে রাসায়নিকের ধরন, সংস্পর্শের মাত্রা, সময়কাল ও শরীরে প্রবেশের পথের ওপর।
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা ২০২৫ সালে পারফ্লুরোঅকটানোয়িক অ্যাসিডকে (পিএফওএ) মানুষের জন্য ক্যানসারসৃষ্টিকারী এবং পারফ্লুরোঅকটেন সালফোনিক অ্যাসিডকে (পিএফওএস) সম্ভাব্য ক্যানসারসৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২৪ ধরনের পিএফএএসের মিশ্রণ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, রাসায়নিকের মিশ্রণ জেব্রাফিশের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করেছে, বংশধরদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করেছে, তাদের রক্তে জমা হয়েছে এবং হৃদ্স্পন্দন কমিয়েছে। তবে এই ফলাফল থেকে সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে একই মাত্রার প্রভাব নিশ্চিত করা যায় না।
ভারতে এখনো নির্দিষ্ট পানির মানদণ্ড নেই
ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, পিএফএএস উৎপাদন নিষিদ্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিধি নেই। দেশটির বর্তমান পানীয় জলের মানদণ্ড আইএস ১০৫০০:২০১২-তেও এসব রাসায়নিকের জন্য আলাদা সীমা নির্ধারিত নেই।
তবে পানীয় জলের মানদণ্ড সংশোধনের কাজ চলছে। ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের একটি বিশেষ কর্মদল পিএফএএস ও অন্যান্য নতুন দূষক নিয়ে কাজ করছে। সংশোধিত মানদণ্ডে কোন কোন রাসায়নিক অন্তর্ভুক্ত হবে এবং তাদের গ্রহণযোগ্য সীমা কত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে কোন ধরনের পিএফএএস উৎপাদিত, আমদানি ও ব্যবহৃত হচ্ছে, তা আগে নির্ধারণ করা দরকার। পাশাপাশি দেশজুড়ে দূষণের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ, বিষক্রিয়াসংক্রান্ত গবেষণা, সমন্বিত পরীক্ষাপদ্ধতি এবং কার্যকর আইনি সীমা প্রণয়ন জরুরি। কিছু বহুল গবেষিত পিএফএএসের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সতর্কতামূলক সীমা নির্ধারণের পক্ষেও মত দিয়েছেন গবেষকেরা।












