যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যে প্রস্তাবিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস কেনার পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে তাইওয়ান। এর আওতায় সর্বোচ্চ ৪৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং প্রকল্প চালু হলে বছরে ৬০ লাখ মেট্রিক টন গ্যাস কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩২ সালের মধ্যে প্রকল্পটি চালু হতে পারে।
এই উদ্যোগ তাইওয়ানের জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও গভীর করতে পারে। একই সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় নতুন পথ খুঁজছে তাইপে।
ট্রাম্পের ঘোষণা, তাইওয়ানের বিনিয়োগ পরিকল্পনা
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, আলাস্কায় এক সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, আগামী ২০ বছর ধরে পাইপলাইন থেকে সরবরাহ করা গ্যাসের ৩০ শতাংশ কিনতে সম্মত হয়েছে তাইওয়ান। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেননি।
তাইওয়ানের অর্থনীতি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে আলাস্কার গ্যাস প্রকল্পে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে। মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এতে সর্বোচ্চ ৪৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হতে পারে। প্রকল্পটি চালু হলে বছরে ৬০ লাখ মেট্রিক টন গ্যাস কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রকল্পে তাইওয়ানের মালিকানার অংশ, বিনিয়োগের শর্ত এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ২০২৫ সালে তাইওয়ানের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সিপিসি আলাস্কা গ্যাসলাইন ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উন্নয়ন ও ক্রয় নিয়ে একটি আগ্রহপত্রে সই করেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
তাইওয়ানের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানির চাহিদা ব্যাপক। বর্তমানে দেশটি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। এ বছরের ইরান যুদ্ধ এবং এর প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে সৃষ্ট বিঘ্ন এই নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে এনেছে।
এর পাশাপাশি তাইওয়ান প্রণালিসহ আশপাশের সমুদ্রাঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে চীন তাইওয়ানের ওপর অবরোধ আরোপের চেষ্টা করলে দ্বীপটির জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
আলাস্কা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথে সরাসরি গ্যাস পরিবহন করা গেলে হরমুজ প্রণালি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। ফলে সরবরাহের বিকল্প পথ তৈরি করে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে পারবে তাইওয়ান।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস আমদানি বাড়ানোর লক্ষ্য
তাইওয়ানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি, সোসাইটি অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজির জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সাইয়িং লু জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুপাত বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশ। ২০২৯ সালের মধ্যে এই হার ২৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায় তাইওয়ান।
আলাস্কা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস আমদানির অনুপাত ৩০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এটি হবে তাইওয়ানের এ পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় একক গ্যাস ক্রয়চুক্তি। শুধু আমদানির পরিমাণ বাড়ানো নয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস পরিবহনের পথেও বৈচিত্র্য আনতে পারবে দেশটি।
তবে প্রকল্পটির সামনে বড় বাধা রয়েছে। পাইপলাইন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। বাণিজ্যিক শর্ত নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানও প্রকল্পটির অবকাঠামোতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে, যদিও তাদের অংশগ্রহণ এখনো নিশ্চিত নয়।
বেইজিংয়ের আপত্তি, তাইওয়ান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পরীক্ষা
তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সহযোগিতার পরিকল্পনায় আপত্তি জানিয়েছে চীন। বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, তাইওয়ানের বৈদেশিক সম্পর্ক ‘এক চীন নীতি’র ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি অর্থনীতি ও বাণিজ্যের আড়ালে ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ অর্জনের চেষ্টা করছে।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। তবে তাইপের নির্বাচিত সরকার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
এদিকে তাইওয়ানের কাছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন অস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সহযোগিতার নতুন উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।
তাইওয়ানের অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, আলাস্কা প্রকল্প সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করবে, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়াবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করবে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক শর্তের ওপর।












