কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদার মধ্যে মেমোরি চিপ তৈরিতে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দাবি করেছে চীনের চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিস (সিএক্সএমটি)। নতুন প্রজন্মের মেমোরি চিপের নকশায় এই অগ্রগতি বিশ্ববাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাবে সোমবার ও মঙ্গলবার মেমোরি চিপ খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ইলেকট্রনিকস, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রনের শেয়ারের দামে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে একই আকারের চিপে আরও বেশি মেমোরি সেল বসানো সম্ভব হবে। এতে চিপের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন দক্ষতা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বড় হুমকি হয়ে উঠবে কি না, তা নির্ভর করছে প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বাস্তব প্রয়োগের ওপর।
একই চিপে বেশি তথ্য সংরক্ষণের প্রযুক্তি
সিএক্সএমটির প্রেসিডেন্ট কাও কানইউ সম্প্রতি একটি শিল্প সম্মেলনে জানান, প্রতিষ্ঠানটি মেমোরি চিপের পরবর্তী প্রজন্মের নকশায় ‘৪এফ-স্কয়ার’ নামের একটি স্থাপত্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রচলিত ‘৬এফ-স্কয়ার’ কাঠামোর তুলনায় এই প্রযুক্তিতে একই আয়তনের চিপে আরও বেশি মেমোরি সেল স্থাপন করা সম্ভব হতে পারে।
কম্পিউটার, স্মার্টফোন, গাড়ি এবং তথ্যকেন্দ্রের সার্ভারে ব্যবহৃত ডায়নামিক র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি বা ডিআরএএম তথ্য সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। চিপের প্রতিটি মেমোরি সেল কতটুকু জায়গা দখল করে, তার ভিত্তিতেই এই স্থাপত্যের আকার নির্ধারিত হয়। সেলের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা কমানো গেলে একই চিপে বেশি তথ্য সংরক্ষণ করা যায়।
শিল্প খাতে ৮এফ-স্কয়ার থেকে ৬এফ-স্কয়ার কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছিল ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ফলে ৪এফ-স্কয়ার প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন মেমোরি চিপের নকশায় আরেকটি বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এগোচ্ছে চীন
সিএক্সএমটির এই অগ্রগতি এমন সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের কারণে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত চিপ উৎপাদনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সংগ্রহে বাধার মুখে রয়েছে।
তবু চীনা প্রতিষ্ঠানটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। চলতি বছরের মে মাসে হুয়াওয়ে ট্রানজিস্টরের আকার প্রচলিত পদ্ধতিতে ছোট করার বাইরেও চিপের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর নতুন নীতির কথা জানিয়েছিল। ‘টাউ স্কেলিং ল’ নামে পরিচিত সেই ধারণাও চীনের প্রযুক্তি খাতে বিকল্প উদ্ভাবনী পথ খোঁজার উদাহরণ।
জুলাই মাসে সাংহাইয়ের স্টার বাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে প্রবেশ করে সিএক্সএমটি। এতে প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে চীনের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিতে পরিণত হয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের শেষে বৈশ্বিক ডিআরএএম বাজারে সিএক্সএমটির অংশীদারত্ব বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে স্যামসাংয়ের অংশ ছিল ৩৮ শতাংশ, এসকে হাইনিক্সের ২৫ শতাংশ এবং মাইক্রনের ২৪ শতাংশ।
উৎপাদন বাড়ানোই বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সিএক্সএমটির প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে এখনই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য বড় বিপদ হিসেবে দেখার কারণ নেই। কারণ, মেমোরি চিপের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব।
নোমুরার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সিডব্লিউ চুংয়ের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর তুলনামূলক সহজ কিছু বিকল্প রয়েছে। তবে সিএক্সএমটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে একই ধরনের সুযোগ সীমিতভাবে পাচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি নতুন কাঠামো গ্রহণের দিকে দ্রুত এগোতে পারে।
তবে নতুন প্রযুক্তিকে ব্যাপক উৎপাদনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাপ নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। চিপের ভেতরে মেমোরি সেল যত ঘনভাবে বসানো হয়, তাপ উৎপাদন ও তা অপসারণের সমস্যা তত জটিল হতে পারে। ৪এফ-স্কয়ার এবং ত্রিমাত্রিক ডিআরএএম প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এই সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ কোরিয়ার এক চিপ নির্বাহীর মতে, সিএক্সএমটি এই প্রযুক্তিতে স্থিতিশীলভাবে ব্যাপক উৎপাদন করতে পারে কি না এবং তাপ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা সমাধান করতে পারে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এআইয়ের চাহিদায় মেমোরি চিপের সংকট
সিএক্সএমটি শুধু নতুন চিপের নকশায় নয়, উৎপাদন সম্প্রসারণেও জোর দিচ্ছে। সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা পঞ্চম প্রজন্মের ডিআরএএম প্রযুক্তির ব্যাপক উৎপাদন শুরু করেছে। একই প্রযুক্তির ভিত্তিতে উচ্চ ধারণক্ষমতার এলপিডিডিআর৫এক্স চিপও উন্মোচন করা হয়েছে, যা মূলত স্মার্টফোন ও ল্যাপটপে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
এ বছরের শেষ নাগাদ তথ্যকেন্দ্র ও এআই সার্ভারের জন্য ডিডিআর৫ আরডিআইএমএম নামের উচ্চক্ষমতার সার্ভার মেমোরি মডিউল বাজারে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
এদিকে এআই প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের চাহিদা বেড়েছে। এর ফলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং দামও দ্রুত বাড়ছে। তাইওয়ানের ডিআরএএম নির্মাতা নানিয়া টেকনোলজির প্রেসিডেন্ট লি পেই-ইং জানিয়েছেন, বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান এখনো অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠানটি চলতি প্রান্তিকে তাদের রেকর্ড মোট মুনাফার হার আরও বাড়বে বলে আশা করছে।
এই পরিস্থিতিতে সিএক্সএমটির মতো চীনা প্রতিষ্ঠানের উত্থান বৈশ্বিক মেমোরি চিপ বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়াতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কে এগিয়ে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে নয়; উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, খরচ নিয়ন্ত্রণ, তাপ ব্যবস্থাপনা এবং এআই খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের সক্ষমতার ওপরও।












