কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং তথ্যকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উন্নত চিপ তৈরির যন্ত্রের চাহিদা অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। এই চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাণযন্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এএসএমএল। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত গ্রাহকদের চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা তাদের থাকবে না। এমনকি কিছু গ্রাহক ২০২৯ ও ২০৩০ সালের জন্যও যন্ত্র সরবরাহের সক্ষমতা আগাম নিশ্চিত করতে চাইছেন।
১৪ অক্টোবর প্রকাশিত ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল ও ব্যবসায়িক পূর্বাভাসে প্রতিষ্ঠানটি এ তথ্য জানিয়েছে। এআই প্রযুক্তির প্রসার বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ালেও চিপ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের সীমিত সরবরাহ নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
চাহিদার চাপে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ
এএসএমএলের যন্ত্র ব্যবহার করে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি, স্যামসাং, ইন্টেল, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন। এসব প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তি, উন্নত কম্পিউটিং এবং তথ্যকেন্দ্রের চাহিদা পূরণে চিপ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য চিপ তৈরি করে টিএসএমসি। ফলে এআই প্রযুক্তির প্রসার শুধু চিপ নির্মাতাদের ব্যবসাই বাড়াচ্ছে না, বরং চিপ তৈরির যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।
এএসএমএলের প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টোফ ফুকেট জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের জন্য বিপুলসংখ্যক যন্ত্রের ক্রয়াদেশ আসছে। পাশাপাশি ২০২৯ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের জন্যও আগাম ক্রয়াদেশ দেওয়ার বিষয়ে গ্রাহকদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
চাহিদা সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ শতাংশ এবং ২০২৮ সালে আরও ৩০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল। তবে এই সম্প্রসারণও সম্ভাব্য চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট হবে না বলে জানিয়েছেন ফুকেট।
বিক্রির পূর্বাভাস বাড়াল এএসএমএল
চাহিদা বৃদ্ধির মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকের বিক্রির পূর্বাভাসও বাড়িয়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এএসএমএলের বিক্রি ১৪ দশমিক ২ বিলিয়ন থেকে ১৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোর মধ্যে থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে এই পূর্বাভাস বেশি।
এতে ২০২৬ সালের পুরো বছরের বিক্রির পূর্বাভাস বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ইউরোতে। প্রতিষ্ঠানটি শেষ প্রান্তিকে প্রায় ৫৭ শতাংশ মোট মুনাফার হার অর্জনের প্রত্যাশা করছে।
তৃতীয় প্রান্তিকে এএসএমএলের নিট মুনাফা হয়েছে ৪ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ইউরো। এ সময়ে বিক্রি হয়েছে ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো, যা বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের তুলনায় ভালো ফলাফল।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও এই ফলাফল ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ১৪ অক্টোবর আমস্টারডামের প্রাথমিক লেনদেনে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরে শেয়ারটির দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পুরোনো যন্ত্র আধুনিক করেই বাড়বে উৎপাদন
নেদারল্যান্ডসের আইন্দহোভেনে গত মাসে বড় পরিসরে উৎপাদন সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছে এএসএমএল। তবে এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায় ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা। তার আগেই বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে।
এ জন্য পুরোনো যন্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আরও বেশি উৎপাদন করতে পারে এমন নতুন সংস্করণের যন্ত্র বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে এএসএমএল। প্রতিষ্ঠানটির অর্থবিষয়ক প্রধান রজার ডাসেনের মতে, এসব পদক্ষেপের ফলে গ্রাহকদের উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
২০২৭ সাল থেকে যন্ত্রের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর পূর্ণ প্রভাব ২০২৮ সাল থেকে দেখা যেতে পারে।
তবে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি একরকম নয়। একদিকে পর্যাপ্ত যন্ত্র সরবরাহ করতে না পারলে গ্রাহকদের উৎপাদন সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ালে চাহিদা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য সময়েও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।
এএসএমএলের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—এআই শিল্পের দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। প্রতিষ্ঠানটি এই চ্যালেঞ্জ কতটা সামাল দিতে পারবে, তার ওপর আগামী কয়েক বছরে উন্নত চিপ উৎপাদনের সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।












