সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে শিশুদের এতিমখানায় রাখার ঘটনায় নিজেদের ভূমিকা তদন্তে তৈরি প্রতিবেদন প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকারবিষয়ক দাতব্য সংস্থা এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজেস ইন্টারন্যাশনাল। একই সঙ্গে, সিরীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও এখন পর্যন্ত অর্থ দেয়নি সংস্থাটি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিবিসি ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের যৌথ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাবেক সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনী কারাবন্দি মা-বাবার কাছ থেকে শত শত শিশুকে নিয়ে যায়। পরে তাদের পরিচয় ও অবস্থান গোপন রাখতে এসওএসসহ বিভিন্ন এতিমখানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে শিশুদের ব্যবহার
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বিবিসির ‘সিরিয়াস স্টোলেন চিলড্রেন’ শীর্ষক অনুসন্ধানে উঠে আসে, সিরীয় সরকার শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। বন্দিবিনিময় নিয়ে দর-কষাকষিতেও শিশুদের ব্যবহার করা হয় বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।
এর শিকার হয়েছিল লায়লা ও লায়ান ঘবেইস নামের দুই বোন। ২০১৫ সালে তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে আট ও চার বছর। সে সময় তাদের মা ওমামার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এসওএসের একটি এতিমখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে মা-বাবার সঙ্গে পুনর্মিলন হতে তাদের তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়।
পুনরায় মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর লায়ান প্রথমে তাঁকে চিনতেই পারেনি। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের সহায়তায় শরণার্থী হিসেবে পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়। কিন্তু দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার মানসিক ক্ষত এখনো তাদের তাড়া করে বেড়ায়।
ওমামা বিবিসিকে বলেন, তাঁরা একসঙ্গে থাকুন কিংবা আলাদা—যা ঘটেছিল, তা নিয়ে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই এখনো ভাবেন। তাঁর ভাষায়, ওই ঘটনা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
১৪০ শিশুকে নেওয়ার কথা স্বীকার
২০২৪ সালে আসাদ সরকারের পতনের পর এসওএস স্বীকার করে, সিরীয় নিরাপত্তা বাহিনী ১৪০টিরও বেশি শিশুকে তাদের শিশু পরিচর্যাকেন্দ্রগুলোতে নিয়ে এসেছিল।
বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজেস ইন্টারন্যাশনাল এ ঘটনায় দায় নির্ধারণের জন্য নরওয়ের আইনজীবী প্রতিষ্ঠান উইয়ারশোলমকে দিয়ে তদন্ত করায়। জাতিসংঘ ও ইউরোপের বিভিন্ন সরকারের কাছ থেকেও সংস্থাটি অনুদান ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরবর্তী জানুয়ারিতে আইনজীবীরা বিবিসিকে জানান, প্রতিবেদনটির পরিচয়বিহীন একটি সংস্করণ প্রকাশ করা হতে পারে। কিন্তু মে মাসে সংস্থাটির বোর্ড চেয়ারম্যান ডোমেনিকো পারিসি কর্মীদের কাছে পাঠানো এক ইমেইলে জানান, তদন্তটি ‘আপসকৃত’ হয়েছে। ফলে প্রতিবেদনটি অভ্যন্তরীণভাবে প্রচার বা প্রকাশ—কোনোটিই করা হবে না।
বিবিসির হাতে আসা একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠকের রেকর্ডিংয়ে পারিসিকে অভিযোগ করতে শোনা যায়, সংস্থার কিছু কর্মী প্রতিবেদনটি নিজেদের মতো করে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন, যাতে প্রতিষ্ঠানটিকে অপরাধী হিসেবে দেখানো হয়।
বিবিসির দেখা প্রতিবেদনের একটি খসড়ায় বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে শিশুদের গ্রহণ করতে এসওএসকে বাধ্য করা হয়নি। সিরিয়ায় সংশ্লিষ্ট এসওএস কেন্দ্রগুলোর ওপর চূড়ান্ত দায়িত্ব ছিল ভিয়েনাভিত্তিক আন্তর্জাতিক কার্যালয়ের।
এসওএসের এক মুখপাত্র জানান, প্রতিবেদনটি নিয়ে বোর্ড স্বাধীন আইনি পরামর্শ নিয়েছে এবং পর্যালোচনা এখনো চলছে। সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণে বোর্ড প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ক্ষতিপূরণ তহবিল থাকলেও অর্থ পাননি পরিবারগুলো
প্রতিবেদন প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তে এসওএসের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হয়েছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটির যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের কয়েকটি শাখা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ছেড়ে স্বাধীন দাতব্য সংস্থা হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এসওএসের সবচেয়ে বড় আর্থিক সহযোগী জার্মান শাখা এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজেস ওয়ার্ল্ডওয়াইডের পরিচালকেরাও ফেডারেশন ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তবে সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়ক বোর্ড সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন পরিচালককে বরখাস্ত করে। কর্তব্যে গুরুতর অবহেলার অভিযোগে বরখাস্তের কথা জানিয়েছে জার্মান শাখা। তবে সংশ্লিষ্ট পরিচালকেরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং জার্মান আদালতে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করেছেন।
বরখাস্ত হওয়ার আগে ওই পরিচালকেরা সিরীয় ভুক্তভোগীদের জন্য স্বেচ্ছামূলক ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করেছিলেন। কিন্তু বিবিসির দেখা একাধিক ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সেই তহবিল থেকে কোনো অর্থ বিতরণ করা হয়নি।
এসওএসের মুখপাত্র বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সংস্থার সদিচ্ছা রয়েছে। তবে এ সহায়তা দেওয়া নির্ভর করছে আইনি ও বাস্তব পরিস্থিতির ওপর, যার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত সিরীয় পরিবারগুলো এখনো সংস্থাটির কাছ থেকে যোগাযোগ, ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে।
ওমামা ঘবেইস বলেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য এসওএসের কাছে ক্ষমা ও সহায়তা আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সংস্থাটির কেউ তাঁদের সঙ্গে কথা বলেনি, কোনো সহায়তাও দেয়নি।
পরিবারগুলো যখন ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায়, তখন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত এসওএসের জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।












