দেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর হিসাবে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে এই সংখ্যা ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। মে থেকে আগস্ট সময়ে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে আরও প্রায় ২৮ লাখ মানুষ এই তালিকায় যুক্ত হতে পারেন। খাদ্যপণ্যের দাম আর আয়ের ফারাক এই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই হিসাব এসেছে সমন্বিত খাদ্য নিরাপত্তা পর্যায় বিশ্লেষণ বা আইপিসির ভিত্তিতে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো মিলে এই বিশ্লেষণ করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বা বিবিএসের হিসাবে সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। আগস্টে তা ছিল ৮.২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭.২২ শতাংশ হয়েছে, আগস্টে যা ছিল ৭.০২ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশ। অথচ একই মাসে মজুরি বেড়েছে ৭.৯০ শতাংশ হারে। মানে দামের গতির সঙ্গে মজুরি তাল মেলাতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের পূর্বাভাস, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে উঠতে পারে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের নিচে থাকা মানে দাম কমেছে, এমন নয়। এর মানে দাম আগের চেয়ে একটু ধীরে বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলছেন, দীর্ঘ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খাবারের পরিমাণ ও মান দুটিই কমাচ্ছে। কেউ চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ কাটছাঁট করছে, কেউ ঋণ নিচ্ছে। তাঁর মতে, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের চিহ্নিত করে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো দরকার। বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কারসাজি ঠেকাতে নিয়মিত তদারকির কথাও বলেছেন তিনি। বাজারে নজরদারি জোরদার না হলে সরবরাহ ঠিক থাকলেও দামের চাপ কমবে না।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী সরকারি গুদামে এখন প্রায় ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত আছে। মজুতের এই পরিমাণ মোটামুটি স্বস্তিদায়ক। তবে গুদামে খাদ্য থাকা আর মানুষের হাতে কেনার সামর্থ্য থাকা এক কথা নয়। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারে গিয়ে পড়ে। শহরের দিনমজুর, রিকশাচালক আর গ্রামের ভূমিহীন পরিবারগুলো এই চাপ সবচেয়ে বেশি টের পায়। চাল, আটা, ডিম ও ভোজ্যতেলের মতো প্রতিদিনের পণ্যে সামান্য দাম বাড়লেও ছোট আয়ের সংসারে বড় টান পড়ে। খোলাবাজারে কম দামে চাল ও আটা বিক্রির কর্মসূচি এ ধরনের পরিবারের জন্য বড় সহায়তা। তাই এসব কর্মসূচির পরিধি নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার।
শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে এই চাপের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। শুধু ভাত বা রুটিতে পেট ভরলেও প্রোটিন ও অণুপুষ্টির ঘাটতি থেকে যায়। এতে শিশুর বেড়ে ওঠা এবং বড়দের কাজের সক্ষমতা দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি কমাতে খোলাবাজারে বিক্রি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে ১ কোটি ৮১ লাখের এই পূর্বাভাস আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল, আজ উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি।












