দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। অক্টোবরের প্রথম ১৬ দিনেই ডেঙ্গুতে অন্তত ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮ হাজার ৮২০ জন রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, মাস শেষ হওয়ার আগেই অক্টোবর এ বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস হয়ে উঠতে পারে। ডেঙ্গুতে মৃত্যু এখন শহর আর গ্রাম দুই জায়গাতেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
মাসভিত্তিক হিসাবেই সংক্রমণের গতি স্পষ্ট। মে মাসে ডেঙ্গুতে মারা যান একজন। জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন আর আগস্টে ৪৩ জন মারা যান। সেপ্টেম্বরে মৃত্যু এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৮ জনে। ভর্তির সংখ্যাও একই পথে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। অক্টোবরের অর্ধেক না যেতেই সেই সংখ্যার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ছুঁয়ে ফেলেছে নতুন ভর্তি।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকির নেতৃত্বে একটি মৃত্যু পর্যালোচনা হয়েছে। সেখানে ১১৯ জন মৃত রোগীর তথ্য দেখা হয়। এদের এক তৃতীয়াংশের বেশি হাসপাতালে ভর্তির এক দিনের মধ্যেই মারা যান। সাড়ে ৬২ শতাংশের মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। অনেক রোগী অন্তত তিন দিন দেরিতে রোগ শনাক্ত করিয়েছেন। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ বলেছেন, বারবার সংক্রমণ আর দেরিতে চিকিৎসা ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বড় কারণ। দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হলে জটিলতা অনেক বেশি হয়। শিশু আর ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা কিডনির রোগীদের হালকা উপসর্গও অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
চিকিৎসকেরা বলছেন, জ্বর, শরীর ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা বা খাওয়ায় অরুচি দেখা দিলেই পরীক্ষা করানো দরকার। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক এইচ এম নাজমুল আহসান জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা সব জায়গায় সমানভাবে না মানায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু প্লাটিলেট কমে গেলেই রক্ত দেওয়া জরুরি নয়। রোগীর সামগ্রিক অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা তিন স্তরের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা চালু না থাকাকেও দায়ী করছেন। উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত শনাক্ত হলে বড় হাসপাতালে চাপ কমত। মে মাস থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত হিসাব যোগ করলে ছবিটা আরও ভয়াবহ দেখায়। এই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩৩১ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ২৩ হাজারের বেশি মানুষ। এর বড় অংশই সেপ্টেম্বর আর অক্টোবরে। অর্থাৎ সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ এখনো নেই। চিকিৎসকেরা বলছেন, জ্বর কমে যাওয়ার পরের দুই তিন দিনই সবচেয়ে ঝুঁকির সময়। তখন রোগী নিজেকে সুস্থ ভাবেন, অথচ রক্তচাপ নেমে শক হতে পারে। এই সময়ে প্রচুর তরল খাবার, পেটব্যথা বা বমি বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।
সরকার পরিবারগুলোকে সপ্তাহে অন্তত দুবার বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু শুধু আহ্বানে মশার প্রজনন থামবে না। সিটি করপোরেশন আর পৌরসভার নিয়মিত অভিযান, নির্মাণাধীন ভবনে নজরদারি আর জেলা হাসপাতালে পরীক্ষার সুবিধা এখন সবচেয়ে জরুরি। বর্ষা শেষ হলেও জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বাড়তে থাকে। তাই নভেম্বরেও ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জ্বর হলে প্রথম দিনেই পরীক্ষা, এই সাধারণ নিয়ম মানলেই অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব।












