যুক্তরাষ্ট্রে ছোট ব্যবসার জন্য কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা দেওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। কর্মীদের পরিবারের সদস্যের মতো দেখাশোনা করতে চান অনেক ব্যবসায়ী। কিন্তু কোনো কর্মী গুরুতর অসুস্থ হলে কিংবা দুর্ঘটনায় পড়লে স্বাস্থ্যবিমার খরচ এত বেড়ে যেতে পারে যে পুরো ব্যবসার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা শহরের একটি রেস্তোরাঁর মালিক দম্পতির অভিজ্ঞতা সেই সংকটেরই বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।
জেন চ্যান ও তাঁর স্ত্রী এমিলি চ্যান আটলান্টার ক্যাবেজটাউন এলাকায় জনপ্রিয় চীনা খাবার ও পিৎজা পরিবেশনকারী রেস্তোরাঁ ‘জেনচ্যানস’ পরিচালনা করেন। পাশাপাশি পাশের রেনল্ডসটাউন এলাকায় তাঁদের আরেকটি ব্যবসা রয়েছে, যার নাম ‘মিকেলসনস মার্কেট’। কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা করা তাঁদের কাছে ব্যবসার সাধারণ কোনো সুবিধা নয়; বরং কর্মীদের প্রতি দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু গত বছর জেনের আক্রমণাত্মক ধরনের স্তন ক্যানসার ধরা পড়ার পর তাঁদের জীবনে একের পর এক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়। অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয় জেনকে। চিকিৎসায় কাজ হবে কি না, তা নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি কিছুটা আশাব্যঞ্জক হয়ে ওঠে। এপ্রিলে কেমোথেরাপির একটি পর্যায় শেষ করে জেন আনন্দের সঙ্গে চিকিৎসাকেন্দ্রের ঘণ্টা বাজাতে এগিয়ে যান। চিকিৎসাকর্মীরাও তাঁকে অভিনন্দন জানান। সবার ধারণা ছিল, দীর্ঘ ও কষ্টকর চিকিৎসার একটি বড় অধ্যায় শেষ হয়েছে।
কিন্তু পরবর্তী পরীক্ষায় জেনের লিম্ফ নোডে ক্যানসার কোষ পাওয়া যায়। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁকে আরও এক বছর কেমোথেরাপি নিতে হবে। নতুন করে শুরু হয় অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ।

এর মধ্যেই আসে আরেকটি দুঃসংবাদ। জেনের কেমোথেরাপি চলাকালে এমিলির কাছে তাঁদের বিমা পরামর্শক ট্রে উইলসনের একটি ইমেইল আসে। বার্তার শুরুতেই তিনি লেখেন, এমিলি এই পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
কারণ, তাঁদের স্বাস্থ্যবিমার খরচ প্রায় দ্বিগুণ হতে চলেছে।
একজনের অসুস্থতা, সবার বিমার খরচ বেড়ে যাওয়া
জেনের ক্যানসারের চিকিৎসা এবং তাঁদের এক কর্মীর দুর্ঘটনাজনিত অস্ত্রোপচারের কারণে বিমা থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের দাবি বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যবিমার ওপর। শুধু জেন কিংবা দুর্ঘটনায় আহত কর্মীর জন্য নয়, বিমার আওতায় থাকা সব কর্মীর জন্যই খরচ বাড়তে শুরু করে।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য পরিচিত একটি সমস্যা। কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা দিতে চান মালিকেরা। এতে দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখা সহজ হয়, কর্মীরা অসুস্থ হলে চিকিৎসার সুযোগ পান এবং বড় ধরনের চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে তাঁদের আর্থিক বিপর্যয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে। কিন্তু একজন কর্মীর গুরুতর অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনা বিমার খরচ এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যা ছোট ব্যবসার পক্ষে বহন করা কঠিন।
জেন চ্যান বলেন, তাঁদের বর্তমান বিমা পরিকল্পনায় কর্মীদের স্বামী-স্ত্রী কিংবা নির্ভরশীল সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করার সামর্থ্য নেই। তাঁদের ছেলেও এই বিমার আওতায় নেই। শুধু পূর্ণকালীন কর্মীদের বিমা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে পারছেন তাঁরা।
শিল্প খাতের বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রেস্তোরাঁ কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা দেয়। ছোট ব্যবসার জন্য সাশ্রয়ী বিমার বিকল্পও তুলনামূলকভাবে সীমিত।

জর্জিয়া রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশনের সরকারি বিষয়াবলি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্কট বিয়ারম্যান জানান, সংগঠনটির সদস্যদের প্রায় ৯০ শতাংশই ছোট ব্যবসা। তাঁদের অধিকাংশের পক্ষেই কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা দেওয়ার খরচ বহন করা সম্ভব হয় না।
বিয়ারম্যানের ভাষায়, রেস্তোরাঁর মতো ছোট ব্যবসার জন্য স্বাস্থ্যবিমা অনেক সময় সাধ্যের বাইরে চলে যায়। অনেক মালিক কর্মীদের এই সুবিধা দিতে চান, কিন্তু বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভব হয় না।
যেসব প্রতিষ্ঠান কোনোভাবে অর্থের ব্যবস্থা করে বিমা চালু রাখতে পারে, তারাও হঠাৎ বড় ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির মুখে পড়তে পারে।
জেন ও এমিলির বিমা পরামর্শক ট্রে উইলসন দীর্ঘদিন ধরে ছোট ব্যবসার সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিমার খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা কীভাবে খরচ সামলাবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
চার দশক ধরেই ছোট ব্যবসার বড় উদ্বেগ স্বাস্থ্যবিমা
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংগঠন ন্যাশনাল ফেডারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট বিজনেসের মার্চ মাসের এক জরিপ অনুযায়ী, গত চার দশক ধরে স্বাস্থ্যবিমার খরচ ছোট ব্যবসার প্রধান উদ্বেগগুলোর একটি।
জরিপে স্বাস্থ্যবিমা দেওয়া ছোট নিয়োগকর্তাদের ৯৮ শতাংশ মনে করেন, উচ্চ ব্যয়ের কারণে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে এই সুবিধা চালিয়ে যাওয়া তাঁদের জন্য টেকসই নাও থাকতে পারে।
রেস্তোরাঁ ও আতিথেয়তা খাতের কর্মীরা এমনিতেই স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের সব কর্মীর মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশ স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পেলেও আতিথেয়তা খাতের কর্মীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ।
জেন ও এমিলির অভিজ্ঞতা দেখায়, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা দেওয়ার সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা ধরে রাখা কতটা কঠিন হতে পারে।

চার বছর আগেই তাঁদের প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যবিমার খরচ প্রায় তিন গুণ বেড়ে গিয়েছিল। খরচ সামাল দিতে ২০২৪ সালে তাঁরা গ্রাহকদের বিলের সঙ্গে ঐচ্ছিক চার শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা অবদান যোগ করার ব্যবস্থা চালু করেন।
কিন্তু অন্য শহর থেকে আসা এক গ্রাহক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে অভিযোগ করার পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এমিলির ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর তাঁরা মৃত্যুর হুমকিও পান। বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত গ্রাহকেরা তাঁদের পাশে দাঁড়ান।
এমিলি বলেন, তাঁরা ভাগ্যবান যে তাঁদের এত বন্ধু ও সহানুভূতিশীল গ্রাহক রয়েছেন।
চার শতাংশের এই অবদান এখনো চালু আছে। কিন্তু তা দিয়েও স্বাস্থ্যবিমার পুরো খরচ মেটানো যায় না।
মাসে কর্মীপ্রতি খরচ ৪৯১ ডলার থেকে বেড়ে ১,১৩৫ ডলার
বিমার আওতায় কর্মীদের চিকিৎসা ব্যয়ের দাবির ওপর নির্ভর করে প্রতি মাসে জেনচ্যানসের বিমার বিল ওঠানামা করে। বর্তমানে নয়জন কর্মী এই বিমার আওতায় রয়েছেন। সামনে আরও কর্মীকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত বছর কর্মীপ্রতি স্বাস্থ্যবিমার পেছনে তাঁদের মাসিক গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৪৯১ ডলার। পরে তা বেড়ে মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার ১৩৫ ডলারে দাঁড়ায়।
জুন মাসে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক চিকিৎসা ব্যয়ের দাবির কারণে ওই মাসে কর্মীপ্রতি খরচ ২ হাজার ৪০০ ডলারেরও বেশি হয়ে যায়। সব মিলিয়ে এক মাসে বিমার বিল দাঁড়ায় ২১ হাজার ৮৬৮ ডলার ৭১ সেন্ট। রেস্তোরাঁটির মাসিক ভাড়ার প্রায় চার গুণ এই ব্যয়।
এমিলি বলেন, পরিস্থিতি তাঁদের সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল।
বিমার খরচ বাড়লেও চিকিৎসার প্রয়োজন কমেনি। বরং চিকিৎসা চালিয়ে যেতে গিয়ে তাঁরা আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হন—বিমা থাকলেও সব চিকিৎসার অনুমোদন পাওয়া সহজ নয়।

জেনের চিকিৎসক তাঁকে একটি রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাভিত্তিক ক্যানসারের ওষুধ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিমা প্রতিষ্ঠান সেই ওষুধের অনুমোদন দেয়নি। ফলে জেনকে অন্য চিকিৎসাপদ্ধতি বেছে নিতে হয়।
এমিলি জানান, বিমা প্রতিষ্ঠান ও তাঁদের বিমা-সংক্রান্ত সহায়তাকারীর সঙ্গে ফোনে বারবার কথা বলতে হয়েছে তাঁকে। চিকিৎসকেরা যখন কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসাকে রোগীর জন্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন, তখন বিমা প্রতিষ্ঠান সেটি অনুমোদন না দিলে রোগী ও পরিবারের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক হয়ে ওঠে।
তাঁদের কাছে প্রশ্ন ছিল, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আশা তৈরি হওয়ার পরও যদি বিমার কারণে সেটি নেওয়া না যায়, তাহলে তাঁরা কী করবেন?
এমিলি কম খরচের কোনো বিমা পরিকল্পনা খুঁজে দিতে তাঁদের পরামর্শককে অনুরোধ করেন। কিন্তু পরামর্শক জানান, আগের চিকিৎসা ব্যয়ের দাবির ইতিহাসের কারণে অন্য কোনো বিমা প্রতিষ্ঠান তাঁদের ব্যবসার জন্য প্রস্তাব দিতে আগ্রহী নয়।
উইলসনের মতে, এই অভিজ্ঞতাই দেখায় কেন রেস্তোরাঁগুলো কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা দিতে চাইলেও তা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কেন ছোট ব্যবসার বিমা এত ঝুঁকিপূর্ণ?
স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেএফএফের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ল্যারি লেভিটের মতে, ছোট ব্যবসার জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যবিমার বিকল্পের অভাব একটি বড় সমস্যা।

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম খরচের আশায় এমন বিমা পরিকল্পনা বেছে নেয়, যেখানে চিকিৎসার ব্যয়ের একটি অংশ সরাসরি নিয়োগকর্তাকে বহন করতে হয়। এ ধরনের ব্যবস্থাকে আংশিক স্ব-অর্থায়িত বা স্ব-অর্থায়িত বিমা বলা হয়।
এই পরিকল্পনায় বড় বিমা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকলেও কর্মীদের চিকিৎসার খরচের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়োগকর্তাকেই দিতে হয়। কিছু পরিকল্পনায় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার পর বড় বিমা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় নেয়।
বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক কর্মীর মধ্যে চিকিৎসার ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু ছোট প্রতিষ্ঠানে কর্মীর সংখ্যা কম হওয়ায় একজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হলে সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি হয়।
লেভিটের মতে, কর্মীরা সুস্থ থাকলে এ ধরনের বিমা পরিকল্পনা সাশ্রয়ী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একজন কর্মীর গুরুতর অসুস্থতাই পুরো হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট সব ধরনের স্ব-অর্থায়িত কিংবা আংশিক স্ব-অর্থায়িত বিমা পরিকল্পনায় অতীতের চিকিৎসা ব্যয়ের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ নিষিদ্ধ করে না। ফলে নির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনায় কর্মীদের আগের চিকিৎসা ব্যয়ের দাবি পরবর্তী বিমা খরচকে প্রভাবিত করতে পারে।
লেভিটের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যবিমা থাকার পরও কোনো মানুষ গুরুতর অসুস্থতার কারণে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ও বিমার সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে অনেক পরিবারের জন্য পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে ওঠে।
বিমা বন্ধ করা অসম্ভব, চালিয়ে যাওয়াও কঠিন
গ্রীষ্মের শুরুতে জেন ও এমিলি দুই দিক থেকেই চাপে পড়েন। একদিকে জেনের চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমার ক্রমবর্ধমান খরচ। কিন্তু বিমা বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ হতো জেনের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা এবং কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবার নিরাপত্তা—দুটিই ঝুঁকির মুখে ফেলা।

এমিলি জানান, তাঁদের পক্ষে বিমা বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না।
তাই তাঁরা অর্থ সংগ্রহের জন্য গোফান্ডমি নামের অনলাইন তহবিল সংগ্রহের প্ল্যাটফর্মে একটি উদ্যোগ শুরু করেন। এর লক্ষ্য ছিল জেনের চিকিৎসা ও কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় মেটাতে সহায়তা সংগ্রহ করা।
সব ছোট ব্যবসার মালিকের ক্ষেত্রে যা সম্ভব হয় না, চ্যান দম্পতির ক্ষেত্রে তা কিছুটা সহায়ক হয়েছে। তাঁদের রয়েছে দীর্ঘদিনের গ্রাহক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসার প্রতি অনুগত একটি সম্প্রদায়।
এই উদ্যোগে এক হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ অর্থ সহায়তা দেন। সংগ্রহ হয় এক লাখ ২৮ হাজার ডলারেরও বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দা হিদার অ্যান্ডারসন ও তাঁর স্ত্রীও এই তহবিলে অর্থ দিয়েছেন। অ্যান্ডারসনের কাছে জেনচ্যানসের চীনা ও দক্ষিণাঞ্চলীয় মার্কিন খাবারের মিশ্রণ বিশেষ আকর্ষণীয়। রেস্তোরাঁটির ফোকাচ্চিয়া-ধাঁচের বুরাটা লাসানিয়া পিৎজা এবং সালাদ-নাচোসের মতো ব্যতিক্রমী খাবার তাঁর পছন্দের তালিকায় রয়েছে।
তবে অ্যান্ডারসনের কাছে রেস্তোরাঁটির গুরুত্ব শুধু খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, চ্যান দম্পতি তাঁদের সব কাজের মধ্য দিয়েই একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
এমিলি চান, রেস্তোরাঁটি যেন গ্রাহকদের কাছে তাঁদের প্রিয় দাদির বাড়ির মতো মনে হয়। সে কারণেই রেস্তোরাঁর ইটের দেয়ালে রয়েছে পরিবারের ছবি, গ্রাহকদের তোলা পোলারয়েড ছবি এবং ইতিবাচক বার্তা। নিয়মিত গ্রাহকেরা এলে কর্মীরা তাঁদের নাম ধরে অভ্যর্থনা জানান। তাঁদের সঙ্গে আসা পোষা কুকুরগুলোকেও চেনেন অনেকে।
রেস্তোরাঁ ও পাশের বাজারকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের এই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে। যেমন, সোমবারের মাহজং খেলার আয়োজন এবং প্রাইড মাসে চালু করা বিশেষ ছাড়ের কার্ড। এই কার্ডের মাধ্যমে রেস্তোরাঁসহ এলাকার কয়েকটি ব্যবসায় ছাড় পাওয়া যায়।
মিকেলসনস মার্কেটও স্থানীয় মানুষের নিয়মিত আড্ডার জায়গা হয়ে উঠেছে। ছুটির দিনের সকালে সেখানে চিকেন বিস্কুট ও কফি খেতে খেতে প্রতিবেশীরা নিজেদের খবরাখবর ভাগ করে নেন।
অ্যান্ডারসনের ভাষায়, চ্যান দম্পতি তাঁদের সবার জন্য একটি সম্প্রদায় তৈরি করেছেন। তাই সেই সম্প্রদায়ও তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

কর্মীদের জন্য বিমা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
রেনল্ডসটাউন এলাকার আরেক বাসিন্দা কোর্টনি কোভানিস ও তাঁর স্ত্রীও তহবিলে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। কোভানিস জানান, সেপ্টেম্বর মাসে তাঁদের এলাকার পক্ষ থেকে চ্যান দম্পতিকে সম্প্রদায়ের প্রতি অবদানের জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছিল।
তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, চ্যান দম্পতি শুধু জেনের ক্যানসারের চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করেননি; কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা চালু রাখার জন্যও সহায়তা চেয়েছেন।
কোভানিস বলেন, এটি তাঁদের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় দেয়। রেস্তোরাঁ খাতে কাজ করা এমনিতেই কঠিন। সেই পরিস্থিতিতে কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে চ্যান দম্পতির প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়।
তবে এই অর্থ সংগ্রহের ঘটনা আরও বড় একটি সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও গুরুতর অসুস্থতা একজন মানুষকে বিপুল ঋণের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে শুরু হয় ধারদেনা, যা পরবর্তী সময়ে আরও বড় আর্থিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
আটলান্টাভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গিভিং কিচেনের প্রধান নির্বাহী অ্যালিসন পাডিলা-গুডম্যান বলেন, কোনো রেস্তোরাঁর মালিক বা কর্মীর স্বাস্থ্যবিমা পর্যাপ্ত না হলে সেটিকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়া রেস্তোরাঁকর্মীদের আর্থিক সহায়তা দেয়। অতীতেও জেনচ্যানসের কয়েকজন কর্মী এই প্রতিষ্ঠানের সহায়তা পেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত গ্যালাপের এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় তিন কোটি মার্কিন নাগরিক চিকিৎসার খরচ মেটাতে অর্থ ধার নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। শুধু ২০২৪ সালেই চিকিৎসা বিল পরিশোধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ আনুমানিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার ধার নিয়েছেন।
এ ছাড়া, চলতি মাসে প্রকাশিত আরবান ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষের চিকিৎসা-সংক্রান্ত ঋণ ছিল।
গোফান্ডমির উদ্যোগ শুরু করার আগে জেন ও এমিলির বকেয়া চিকিৎসা বিল ছিল প্রায় ১২ হাজার ডলার। পাশাপাশি আরও প্রায় ৬০ হাজার ডলারের চিকিৎসা বিল পরিশোধের অপেক্ষায় ছিল। জেনের চিকিৎসা আরও এক বছর চলতে হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁদের মোট কত খরচ হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছিল না।
পাডিলা-গুডম্যানের মতে, স্বাস্থ্যবিমার সুরক্ষা শুরু থেকেই অনেক ক্ষেত্রে সীমিত থাকে। অথচ চিকিৎসার প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব অত্যন্ত কঠিন।
স্বল্প আয়ের কর্মীদের জন্য সংকট আরও গভীর
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে একজন ওয়েটারের গড় ঘণ্টাপ্রতি আয় ১৭ ডলারেরও কম। এই আয়ে অনেক কর্মীর পক্ষেই জরুরি চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সঞ্চয় গড়ে তোলা কঠিন।

পাডিলা-গুডম্যান বলেন, রেস্তোরাঁ খাতের অনেক কর্মী স্বল্প আয়ের মানুষের শ্রেণিতে পড়েন। বাইরে থেকে তাঁদের জীবন সম্পর্কে মানুষের ধারণা সব সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। বিশেষ দিনে মানুষ যখন রেস্তোরাঁয় খেতে যান, তখন কর্মীদের পরিবারের সদস্যের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু সেই কর্মীদের অনেকেই নিজের চিকিৎসার খরচ বহন করার মতো আর্থিক নিরাপত্তা পান না।
বেশির ভাগ রেস্তোরাঁকর্মীর বেতনসহ অসুস্থতাজনিত ছুটির সুবিধাও নেই। ফলে অসুস্থ হলেও অনেককে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। জেন ও এমিলিও চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছেন।
জেনচ্যানসের ফ্লোর ম্যানেজার ম্যাক্স রেজিনেলোর অভিজ্ঞতাও একই সমস্যার আরেকটি দিক তুলে ধরে। গত বছর ইস্টারের দিন টানা দুটি শিফটে কাজ করার পর সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে তিনি একটি দুর্ঘটনার শিকার হন। কয়েক সপ্তাহ কাজ করতে পারেননি। অস্ত্রোপচার করতে হয় এবং প্রায় সাত সপ্তাহ তাঁকে গলায় সাপোর্ট ব্রেস পরে থাকতে হয়।
রেজিনেলো বলেন, তিনি বেঁচে আছেন এবং রেস্তোরাঁর মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিমা পাওয়ায় নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। তবে বিমা থাকলেও তাঁর অন্যান্য খরচ ছিল। কাজ করতে না পারার সময় চিকিৎসার ব্যয় ও অন্যান্য বিল মেটাতে চ্যান দম্পতি তাঁর জন্যও অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
রেজিনেলো জানান, স্থানীয় মানুষ তাঁদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের সম্প্রদায়ের মানুষের উদারতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
তহবিলের অর্থে কর্মীদের জন্য নতুন সুরক্ষার চেষ্টা
জেনের কেমোথেরাপি এখনো চলছে। বছরের শেষ পর্যন্ত তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। গ্রীষ্মে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিমার বিল পরিশোধের পর কিছু অর্থ অবশিষ্ট ছিল।
সেই অর্থ দিয়ে চ্যান দম্পতি কর্মীদের জন্য একধরনের স্বাস্থ্যসঞ্চয় তহবিল তৈরি করেছেন। কোনো কর্মী ভবিষ্যতে অসুস্থ হলে কিংবা হঠাৎ চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দিলে বিমার আওতার বাইরে থাকা খরচ বা নির্ধারিত নিজস্ব অংশের ব্যয় মেটাতে এই তহবিল ব্যবহার করা যাবে।
এমিলি জানান, তাঁদের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো ছোট ব্যবসার স্বাস্থ্যবিমা-সংক্রান্ত সমস্যার দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তাঁদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অসংখ্য ছোট ব্যবসা একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
তাঁরা কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা দেওয়া বন্ধ করতে চান না। বরং নিজেদের ওয়েবসাইটে অর্থ সহায়তা দেওয়ার একটি লিংক রেখেছেন, যাতে আগ্রহীরা বিমার ব্যয় মেটাতে সাহায্য করতে পারেন।

তবে তাঁরা এটাও জানেন, একজন কর্মীর গুরুতর অসুস্থতার কারণে বিমার খরচ এত বেড়ে যেতে পারে যে কর্মীদের সুরক্ষার জন্য নেওয়া উদ্যোগটিই ব্যবসার ওপর বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
এমিলির মতে, এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। তাঁদের সম্প্রদায় যেভাবে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাঁরাও সেভাবে কর্মী ও গ্রাহকদের পাশে থাকতে চান। কিন্তু স্বাস্থ্যবিমার বর্তমান ব্যবস্থা তাঁদের মতো অনেক ছোট ব্যবসাকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলছে।
তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে এমিলি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবার সুরক্ষা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। তা না হলে ভবিষ্যতে তাঁদের মতো আরও অনেক ব্যবসা টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়তে পারে।
সংকটের মধ্যেও সম্প্রদায়ের পাশে থাকার চেষ্টা
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও চ্যান দম্পতি তাঁদের সামাজিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। গ্রীষ্মে তাঁরা সমর্থকদের ধন্যবাদ জানাতে এবং গিভিং কিচেনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে ‘গালা ফর হোপ’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেন।
অনুষ্ঠানে এত বেশি মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন যে জেন ও এমিলি তাঁদের জন্য নির্ধারিত বক্তব্য দেওয়ার সুযোগই পাননি। অতিথিদের জন্য খাবার তৈরি করতেই তাঁদের বেশির ভাগ সময় কেটে যায়।
এমিলি বলেন, তাঁর কাছে মনে হয়েছে, অনুষ্ঠানটি নিজেই তাদের উদ্দেশ্য ও মানুষের ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছে। তাঁদের একটি অসাধারণ সম্প্রদায় রয়েছে।
জেন ও এমিলির গল্প তাই শুধু একটি পরিবারের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই কিংবা একটি রেস্তোরাঁর আর্থিক সংকটের কাহিনি নয়। এটি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্রও তুলে ধরে, যেখানে বিমা থাকার পরও চিকিৎসার খরচ মানুষকে বিপর্যস্ত করতে পারে, আর কর্মীদের সুরক্ষা দিতে চাওয়া ছোট ব্যবসার মালিকেরাও একসময় নিজেদের সামর্থ্যের সীমায় পৌঁছে যান।
একদিকে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব, অন্যদিকে কর্মীদের জন্য বিমা ধরে রাখার চেষ্টা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন চ্যান দম্পতির সবচেয়ে বড় লড়াই। তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় মানুষ। কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, ব্যক্তিগত সহমর্মিতা অনেক সময় তাৎক্ষণিক সংকট সামলাতে সাহায্য করলেও স্বাস্থ্যবিমার কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে পারে না।












