জাপানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জিএমও ইন্টারনেট গ্রুপের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং র্যানসমওয়্যার হামলার হুমকি দিয়েছে একটি হ্যাকার গোষ্ঠী। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রতিষ্ঠানটি ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার দুপুর ১২টার আগে গ্রাহকদের তথ্যের ব্যাকআপ নেওয়া, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, কম্পিউটার বন্ধ করা এবং বিদ্যুতের সংযোগ খুলে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় জিএমওর এই নজিরবিহীন সতর্কতা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন প্রতিষ্ঠানটির হাজার হাজার সার্ভারের নিরাপত্তা ভেঙে পড়ার ঘটনা সামনে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে জাপানসহ বিভিন্ন দেশের আর্থিক সেবা ও লেনদেনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে।
জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম জাপান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাকারীদের দাবির মুখে জিএমও কোনো অর্থ দিতে রাজি হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির আশঙ্কা, মুক্তিপণ দিলেও চুরি করা ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলার নিশ্চয়তা নেই। এসব তথ্য ভবিষ্যতে বেআইনি কাজে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।
দুপুরের সময়সীমা পার হওয়ার পর হ্যাকার গোষ্ঠী দাবি করেছে, জিএমও আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় তারা একজন গ্রাহকের তথ্য প্রকাশ করেছে। জাপানের সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
৮ বিলিয়ন ইয়েন মুক্তিপণ দাবি
হ্যাকার গোষ্ঠী জিএমওর কাছে প্রায় ৮০০ কোটি ইয়েন বা ৫১ মিলিয়ন ডলার দাবি করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষা এবং সম্ভাব্য ক্ষতি সীমিত রাখতেই তারা পাল্টা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
গত সপ্তাহে জিএমও জানায়, তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। এতে ২৬ হাজার ৭৩৯টি সার্ভার ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব সার্ভারের সঙ্গে জাপান ও বিদেশের ৭০টিরও বেশি সিকিউরিটিজ প্রতিষ্ঠান, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসেবা প্রদানকারী এবং অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গ্রাহক হিসাবের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে কয়েকজন ব্যবহারকারীর প্রায় ২০ লাখ ইয়েন পর্যন্ত ক্ষতির খবর পাওয়া গিয়েছিল। মঙ্গলবার জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা জানান, জিএমওর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি বৈদেশিক মুদ্রার মার্জিন ট্রেডিং সেবার সার্ভারেও অনুপ্রবেশ ঘটেছে। হামলাকারীরা অনলাইনে অননুমোদিত লেনদেন করেছে।
পাঁচ প্রতিষ্ঠানে লেনদেন বন্ধ
আক্রান্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো গোল্ডেনওয়ে জাপান, ওয়ান্ডা, আভা ট্রেড জাপান, গাইটামা ফাইনেস্ট এবং ডুকাস্কপি জাপান। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের লেনদেন ইতিমধ্যে স্থগিত করেছে।
জিএমও আক্রান্ত গ্রাহকদের কম্পিউটার পরীক্ষা করে দেখছে, কীভাবে হ্যাকাররা ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে।
প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি সব ব্যবহারকারীকে এককালীন ৫ হাজার ইয়েন করে দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা ট্রেন্ড মাইক্রোর মতো প্রতিষ্ঠানও হামলা মোকাবিলায় জিএমওকে সহায়তা করছে।
সাইবার প্রতিরক্ষায় সরকারি উদ্যোগ
জিএমওর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসাতোশি কুমাগাই রোববার এক ব্লগ পোস্টে জাপানের সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, জাপান এবং ইন্টারনেটের সুরক্ষায় এখনই যৌথ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, তাঁর মূল্যায়নে ইন্টারনেট ব্যবস্থা নিজেই ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সোমবার সরকারকে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে একটি সমন্বিত পদক্ষেপের প্যাকেজ তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন।
জিএমওর ঘটনা জাপানের আর্থিক লেনদেন ও ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, অননুমোদিত লেনদেন এবং মুক্তিপণের হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠান ও সরকারের সামনে এখন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার চ্যালেঞ্জ।
জাপানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলা, গ্রাহকদের তথ্য চুরির হুমকি এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অননুমোদিত কার্যক্রম—সব মিলিয়ে দেশটির ডিজিটাল নিরাপত্তা নতুন পরীক্ষার মুখে।












