ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনার প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। শীতের আগমন, বিপুল প্রাণহানি, ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান আর্থিক ব্যয় এবং অবকাঠামোর ধ্বংস—সব মিলিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মূল্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু শান্তি আলোচনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরলেই রাশিয়ার আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়া হয় না, কিংবা ইউক্রেনের আত্মরক্ষার অধিকার অস্বীকার করা হয় না। বরং প্রশ্নটি হলো, যুদ্ধের অবসান ঘটানোর মতো বাস্তবসম্মত পথ কোথায়?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা এই বিতর্ককে জটিল করেছে। তিনি আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তাঁর প্রশংসা এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি অবমাননাকর আচরণ সমঝোতার ধারণাকে অনেকের কাছে সন্দেহজনক করে তুলেছে। ফলে যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন, এমন মানুষও ট্রাম্পের প্রস্তাবিত সমাধান থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছেন।
কিন্তু কোনো প্রস্তাবের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করা উচিত তার শর্ত ও সম্ভাব্য ফলাফলের ওপর, কে সেটি সামনে এনেছেন তার ওপর নয়। যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা প্রয়োজন—এই বাস্তবতাকে ট্রাম্পের বিতর্কিত অবস্থানের কারণে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা যুক্তিসংগত নয়।

‘এক ইঞ্চিও নয়’ নীতির সীমাবদ্ধতা
ইউক্রেনের ভূখণ্ডের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না—পশ্চিমা রাজনীতিক ও ভাষ্যকারদের একটি অংশ এমন অবস্থান নিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, রাশিয়াকে দখল করা অঞ্চল ছেড়ে দিয়ে পরাজয় স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এই অবস্থানের পরিণতি কী, তার সুস্পষ্ট উত্তর খুব কমই পাওয়া যায়।
রাশিয়া কি ক্রিমিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে, পূর্ব ইউক্রেনের সব দখল করা এলাকা ছেড়ে দেবে এবং নিজেদের পরাজয় মেনে নেবে? পুতিনের ক্ষমতা হারানো কিংবা রাশিয়ায় এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশা কি বাস্তবসম্মত, যে সরকার যুদ্ধের দায় স্বীকার করে বিপুল ক্ষতিপূরণ দেবে? এমন সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে শান্তির কৌশল সাজানো কঠিন।
রাশিয়ার সম্পূর্ণ পরাজয় এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পতন নিশ্চিত করার কোনো বাস্তবসম্মত পথ না থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকিই বাড়বে। এতে ইউক্রেন ও রাশিয়া—দুই পক্ষেরই আরও মানুষ প্রাণ হারাবেন, আর ইউরোপীয় দেশগুলোকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে যেতে হবে। এই পরিস্থিতি চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির কৌশলগত সুবিধাও বাড়াতে পারে।
যুদ্ধের মূল্য শুধু অর্থে মাপা যায় না
যুক্তরাজ্য সরকার-সংশ্লিষ্ট একটি হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনকে সহায়তা দিতে দেশটি এখন পর্যন্ত ২৫ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করেছে। ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ মোট অর্থের হিসাবে কিংবা মাথাপিছু ব্যয়ের বিচারে এর চেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছে। যুদ্ধের ক্ষতি পুনর্গঠনের ব্যয়ও সামনে রয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, সেতু, গুদাম ও আবাসিক ভবন পুনর্নির্মাণে আরও বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে।
তবে আর্থিক হিসাবের চেয়েও ভয়াবহ হলো প্রাণহানি। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একটি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীতে নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে দেড় লাখের মধ্যে হতে পারে। রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৪ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এগুলো অনুমাননির্ভর হিসাব; আহত ও স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা এর বাইরে।

প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। দূর থেকে যুদ্ধকে বীরত্ব, সম্মান ও আত্মত্যাগের লড়াই হিসেবে বর্ণনা করা সহজ। কিন্তু যারা নিজেরা যুদ্ধক্ষেত্রে যাবেন না, তাঁদের পক্ষে অন্যদের অনির্দিষ্টকাল লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো নৈতিকভাবে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। উভয় পক্ষই সম্মান ও আত্মত্যাগের ভাষা ব্যবহার করছে। সেই ভাষা যুদ্ধের মানবিক মূল্যকে আড়াল করতে পারে।
ভূখণ্ড নিয়ে দর-কষাকষি, কিন্তু আগে যুদ্ধবিরতি
শান্তির জন্য আপসের অর্থ ইউক্রেনকে একতরফাভাবে আত্মসমর্পণ করতে বলা নয়। বরং প্রথমে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করে, তারপর ভূখণ্ডের প্রশ্নে বাস্তবসম্মত আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। ক্রিমিয়ার অবস্থান, পূর্বাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এবং বর্তমান সম্মুখসারিকে আলোচনার সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব। তবে এসব প্রশ্নের সমাধান হবে জটিল, দীর্ঘ এবং কঠিন দর-কষাকষির মধ্য দিয়ে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভূখণ্ড নিয়ে সমঝোতা আর রাশিয়ার আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়া এক বিষয় নয়। যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো মানেই অতীতের ঘটনাকে ন্যায়সংগত বলে মেনে নেওয়া নয়। অনেক সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে এমন সমঝোতার মধ্য দিয়ে, যেখানে কোনো পক্ষই নিজেদের সব দাবি পূরণ করতে পারে না।
ইউক্রেনের ভেতরেও আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার প্রশ্নে দেশটির মানুষের অনীহার পেছনে শুধু জাতীয় মর্যাদা বা প্রতিরোধের মনোভাব কাজ করছে—এমন ধারণা অসম্পূর্ণ। আরও বড় উদ্বেগ হলো, কোনো চুক্তির পর রাশিয়া আবার আক্রমণ করলে কী হবে?
শান্তির শর্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা
ইউক্রেনের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া ভূখণ্ড নিয়ে আপস করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েক বছর পর নতুন করে রুশ আক্রমণ শুরু হলে বর্তমান সমঝোতার কোনো মূল্য থাকবে না। তাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা।
ন্যাটোতে ইউক্রেনের সদস্যপদ রাশিয়ার কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে এই পথ অনুসরণ করা কঠিন হতে পারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং একই সঙ্গে ইউরোপীয়, মার্কিন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের স্থায়ী উপস্থিতির মাধ্যমে নিরাপত্তার কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থায় ন্যাটোর সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এটি সহজ কোনো সমাধান নয়। রাশিয়া এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারে, আর ইউক্রেনও আলোচনার শুরুতেই সম্ভাব্য সব ছাড় প্রকাশ করতে চাইবে না। তবু উভয় পক্ষের জন্য যুদ্ধের অবসান ঘটানোর মতো একটি কাঠামো খুঁজে বের করার প্রয়োজন রয়েছে। রুশ নেতৃত্বও এমন কোনো বন্দোবস্তের মধ্যে নিজেদের বিজয় দাবি করার সুযোগ খুঁজতে পারে, যা একই সঙ্গে সংঘাতের অবসান ঘটাবে।
আলোচনার বিকল্প নেই
কূটনীতি মানে নীতিগত অবস্থান পরিত্যাগ করা নয়; বরং কোন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব, কোনটি সম্ভব নয় এবং কী শর্তে সংঘাত থামানো যায়—তা নির্ধারণ করা। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হলে শুধু সর্বাত্মক বিজয়ের প্রত্যাশা ধরে রাখলেই চলবে না। এমন একটি সমঝোতার পথও খুঁজতে হবে, যা নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা কমায়।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আরও মানুষ মারা যাবেন, আরও অবকাঠামো ধ্বংস হবে এবং আরও অর্থ ব্যয় হবে। বিপরীতে, নিরাপত্তার কার্যকর নিশ্চয়তাসহ একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তি সেই ক্ষয়ক্ষতি থামানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। আপসের প্রতিটি শর্ত নিয়ে বিতর্ক থাকবে, কিন্তু সেই বিতর্ক এড়ানোর জন্য আলোচনা থেকেই সরে থাকা কোনো কৌশল হতে পারে না।
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিশ্চিত করার পথ সহজ নয়। তবু কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হবে। এখন প্রয়োজন স্লোগানের বদলে বাস্তব প্রস্তাব, নিঃশর্ত বিজয়ের প্রত্যাশার বদলে কার্যকর নিরাপত্তা এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণার পাশাপাশি শান্তির জন্য কঠিন আলোচনায় বসার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।












