ব্যাংককের পরিচিত দৃশ্যের অংশ হয়ে উঠেছে মাথার ওপর ঝুলে থাকা অসংখ্য বিদ্যুতের তার, টেলিফোন লাইন ও অন্যান্য তারের জট। শহরের বাসিন্দাদের কাছে এই দৃশ্য দীর্ঘদিনের বিরক্তির কারণ হলেও কর্তৃপক্ষ এবার সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে একটি কমিটি, যার লক্ষ্য শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই তারের জঞ্জাল সরানো। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ঘোষণা আর বাস্তব পরিবর্তনের মধ্যে ব্যবধান কম নয়। তাই নতুন উদ্যোগ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি বাস্তবায়নের জটিলতাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ব্যাংককের আকাশরেখা থেকে ঝুলন্ত তার সরানোর প্রতিশ্রুতি অবশ্য নতুন নয়। প্রায় এক দশক আগে শহরের গভর্নর আশ্বাস দিয়েছিলেন, দুই বছরের মধ্যেই এসব কুৎসিত তার সরিয়ে ফেলা হবে। তারপরও শহরের বহু এলাকায় তারের জট রয়ে গেছে। ফলে এবারও শুধু প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই।
শহরের দৃশ্যমান সৌন্দর্যের প্রশ্নটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো ভবনের সামনে, নোংরা বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর এলোমেলো তারের জট ব্যাংককের নগর-পরিকল্পনার দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। সুখুমভিত সড়কে ফ্রা খানং সেতুর কাছাকাছি এলাকায় এর স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায়। এমন দৃশ্য কোনো আধুনিক মহানগরের আকর্ষণ বাড়ায় না।
তবে তার সরানোর উদ্যোগকে কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত চ্যালেঞ্জগুলো আড়ালে থেকে যাবে। কারণ, আকাশের তার মাটির নিচে স্থানান্তর করা মানেই সেগুলো অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক খনন, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি এবং দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণকাজ পরিচালনা।
আকাশের জঞ্জাল সরাতে মাটিতে বিশৃঙ্খলা

ভূগর্ভস্থ তারের ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম বড় বাধা হলো নির্মাণকাজের কারণে জনজীবনে বিঘ্ন। শহরের ব্যস্ত সড়ক খনন করতে হলে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে ফুটপাতেও তৈরি হতে পারে প্রতিবন্ধকতা, যা পথচারীদের চলাচলকে কঠিন করে তুলবে। যানজট ও মানুষের ভিড়ে আগে থেকেই চাপে থাকা এলাকাগুলোতে এই সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে।
খননকাজের পর রাস্তা ও ফুটপাত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কাজের সময় তৈরি হওয়া গর্ত, অসমান পৃষ্ঠ কিংবা ফেলে রাখা নির্মাণসামগ্রী পথচারীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। মোটরসাইকেলচালকেরা ফুটপাত ব্যবহার করলে সেখানে পথচারীদের ঝুঁকি আরও বাড়ে। ফলে মাথার ওপর ঝুলে থাকা তারের বিপদ কমাতে গিয়ে নিচের পথকে আরও অনিরাপদ করে তোলা যাবে না।
বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও চলাচলে সীমাবদ্ধতা রয়েছে এমন নাগরিকদের জন্য নির্মাণকাজের প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। উন্নয়নের নামে ফুটপাত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে কিংবা চলাচলের উপযোগী না থাকলে তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই।
তাই প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত কিলোমিটার তার মাটির নিচে নেওয়া হলো, তা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। কাজ কত দ্রুত শেষ হচ্ছে, পথচারীদের নিরাপত্তা কতটা বজায় থাকছে এবং খননের পর রাস্তা ও ফুটপাতের মান কেমন থাকছে—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত।
কুৎসিত তার, আবার শহরের পরিচিতিও
ব্যাংককের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে তারের এই বিশৃঙ্খলার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। অনেকের কাছে তা এখন শহরের দৃশ্যপটের এমন একটি অংশ, যা নিয়ে বিরক্তি থাকলেও বিশেষভাবে আর নজর দেওয়া হয় না। অন্যদিকে, বিদেশি পর্যটকদের চোখে এই তারের জট শহরের প্রথম দিককার দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
কেউ কেউ একে ব্যাংককের স্বতন্ত্র নগরচিত্রের অংশ হিসেবেও দেখেন। এমনকি পর্যটকেরা কখনো কখনো এলোমেলো তারের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, যেন এটি শহরের অন্য পরিচিত দৃশ্যগুলোর মতোই দর্শনীয় কোনো উপাদান। অবশ্য এই দৃষ্টিভঙ্গিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখার কারণ নেই। কোনো কিছুর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া আর সেটিকে নগর-পরিকল্পনার আদর্শ হিসেবে মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়।

তার সরানোর উদ্যোগের পক্ষে যুক্তি তাই শুধু শহরের সৌন্দর্য বাড়ানো নয়। আরও গোছানো বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা, সড়ক ও ফুটপাতের ওপর ঝুলন্ত তারের উপস্থিতি কমানো এবং নগর অবকাঠামোকে অধিক সুশৃঙ্খল করা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তবে এই পরিবর্তনের সুফল যেন নির্মাণকাজের সাময়িক দুর্ভোগে ঢাকা না পড়ে, সে নিশ্চয়তা দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে।
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পরীক্ষায়
ব্যাংককের তারের জট সরানোর উদ্যোগের সঙ্গে অতীতের নগর-উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে। উন্নয়নের জন্য সড়ক খনন, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা পুরোনো ব্যবস্থা বদলানোর কাজ নতুন নয়। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি লন্ডনের সড়ক খননের দৃশ্যও মনে করিয়ে দেয়, ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য শহরের স্বাভাবিক জীবন কতটা ব্যাহত হতে পারে।
তবে এসব অসুবিধা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাকে বাতিল করে না। বরং এগুলো দেখায়, পরিকল্পনার মান নির্ধারিত হয় শুধু চূড়ান্ত লক্ষ্য দিয়ে নয়, সেখানে পৌঁছানোর পদ্ধতি দিয়েও। কাজের সময়সীমা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং জনসাধারণকে আগাম তথ্য দেওয়ার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিত হলে ভালো উদ্যোগও জনদুর্ভোগের কারণ হতে পারে।

ব্যাংককের কর্তৃপক্ষের সামনে তাই দুটি দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, দীর্ঘদিনের তারের জঞ্জাল বাস্তবেই সরিয়ে ফেলা। দ্বিতীয়ত, সেই কাজ করতে গিয়ে শহরের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন চলাচল ও নিরাপত্তা যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রাখা। একটির বিনিময়ে অন্যটি বিসর্জন দেওয়ার সুযোগ নেই।
এই প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়নের সময় নাগরিকদেরও শুধু দৃশ্যমান পরিবর্তনের দিকে তাকালে চলবে না। কাজের গুণমান, নিরাপত্তা এবং প্রতিশ্রুত সময়সীমা কতটা মানা হচ্ছে, সেদিকেও নজর রাখা দরকার। কারণ, নগর উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য কোনো একটি দৃশ্যকে সুন্দর করে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শহরকে বাসযোগ্য করে তোলার মধ্যেই তার মূল্য।
ব্যাংককের আকাশ থেকে তারের জট একদিন সরতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে মাটির নিচে তার বসানোর প্রযুক্তিগত কাজের পাশাপাশি মাটির ওপর মানুষের চলাচলের বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে তার ওপর। কর্তৃপক্ষ যদি এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারে, তবেই দীর্ঘদিনের বিরক্তিকর দৃশ্য সরানোর উদ্যোগ সত্যিকারের নগর-উন্নয়নে রূপ নেবে।












